• মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

কেয়ামতের পৃথিবী যেন হাশরের ময়দান

প্রকাশ:  ০১ এপ্রিল ২০২০, ০০:২০
পীর হাবিবুর রহমান

করোনার ভয়াবহ অভিশাপ থেকে পৃথিবী কবে মুক্ত হবে? কবে নিথর নিস্তব্ধ পৃথিবীজুড়ে করোনাভাইরাসের তান্ডব থামবে? লাশের মিছিল থামবে দেশে দেশে? কী এক ভয়ঙ্কর ছোট্ট জীবাণুর আঘাতে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয়ের নীরব ধ্বংসলীলা? প্রতাপশালী রাষ্ট্র থেকে সব নেতৃত্ব, বিজ্ঞানী, গবেষক আর তাদের গবেষণাগারই নয়; গোটা মানবজাতিই অসহায়! কবে বের হবে এ মরণঘাতী জীবাণুর ওষুধ, ভ্যাকসিন? কবে দেশে দেশে মানুষের সেবায় দোরগোড়ায় যাবে? তার আগে এ মহাপ্রলয় আর কতটা দুমড়ে-মুচড়ে দেবে পৃথিবীকে? কত প্রাণহানির পর থামবে তার তান্ডবলীলা? সবাই বলছেন প্রতি ১০০ বছর পর বা যখন-তখন পৃথিবীতে যত মহামারী এসেছে অতীতের সবকটির চেয়ে এবারের মহামারীতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম!

সবচেয়ে কম মৃত্যুহার নিয়ে আসা করোনাভাইরাসে আজ পৃথিবীর ১৯৯টি দেশ আক্রান্ত। এর মধ্যে মহাশক্তিধর চীনের উহান শহর থেকে যার অশুভ সূচনা সে দেশের অর্থনীতি জীবনযাত্রাকে তছনছ করে দিয়ে নিয়ন্ত্রণে এলেও একেবারে মুক্তি দিয়ে যায়নি। সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত হেনেছে ইউরোপে। ইতালিকে লাশের পাহাড়ে দাঁড় করিয়ে ফ্রান্স, স্পেনে লাশের মিছিল নামিয়ে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রকে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়েছে। পৃথিবীজুড়ে লকডাউন এক কথায় অচল-নিস্তব্ধ করেছে। সব নগর শহর পথে পথে ভীতিকর নীরবতা নামিয়ে এনে কার্যত জনমানবশূন্য ভুতুড়ে জনপদে পরিণত করেছে।

পৃথিবী যেন আজ এক হাশরের ময়দান। যেন কেয়ামতের আজাব নামিয়ে করোনাভাইরাস শেষ বিচারের ময়দানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কেউ কারও নয়, কেউ কাউকে চিনতে পারবে না! যার যার ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি অবস্থা। কারবালার ট্র্যাজেডিকেও হার মানানো এক মর্মান্তিক পরিণতি নেমে এসেছে মানবজাতির জীবনে। বাঁচতে হলে তুমি স্বার্থান্ধ হও। নিজের কথা ভাব। চিকিৎসাবিহীন পৃথিবীর সব দম্ভ-অহংকারের পতন ঘটিয়ে মানবজাতিকে কঠিন বেদনাবহ পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছে। কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গরোধ অথবা গৃহবন্দী বা আইসোলেশন বা নিঃসঙ্গ জীবনের মুখোমুখি হয়ে করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচার এক অভিনব অসহায় পন্থা। যেখানে একজন আক্রান্ত হলে গোটা বাড়ি বা এলাকা লকডাউন হচ্ছে। স্বামী আক্রান্ত হলে স্ত্রী-সন্তান পাশেই যেতে পারছে না। স্ত্রী আক্রান্ত হলে একই অবস্থা। এমনকি সন্তানের মৃত্যুশয্যায় মা স্পর্শ করা দূরে থাক পাশেই দাঁড়াতে পারছেন না! করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণে লাশের গোসল ছাড়াই দাফন বা পুড়িয়ে দেওয়া! এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মানুষ কখনো চরম শত্রুর জন্যও চায়নি। অথচ বিষাক্ত ও ছোঁয়াচে করোনার মৃত্যু আপনজনদের জীবন কেড়ে নিয়ে সেই ট্র্যাজিক যন্ত্রণাই এনে দিয়েছে আজ মানুষের জীবনে। আজ বিষাদগ্রস্ত পৃথিবীতে পিতা -মাতা একখানে সন্তান আরেক দেশে। ভাই এক দেশে তো স্নেহের বোন আরেক জায়গায়। স্বামী-স্ত্রীও কোথাও কোথাও আলাদা আছেন। নিজের জন্য, সন্তান, পরিবার, পরিজন কার জন্য কার টেনশন। স্তম্ভিত মানুষ, যতই বলা হোক আতঙ্কিত হবেন না, সচেতনতাই একমাত্র পথ, ততই মানুষ সচেতন হয়েও আতঙ্কিত ভীতসন্ত্রস্ত।

