• সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

তিনশো বছরের কলকাতা করোনায় আজ বড় অচেনা বড় বেশি নিঃসঙ্গ

প্রকাশ:  ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০৮:২৮
সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত

তিনশো বছরের কলকাতার এমন নিঃসঙ্গতার ছবি আগে কখনো দেখেছি? এমন ব্যস্তসমস্ত শহরের রাজপথে ঝরা পাতাদের লুটোপুটি, এমন খানেওয়ালা গলিঘুঁজিতে চটজলদি টিফিন সেরেই কাজের তাড়ায় এপাশ ওপাশ না দেখে চোখকান বোজা অফিসবাবুদে জিভির চলাফেরা না দেখা অফিসপাড়ার বেঞ্চি, কড়াই, ডেকচি, ওল্টানো নীল প্লাস্টিক .... ট্রামলাইনটার বুকের ওপর কতোদিন চাকার ছাপ পড়েনি, যে হাওড়া ব্রীজ সবসময়ই বোঝাই ... যাত্রীবোঝাই বাসে, মিনিবাসে, ট্যাক্সিতে, গাড়িতে, মালবোঝাই লরি টেম্পোতে, হাঁক ডাকে সরগরম ....কতোদিন দেখোনি কলকাতা?

গুমটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের পেছনে এখনো জ্বলজ্বলে হরফে লেখাটা রয়েছে ... দূরত্ব বজায় রাখুন, দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলুন ...... এটাই বোধহয় হালফিল মহানগরীর ট্যাগ লাইন। সন্ত্রস্ত, আশঙ্কায় কাঁপছি আমরা সবাই। ক্ষণে ক্ষণে চোখ টিভির পর্দায় কিংবা খবরের লেটেস্ট আপডেটে ....কি হলো? কতো বাড়লো আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা .... কোথায় কোথায় কত মানুষ লড়ছেন শুধু পীড়িত নয় আক্রান্ত হতে পারি এই আশঙ্কায় জীবন কাঁপছে থরথর।

মহামারি এ শহর দেখেছে কতোবার। দেখেছে প্লেগের আক্রমণ, কালাজ্বর ,এমনকি বর্ধমান ফিভার নাম্নী অজানা জ্বর যা প্রচুর মৃত্যুর মিছিল দেখেছিল। হুগলি জেলায় তেরো শতাংশ এবং বর্ধমান জেলায় ছয় শতাংশ মানুষ মারা যান। শুধু হুগলি জেলাতে সাড়ে ছয় লক্ষ মানুষ মারা গেছিলেন। এই জ্বরের অনুসন্ধানে ইংরেজ সরকার একটি কমিশন নিয়োগ করে, তার একমাত্র নেটিভ সদস্য রাজা দিগম্বর মিত্র বলেন, যত্রতত্র বাঁধ, রেললাইন, রাস্তা বানানোর সঙ্গে জলনিকাশি ব্যবস্থা না রাখার ফলে এই মহামারী হয়েছিল।

যদিও নাম বর্ধমান ফিভার, কারণ এটি বর্ধমান ডিভিশনে হয়েছিল, কিন্তু সবথেকে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হুগলি জেলায় ঘটে। এবং বর্ধমান ডিভিশনের মোট এক তৃতীয়াংশ মানুষ এই মহামারীতে মারা যান। এই মহামারি আটকাতে ইংরেজ সরকার প্রায় কিছুই করেনি।

নাগরিক হিসেবে বা প্রজা হিসেবে ন্যূনতম চাওয়া টুকু থাকে যে মহামারির সময় রাষ্ট্র সক্রিয় হোক, অর্থসহ অন্যান্য রিসোর্স ব্যয় করুক মানুষের নিরাপত্তায়....বাকিটা নাগরিক সচেতনতা বা সহযোগিতা ......

এতো বড়ো অনুজীব আক্রমণের অভিজ্ঞতা আর পরবর্তী ঘটনা পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার অভিজ্ঞতা আমাদের কারোরই নেই। এ যেন সেই অদৃশ্য শক্তির সাথে কানামাছি লড়াই .... শত্রু কোনদিকে তাও জানা নেই , আর কতো শক্তি আছে তার ভাঁড়ারে তাও না .... শুধু এটুকু জানি যে এই অদৃশ্য শত্রু আমাদের তার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে একটাই প্ল্যাটফর্মে ....যার নাম লড়াই .... সহযোগিতার পরীক্ষা, বোধহয় ধৈর্য আর মনোবলের ও .....

তাই চারদিক থেকে আশঙ্কাজনক খবর পেতে থাকলেও কোথাও আমরা আশার প্রদীপে তেলসলতে দিই সাধ্যমতো ...

এই দুর্দিনে যেখানে যতটুকু আনন্দের কণা পাই , আশার আলো দেখি হাত পাতি মুঠোর আড়ালে বাঁচিয়ে রাখতে চাই থিরথিরে শিখাটুকু..... শুনশান রাস্তায় যে পুলিশ রক্ষকদের দেখতাম কঠিন কঠোরতায় কর্তব্য পালন করে যেতে .... সাদা কিংবা খাঁটি বর্মের আড়ালে .... এক অফিসার একবার দুঃখ করে বলেছিলেন ম্যাডাম আমাদের জীবনে উৎসব, ঘরে ফেরা, ঠাকুর দেখা যদি আপনাদের মতোই থাকে ....তাহলে তো আপনাদের আনন্দ বানচাল অনেকটাই .... আজ ঘরবন্দীর দিনগুলোতে জমায়েত দেখলে দন্ডের আস্ফালনে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া ভীত জনতার জন্য পুলিশ সহযোগীদের রয়েছে চাঙ্গা করার অন্য প্যাকেজ। নিস্তেজ, আশঙ্কার দিনে সেই পুলিশকাকুরাই সতেজ বসন্তের হাওয়া ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রচলিত বিখ্যাত গানের সুরে সুরে করোনার সচেতনতার বার্তা দিয়ে ....কখনো বেলা বোস, কখনো গুপীবাঘার বিখ্যাত সুরে কথা বসিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মাইক নিয়ে সুরেলা পুলিশ কাকুরা ....আমাদের চমকে দিলেন ... আমরা করবো জয় নয় নয় .....আমরা করবোই জয় ....নিশ্চয় .....

পাড়ায় পাড়ায় যারা সচেতনতার বার্তা দিচ্ছেন মাইক নিয়ে, যারা দরিদ্র দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের জন্য খাবার ব্যবস্থা করছেন, এমনকি যারা ঘরবন্দীতেও আছেন ....সবাই সব্বাই আজকে এই অবস্থার বিরুদ্ধে লড়ছি ....এই খাঁচাটার শিকগুলো বাঁকা তেই হবে, বেরোতেই হবে, ডানা অচল হবার আগে মেলতেই হবে সুনীল মুক্ত আকাশে .....

সবাই মিলেই তো মেলবো দুচোখ, ফেলবো পদক্ষেপ ..... হাতে হাত, পায়ে পা মিলিয়ে ..... কেউ দরজা বন্ধ করে, কেউ রাস্তায় নেমে এই ভাইরাস কে রোখার চেষ্টা করছেন ....

তবু আজ যাঁরা সাধ্যমত ঘরে থাকবেন, জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে দেবেন না, তাঁরাই সচেতনতার পরিচয় দেবেন এই মহামারীর সময়.....এই অকালে আমাদের গলা মিলিয়ে বলার সময় এসেছে লড়বো, জিতবো, বাঁচবো রে .....

সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত,করোনাভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close