• সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

মর্মান্তিক পরিণতি রুখতে এখনো লকডাউন কারফিউ দেয়া যায় না?

প্রকাশ:  ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২৩:০৫ | আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২৩:০৬
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)

প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন, বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ, করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহসী নেতৃত্ব সব ঠিক আছে। কিন্তু ইউরোপ আমেরিকার মর্মান্তিক মৃত্যুর ভয়াবহতা দেখে আমাদের পরিণতি ভাবলে শরীর ভয়ে হিমশীতল হয়ে যায়! পৃথিবী এখন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনার লড়াই করছে। চিকিৎসক, নার্স, পিপিই, লাশের প্যাকেট ও দাফন সঙ্কটে ভুগছে। চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ইউরোপ আমেরিকার পরিণতি এদেশকে বরণ করতে হলে কি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দেখা দেবে ভাবলে মানুষের খাওয়া দাওয়া ঘুম চলে যায়। চীনের মৃত্যুর ভয়াবহতাকে সময়মতোন আমলে না নেওয়ায় ইউরোপ আমেরিকাকে আজ লাশ আর লাশের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায়বোধ করতে হচ্ছে। আমেরিকা, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মান ও বৃটেন এখন কাঁদছে। কাঁদছে আজ পৃথিবী। মানবজাতি।

প্রতাপশালী হোয়াইট হাউজ অসহায়। বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন লাশের মিছিলের সামনে, আগামীতে মৃত্যু আরও বেশি! এ হার দুই লাখের মধ্যে রাখতে চাইছেন। নিউইয়র্কের গভর্নরতো অন্য সিটির গভর্নরদের বলেই দিয়েছেন, প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে পরিণতি নিউইয়র্কের মতোন হবে।

আমেরিকা এখন সর্বোচ্চ আক্রান্তের দেশ। লাশের শহরের শীর্ষে যাচ্ছে নিউইয়র্ক। এমন ভয়াবহ মৃত্যু যন্ত্রণায় পৃথিবী একসঙ্গে কখনো পড়েনি। এমন ভয় আতঙ্ক অসহায়ত্ব মানবজাতি কখনো দেখেনি। যারা শতবছর আগের মহামারীর কথা বলেন তার অভিজ্ঞতাও আজকের পৃথিবীর কারোর নেই। আর এমন করে এতো দেশ বা গোটা পৃথিবীকেই লন্ডভন্ড করেনি। চীনের আর্তনাদ শুনে ইউরোপ আমেরিকায় কি সরকার, কি জনগণ কার্যকর সচেতন পদক্ষেপ না নেয়ায় আজ মৃত্যুর বিভীষিকাময় অবস্থার মুখে। প্রতিনিয়ত অবনতিশীল পরিস্থিতি। শেষটা কোথায় কেউ বলতে পারে না। লকডাউন কারফিউ কত কিছু ঘোষণা দিয়ে উন্নত ধর্ণাঢ্য প্রতাপশালী রাষ্ট্রগুলো যেখানে অসহায় সেখানে আমরা এতো জনগণ, এতো সীমাবদ্ধতা নিয়ে কি অবস্থায় আসলে? কোন ভয়ঙ্কর পরিণতি সামনে? এখনই এশিয়ায় মৃত্যুহারে বাংলাদেশ শীর্ষে।

ভারত ও পাকিস্তানে আক্রান্ত বাড়ছে। আমাদেরও। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা আইইডিসিআর জানিয়েছে, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রন্ত হয়ে এখন পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৮৮ জন। এরমধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৬৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। সুস্থ হয়েছেন ৩৩ জন। করোনাভাইরাসে রাজধানীর বাসাবো ও মিরপুর এবং নারায়ণগঞ্জে বেশি সংক্রমণ পাওয়া গেছে। বাসাবো এলাকায় ৯, টোলারবাগে ১১ ও নারায়ণগঞ্জে ১১ জন আক্রান্ত বলে জানিয়েছে। মাদারীপুর, গাইবান্ধা, কক্সবাজার, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, কুমিল্লা, গাজীপুর জেলায় করোনাক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। সংক্রমণ অতিমাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে করোনা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