ব্রিটেনের রাজপুত্র প্রিন্স চার্লস করোনা থেকে উঠে এসেছেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে। তার আক্রান্ত হওয়ার খবরে জনগণ বিচলিত হবে কি তার আগেই শোনামাত্র পেছনের দরজা দিয়ে উপদেষ্টা পালিয়েছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুুডোর স্ত্রী সোফিও সুস্থ হয়েছেন। স্পেনের রাজকন্যার জীবনাবসান ঘটেছে। ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এখনো শয্যায়।

বিশ্বজুড়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লাখ ৮০ হাজার ১৭৪, মৃতের সংখ্যা এখন ৩৭ হাজার ৫৪০।

আক্রান্তের শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৮৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৯৫১ জনের। মৃতের হিসাবে শীর্ষে রয়েছে ইতালি। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ১১ হাজার ৫৯১, মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৩৯-এ। স্পেনে মৃতের সংখ্যা ৭ হাজার ৭১৬, মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮৭ হাজার ৯৫৬। করোনার উৎপত্তিস্থল চীনে আক্রান্ত হয়েছেন ৮১ হাজার ৪৭০ জন। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৬ হাজার ১২৫; মৃত্যু হয়েছে ৬১৬ জন। ফ্রান্সে আক্রান্ত ৪৪ হাজার ৫৫০ জন, মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৪৭৬ জনের। ইরানে আক্রান্ত ৪১ হাজার ৪৯৫ জন, মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৭৫৭। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যায় পাকিস্তান শীর্ষে। দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৭১৭, মৃতের সংখ্যা ২১। দক্ষিণ এশিয়ায় করোনায় মৃত্যুর সংখ্যায় এগিয়ে ভারত। প্রতিবেশী দেশটিতে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের, আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ২৫১।

নিউইয়র্কেই করোনাভাইরাসে ২৩ বাংলাদেশির অকালমৃত্যু ঘটেছে। যশোরের আইটি বিশেষজ্ঞ সোহাগ ব্যবসায়ও সফল ছিলেন। ছোট দুটি সন্তান ও স্ত্রীকে রেখে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিরনিদ্রা নিয়েছেন। কতটা মর্মান্তিক! মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার আমিনা ইন্দ্রালিব তৃশার (৩৯) মৃত্যু হয়েছে গত ২৩ মার্চ। সুন্দরী মিষ্টি তরুণী দুটি শিশুকে মাতৃহারা করে রেখে গেছেন! মৃত আলমের স্ত্রীর হৃদয়ভাঙা কথা মানবতার বক্ষ বিদীর্ণ করেছে। দেশে বিদেশে সবখানে কি হৃদয়বিদারক একেকটি মৃত্যু। একেকটি পরিবারের জীবনে বয়ে যাওয়া কি নির্মম মৃত্যুযন্ত্রণা। ঢাকার ফটোসাংবাদিক আবদুল হাই স্বপন পরিশ্রমী ভদ্র বিনয়ী ছিলেন। হঠাৎ দেখি নিউইয়র্কে হাসপাতালে কিডনি রোগে আক্রান্ত। সহকর্মীরা সাহায্যেরর হাত বাড়িয়েছেন। এ লেখার আগে শুনি করোনা তাকেও করুণা করেনি! শেষ! বাসদ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সিলেটের শাহাব উদ্দিন এখন করোনা আক্রান্ত হয়ে নিউইয়র্কের হাসপাতালে।

