• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

আমেরিকা কাঁদছে,কাঁদছে মানুষ

প্রকাশ:  ০৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:১২ | আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:৩০
এম আর ফারজানা, নিউ জার্সি থেকে

বিশ্বে এ মুহূর্তে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, এ পর্যন্ত দেশটিতে করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা তিন লাখ ২৭ হাজার ৮৭১ জন। মারা গেছে নয় হাজার ৩২৫ জন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ আক্রান্ত হবে। এর মধ্যে নিউ ইয়র্কেই এক লাখের বেশি আক্রান্ত হবে।

আমেরিকার কোনো হাসপাতালে এখন ঠাই নেই। ফ্লোরে, বেডে ভর্তি রোগী। প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরছে মানুষ। কাঁদছে ডাক্তার , নার্স , তাদের চোখের সামনে এমন মৃত্যু দেখে। কাঁদছে পরিবারের মানুষেরাও। মৃত্যুর পর আপনজনের লাশ ছুঁয়ে দেখবে সে সুযোগও নাই। কারন হাসপাতাল থেকে ফিউনারেল, জানাজা দিয়ে একেবারে সমাধি। বড়রা বুঝতে পাড়ছে যে যাকে হারিয়েছে সে ফিরে আসবে না পরিবারে।কিন্তু অবুঝ বাচ্চারা তো তা বুঝে না। কেউ বাবাকে খোঁজে, কেউ মাকে। অপেক্ষায় থাকে কখন আসবে।

অবস্থা এমন হয়েছে যে, বাসা থেকে অনেক বাবা-মা বলে গেছেন, চলে আসবো দু একদিনের মধ্যে। কিন্তু আর ফিরে আসেনি।করোনা ভাইরাস তাদের নিয়ে গেছে ওপারে। কোন দিন তারা আর আসবে ও না। বাচ্চারা অপেক্ষা নিয়ে বড় হবে তারা বাবা, মা তাদের কাছে ফিরবে।

নিউ ইয়র্কে এখন প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে, অগণিত লাশ জমছে।। হাসপাতালের স্টাফরাও শবদেহ টানতে টানতে ক্লান্ত। একেকটা হাসপাতালে এখন লাশের স্তূপ। রোগী অনুযায়ী পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর নেই। আজকে চীন থেকে এক হাজার ভেন্টিলেটর এসেছে। পার্কে ও অস্থায়ী হাসপাতাল খুলেছে দুইদিন আগে । এসেছে তিন হাজার বেডের কমফোর্ট জাহাজ। মেয়র তার সাধ্যমত চেষ্টা করছেন। কিন্তু হাসপাতাল, ডাক্তার নার্সের তুলনায় রোগী বেশী। যা কল্পনা ও করেনি কেউ। এমন কি নিউ ইয়র্কবাসী নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারছে না এমন পরিস্থিতির।

একদিকে আপনজন হারানোর ব্যথায় বুক ভারি হয়ে আছে। অন্যদিকে নিজেরা আক্রান্ত হবার ভয়। আবার হাসপাতাল থেকে লাশ আনতেও ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এত এত লাশ যে , লাশ দাফনের জন্য ফিউনারেল হাউসের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ফিউনারেল এবং গাড়ির ব্যবস্থা হলে হাসপাতাল থেকে সিরিয়াল অনুযায়ী লাশ দাফনের জন্য বা শেষকৃত্যের জন্য ছাড়া হচ্ছে। চেষ্টা করা হচ্ছে যথাযথভাবে লাশ দেয়ার।

নিউ ইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো এর মধ্যে অন্য স্টেটের গভর্নরদের সতর্ক করে দিয়েছেন। বলেছেন, সময় থাকতে যথাযথ ব্যবস্থা নেন। না হয় পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন না।

সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে যাদের চাকরি নেই তারা। সীমিত আয়ে চলা মানুষ তারা। জমানো যা ছিল এতদিনে তাও শেষ। কাউকে বলতে ও পারছে না। ভবিষ্যৎঅন্ধকার দেখছে তারা। রেস্টুরেন্টেও যাচ্ছে না আক্রান্ত হবার ভয়ে,আর পর্যাপ্ত অর্থ ও নেই। এ মুহূর্তে কেউ কাউকে যে সাহায্য বা সহযোগিতা করবে যে পরিবেশ ও নাই। এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনলেই বুকের মধ্যে কেমন হাহাকার করে উঠে। এই বুঝি কেউ চলে যাচ্ছে চিরতরে।

মৃত্যু যেন সবাইকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। করোনা ভাইরাস এতটাই ভাইরাল হয়েছে মানুষের মাঝে এখন আর সামাল দেয়া যাচ্ছে না। করোনা ভাইরাসের ভেক্সিন এখনোও বাজারে আসেনি। ট্রায়াল চলছে। বাজারে আসতে আরো ছয়মাস লাগতে পারে। যার ফলে এই মাহামারি ঠেকানো কঠিন ।

নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল কবরস্থানে কবর দেয়া হচ্ছে একে একে। অনেকের আগে থেকে ঠিক করা ছিল না বলে যাচ্ছে অন্য জায়গায়। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দুই সপ্তাহ পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। বলা হচ্ছে বাসায় থাকার জন্য। এ মুহূর্তে এটাই করতে হবে বাঁচতে চাইলে। যে নিউ ইয়র্ক জেগে থাকত দিনরাত , বলা হতে এ শহর ঘুমায় না। যে শহরে হাজারো মানুষের ছুটে চলা ভোর হতেই , সে শহর এখন হাজারো মানুষের লাশ।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

পূর্বপশ্চিম- এনই

এম আর ফারজানা,আমেরিকা,করোনায় নিউইয়র্ক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close