আমরা চীনের ভয়াবহতার পর তিনমাস সময় নিয়ে প্রতিরোধে কার্যকর প্রস্তুতি যেমন নিতে পারিনি, তেমনি সচেতনও হইনি। আক্রান্তের একমাসও হয়নি। এখন যে অবস্থা একমাস পর যদি ইতালি, স্পেন ও নিউইয়র্কের মতোন ভয়াবহ পরিণতি আসে তাহলে কোথায় দাঁড়াবে দেশ? করেনাক্রান্ত ইতালিসহ বিদেশফেরত ৬ লাখ দেশে ঢুকতে দেয়া হলো, বিমানবন্দরে পরীক্ষা নেই, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন নেই! তারপরের অবস্থা জানা। সমাজে ছড়িয়ে গেলেন তারা।

মানুষ আক্রান্ত হওয়া শুরু হলো! যাক সরকার ছুটির ফাঁদে দেশকে আটকে কার্যত লকডাউন করলেও সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন নামিয়েও জনতাকে গৃহবন্দি করা, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে অনেকটা সফল হলেও পুরো হতে পারেনি। ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস থেকে ঘরবন্দি রাখতে কঠোর হতে পারেনি অনেকের পুলিশবিরোধী জাতগেলো সমালোচনায়। ঘরে ঘরে সরকার, মানবিক মানুষেরা খাবার দিলেন। ইতালি দিয়ে যে অশুভ সূচনা ঘটেছিলো সবশেষে সরকারি ছুটির আগেই সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা ভেঙে গার্মেন্ট মালিকরা কারখানা খুলে শ্রমিকদের ঢাকামুখী স্রোত নামালো। একবার ছুটি ঘোষণায় সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘন করে বাড়ি গেলো, বাইরে ছড়ালো, এখন স্রোতের মতোন ঢাকা এসে ছড়াবে! গার্মেন্ট মালিকরা প্রণোদনা সুবিধালাভ ও বিদেশে লাশের প্যাকেট বেচে টাকা কামাতে এটা করলো? সরকার কেনো কঠোর হলো না? স্বাস্থ্যমন্ত্রী শুরুতেই ব্যর্থতা দেখালেন এবার বাণিজ্যমন্ত্রী!

করোনার ভাইরাসবাহী একজন যেখানে ৫৯ হাজার জনকে আক্রান্ত করাতে পারে সেখানে বোঝাই যায় সংক্রমিত হলে এর ভয়াবহতা কোথায় দাঁড়ায়! ইতালি, বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হবার প্রায় দুই মাসের মধ্যে আজ কি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে। আমরাও প্রায় একমাসের মাথায় এসে যেখানে আক্রান্ত ও মৃতের হিসবে বাড়ছে দেখছি সেখানে একমাস পর কত ভয়ঙ্কর রুপ নিতে পারে তা ভাবলেই ভয় হয়। অদৃশ্য ভয়ঙ্কর এ জীবাণুর সংক্রমণ আরও অদৃশ্য নীরব দ্রুতগতিসম্পন্ন।

ব্যাংকের সব শাখা খোলা। সমাগম ব্যাপক। হাটবাজার মহল্লায় আড্ডাবাজি সমাগম! এই উগ্র হঠকারি উদাসীনতা অসচেতনতার পরাণতি ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও ভয়াবহ হবেনা তো? হলে দায়টা কে নেবে? কত মানুষ আক্রান্ত, কত মৃত্যু হতে পারে, কতটা মর্মান্তিক অবস্থা হবে আমরা কি ভাবছি? আমাদের চিকিৎসক নার্স, কর্মী, টেকনোলজিস্ট এমনকি বিভিন্ন অসুখে ভোগা রোগী সবাই ঝুঁকিতে। দেশের সবাই কার্যত ঝুঁকিতে। চিকিৎসা নেই, ভ্যাকসিন নেই। কতো সীমাবদ্ধতা আমাদের। অর্থনীতি চাকরিবাকরি সবই সামনে বিপর্যয়ের মুখে। তবু কঠোরতা সচেতনতা নেই! এখনো কি আমরা ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে করুণ মর্মান্তিক পরিণতি রুখতে লকডাউন কারফিউতে যেতে পারি না? প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কে ভাববেন?

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিম

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close