নিউইয়র্কের মেয়রই নন, প্রকৃতির এমন আঘাতে আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা লড়াই করলেও ভিতরে কত অসহায়বোধ করছেন বোঝা যাচ্ছে! নিয়তির হাতেই যেন আজ গোটা পৃথিবীর ভাগ্য। মার্কিন চিকিৎসক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। প্রেসিডেন্ট সেখানে লড়ছেন যেন ২ লাখের মধ্যেই থাকে। কে চিন্তা করেছিল পৃথিবীর ক্ষমতাধর উন্নত রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালিসহ ইউরোপের চিকিৎসাব্যবস্থা এমন অসহায়ত্বের বিষাদের চাদরে ঢেকে দেবে হতাশ পৃথিবীর মুখ! আজ এ বিপর্যয়ে তাদের কিট নেই, আইসিইউ নেই, শয্যা নেই, ভেনটিলেশনও নেই। চিকিৎসক কর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম নেই! তৃতীয় বিশ্বের যারা সর্বস্ব খুইয়ে হলেও দৌড়াতেন উন্নত চিকিৎসায় তাদের চোখ আজ ছানাবড়া।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ করোনা আক্রান্তের খবর ঘোষিত হয় প্রথম। আগাম প্রস্তুতি না নেওয়াসহ বিদেশ থেকে আসাদের ব্যাপকহারে পরীক্ষা ছাড়া প্রবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নিতে না পারায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। চিকিৎসাব্যবস্থা পরীক্ষা প্রস্তুতি নিয়েও সমালোচনা করি আমরা। কিন্তু সব দেশের মতো আমাদের রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদক্ষেপ, রাষ্ট্রনায়কোচিত ভাষণে জাতি এক মুহূর্তে কার্যত অঘোষিত লকডাউনেই যায়নি গোটা প্রশাসনসহ জনগণ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। চীনের কিট অনেক দেশে অকার্যকর বলেও মেয়াদোত্তীর্ণগুলো ফেরত দিয়েছে। আমাদের পাশে তারা দাঁড়িয়েছে। আলিবাবার জ্যাকমার সাহায্য এসেছে। দেশের সেনাবাহিনী নেমেছে। পুলিশ সদস্যরা নেমেছেন আগেই। ক্রিকেটাররা অর্থ দান করেছেন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। দুঃসময়ে মাঠ প্রশাসনও আন্তরিক পরিশ্রম করেছে। একজন এসিল্যান্ড সায়েমা ভুলের ক্ষমা চেয়ে অনুতপ্ত। অনেক ডিসি বাড়ি বাড়ি খাবার নিয়ে গেছেন। অনেক পুলিশ সদস্য কোয়ারেন্টাইনে খাবার দিয়ে আসছেন। নারায়ণগঞ্জের ইউএনও নাহিদা বারিক এক মাসের বেতনের টাকায় খাবার কিনে গরিবের বাড়ি ছুটেছেন।

জনগণের পাশে থেকে সর্বদা গণভবন থেকে মনিটরিং করে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা সারা দেশে গরিবের ঘরে খাবার পাঠাচ্ছেন। সেনাবাহিনী এক মাসের বেতনের ২৫ কোটি টাকাই প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়নি, বাড়ি বাড়ি সড়কে সড়কে তারা রোদে পুড়ে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে। গোটা জাতি যুদ্ধে। চিকিৎসাব্যবস্থাও সংগঠিত হচ্ছে। জীবনের ঝুঁঁকি নিয়েই চিকিৎসক থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করছেন। তবু আতঙ্ক, লাশ দাফন থেকে আক্রান্ত এমনকি যে কোনো রোগীর চিকিৎসা সেবাদান না দেওয়ার ঘটনা ঘটছে দেশে। পরীক্ষা হচ্ছে না। ৪৯ জন আক্রান্ত, পাঁচজন মৃত, ১৯ জন সুস্থ। শেষ পরিণতি কী হয় জানি না।

