• সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

বাইরে মৃত্যুর ফাঁদ পা বাড়ালেই মর্মান্তিক পরিণতি

প্রকাশ:  ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০:০১ | আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০:০৫
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)

জীবন দুর্বিষহ বিষাদময় হলেও আপনাকে বুঝতে হবে বাইরে বের হলেই মৃত্যুফাঁদ। আর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মুত্যু বড় মর্মান্তিক! আপনি জানেন না কে ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস বহন করছেন। ভাইরাস বহনকারীর কাছ থেকে আপনি সংক্রমিত হলে উপসর্গ দেখা না গেলে পরীক্ষা করবেন না। আর পরীক্ষার আগেই আপনি জীবনকে বিপদের মুখে ফেলে দেবেন। সেই সঙ্গে আপনার পরিবারসহ যারা সংস্পর্শে আসবেন তারাও আক্রান্ত হবেন। তাদের মাধ্যমে ছড়াতে থাকবে। এভাবেই আজ পৃথিবীজুড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণায়। মৃতের সংখ্যা অর্ধ লাখ অতিক্রম করেছে। আরও কতো আক্রান্ত হবে কেউ জানে না। আশঙ্কা চলছে। সতর্কবাণীই উচ্চারিত হচ্ছে। লকডাউন কবলিত নিথর পৃথিবীতে গৃহবন্দি বা কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হচ্ছে। বাধ্য করা হচ্ছে।

এখানে বিশ্বমহামারীতে একজনের জীবনের বিষয় নয়। জনে জনে ছড়িয়ে কোটি প্রাণ ঝরে যেতে পারে পৃথিবী থেকে সচেতনতার নির্দেশনা অনুসরণ না করলে। মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ কাজ পাগল। মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। করোনার মহামারি ভয়াবহ রুপ নিয়ে প্রায় ২'শ দেশকে আক্রান্ত করে পৃথিবীকে লন্ডভন্ড করে দেয়ায় বাধ্যতামুলক এ ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। এতে আমরা ভয় উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ঘরবন্দি হয়ে জীবনের নিরাপত্তায় কারাবাস করছি।

ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিনা অপরাধে বাধ্যতামূলক এ জীবন বড় যন্ত্রণার। কিন্তু নিজের, পরিবারের এবং সবার জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে এ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। মহামারি কবলিত বিশ্বের আক্রান্ত দেশসমূহে চিকিৎসাবিহীন রোগীদের হাসপাতাল আশ্রয় ও সেবা দিতে গিয়ে ধর্ণাঢ্য উন্নত দেশ হিমশিম খায়। কবরে জায়গা হয় না দাফনে। সেখানে বিশাল লোকসংখ্যার বাংলাদেশে মহামারি দেখা দিলে কি ভয়ঙ্কর পরিণতি হবে, ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। এখন সবাই অশান্ত হচ্ছেন ঘরে থাকতে থাকতে। বেরিয়ে পড়ছেন। সবখানেই মানুষ! কোথাওতো জনস্রোত। এটা ভীষণ হুমকির।নিজের, পরিবারের, সমাজের ও দেশের সর্বনাশা। এতে বীরত্বের কিছু নেই, মরণের আশঙ্কা আছে।

একটি টিভি চ্যানেলের সংবাদকর্মী আক্রান্ত হলে তার সংস্পর্শে আসা প্রতিষ্ঠানের ৪৭ জনকে সেলফ আইসোলেশনে দেয়া হয়েছে। আক্রান্তের সংস্পর্শে কি পরিবার, অন্য গণমাধ্যমের কলিগরা বা সমাজের কেউ আসেননি? ভারতে একজন ৫৯ হাজরকে ভাইরাস ছড়িয়েছিলেন। এখন দেশে ভয়ঙ্কর সময় চলছে ছড়িয়ে পড়ার দিকে দিকে।

ইতালিতে করোনাক্রান্ত হবার ৪৫তম দিনে মহামারী ছড়িয়েছিলো। স্পেনে ৫০তম দিনে। আর যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫তম দিনে। সেখানে আজ বিয়োগান্তক পরিস্থিতি। মৃত্যুর থাবায় লাশ আর লাশের ধ্বংসস্তুপ। সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে রাষ্ট্রগুলো অচেনা দানবকে রুখতে পারছে না। তাদের চিত্রপট সামনে আনলে আমরা ৮ মার্চ আক্রান্তের খবর জেনেছি। একমাসও হয়নি! আমরা যতো অস্থির অশান্ত হই না কেনো মনে রাখতেই হবে সামনে কঠিন সময়, এখন ভয়াবহ সময়। সরকারি নির্দেশানা মানতেই হবে। যারা মানবেন না মানুষের নিরাপদ জীবনের স্বার্থে তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করতেই হবে প্রশাসনকে। সেনাবাহিনীকে। পুলিশকে।

অভিশপ্ত উহান যখন আক্রান্ত হয় কঠোরভাবে গোটা প্রদেশকে অবরুদ্ধ করে মানুষকে গৃহবন্দি করে লড়েছে চীন। তখন পৃথিবী বোঝেনি এর ভয়াবহ পরিণতি। চীনে করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও প্রাণ গেছে ৩ হাজার ৩২২ জনের। আক্রান্ত ৮২ হাজার ৪৩২ জন। অনেকে সুস্থ। নিয়ন্ত্রণে এলেও সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।

জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৪ হাজার ৭৯৪, প্রাণহানি হয়েছে ১ হাজার ১০৭ জনের। ভারতে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আড়াই হাজার। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৭২ জনের। সুস্থ হয়েছেন ১৯১ জন।

মোট আরোগ্য লাভ করাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, চীনে ৭৬ হাজার ৫৭১ জন, স্পেনে ২৬ হাজার ৭৪৩ জন, ইতালিতে ১৮ হাজার ২৭৮ জন, ইরানে ১৬ হাজার ৭১১ জন, জার্মানিতে ২২ হাজার ৪৪০ জন ও ফ্রান্সে ১২ হাজার ৪২৮ জন।

ইউরোপে বহু দেশে যখন করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন অবস্থা চলছে তখন সুইডেন অন্য সবাইকে অনুসরণ না করে এমন এক পন্থা নিয়েছে যা স্বাভাবিক জীবনের অনেক কাছাকাছি। যদিও সুইডেনে এ পর্যন্ত সাড়ে ৫ হাজার লোকের করোনাভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে এবং মারা গেছেন ৩০৮ জন।

১৮ জানুয়ারি উহান লকডাউনের পর চীনের বাইরে প্রথম ফিলিপাইনে ৪৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃত্যু হয় করোনাভাইরাসে। তার এক সপ্তাহ পর ফ্রান্সে ৮০ বছর বয়সী এক পর্যটক মারা যায়— যা ইউরোপে করোনাভাইরাসে প্রথম মৃত্যু। তারও পাঁচদিন পর ইরানে ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়— দু'জন ব্যক্তি ভাইরাস সংক্রমণের শিকার হয়েছেন, এমন ঘোষণা আসার পরপরই মারা যায়। পরে ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয় ইরান।

ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায় ২৩ ফেব্রুয়ারি। লোমবার্দি অঞ্চলের ১০টি শহরকে লকডাউন করা হয়, যে লকডাউন পরবর্তীতে ইতালিজুড়ে আরোপ করা হয়। আর দুনিয়া দেখে তাদের মর্মান্তিক পরিণতি।

২৩ মার্চ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যুক্তরাজ্যে ৩ সপ্তাহব্যাপী লকডাউনের ঘোষণা দেন। তিনদিন পর ২৬ মার্চ, করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যার হিসেবে চীনকে অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্র।

২ এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রে মোট করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ১৭ হাজার ছাড়ায়— সংখ্যায় যা ইতালিতে মোট আক্রান্ত হওয়া মানুষের দ্বিগুণ। চীন থেকে উন্নত ইউরোপ বৃটেন মধ্যপ্রাচ্য শিক্ষা নেয়নি, লাশ আর আক্রান্তের বোঝা বহনে মাশুল দিচ্ছে। ইউরোপ থেকে যদি শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি সতর্ক না হই সেটি হবে আত্মহত্যার শামিল। পরিণতি করুণ মর্মান্তিক হবে।

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিম

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close