জাতিসংঘের বক্তব্য ২০ লাখ মারা যাবে। আমরা বিশ্বাস করতেই চাই না। প্রতিরোধের লড়াই জোরালো হয়েছে। ছুটি বা অঘোষিত লকডাউন আরও বাড়বে। প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মতো শিক্ষার্থীদের এক ক্লাস অটোপ্রমোশন সব মিডিয়ামেই দিতে হবে। ব্রিটেনেও দিয়েছে। সব চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মী যারা কাজ করবেন তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। যুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে যিনি মারা যাবেন তাকে বীরের মর্যাদায় পরিবারের দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ৫ হাজার শয্যার করোনা হাসপাতাল সাত দিনে করার যে প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়েছিলেন তা গৃহীত হয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে। রবিবার বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে গ্রুপের ১০ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করে তার পিতার চিঠি বা লিখিত প্রস্তাব দেন। ভয়াবহ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বিষণ্ন পৃথিবীর মানুষ যখন লড়ছে, দেশের মানুষ যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যুদ্ধে নেমেছে তখন বসুন্ধরা গ্রুপের এ উদ্যোগ মানবিক শক্তিকে উৎসাহই দেয়নি, মানুষকেও সাহস জুগিয়েছে। আকিজ গ্রুপও তেজগাঁওয়ে হাসপাতাল করছে। দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, সিভিল প্রশাসন, আনসার ও ভিডিপি সদস্য- সবাই দেশের এ সংকটময় মুহূর্তে মানুষের জীবন বাঁচাতে এক দিনের বেতনই দেননি যুদ্ধও করছেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ, ডাক্তার, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীরাও জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে কাজ করছেন।

আরও কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপ অর্থ প্রদান করেছে। সব ব্যবসায়ীকে বড় মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। যারা সরকারের ১১ বছরে অনেক বাণিজ্য করেছেন তাদের কাছে মানুষ আশা করে বেশি। বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান আইনজীবী পিতার সন্তান হয়ে এ দেশে গভীর দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর প্রধানই নন, দেশে ব্যাপক বিনিয়োগে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনন্যসাধারণ ভূমিকা রাখছেন। সব দুর্যোগে মানবতার পাশে, মানুষ ও দেশের সঙ্গে। মন তাঁর সমুদ্রের মতো। কত হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন। কত শিল্পকারখানাই বিভিন্ন খাতে নয়, আবাসন খাতে হাজার হাজার পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে মাইলফলক করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ মিডিয়া হাউস গড়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশকে অর্থনীতির উন্নয়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই তাঁর লক্ষ্য। কত মানুষকে হজে পাঠান, কত সহস্র মানুষের বিপদে গোপন সহায়তা দেন। কত মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে নীরবে দাঁড় করিয়েছেন। এমন মানবিক বিত্তবানরাই বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ান।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সারা জীবনের অর্জন মানবতার জন্য উজাড় করে দিয়েছেন। সিকদার গ্রুপের জয়নুল হক সিকদার বীর মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ স্বজন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গরু জবাই করে শোক দিবসে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। আসাম থেকে মওলানা ভাসানীর সান্নিধ্য লাভ করেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে গণতন্ত্রের সংগ্রামেই নয়, কত মানুষের চিকিৎসায়, ব্যবসায় ও রাজনীতিবিদদের দুঃসময়ে সহায়তা করেছেন। স্কয়ারের স্যামসন এইচ চৌধুরী মানবিক ব্যবসায়ীর ইমেজ গড়েছিলেন। তাঁর সন্তানরাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ আজ সংকটে কতটা হাত বাড়ান জাতি দেখতে চায়।

সব রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, এমপি, সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতিবাজ নন। কিন্তু যারা দুর্নীতি করে সবখানে অঢেল অর্থবিত্ত গড়েছেন, তাদের আত্মোপলব্ধি করা উচিত এ অর্থ জনগণের। একাংশ জনগণের বিপদে দান করা উচিত। মানসিক দরিদ্ররা কখনো দিতে জানে না, নিতে জানে। দেওয়ার আনন্দ উপভোগ করার হৃদয় তাদের নেই। আজ দেশ কঠিন যুদ্ধে। প্রশ্ন তাই সেই লুটেরারা কোথায়? যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে জনগণের? ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করেছে। যারা শেয়ারবাজার লুটতে লুটতে কবর দিয়েছে। রিক্ত-নিঃস্ব করেছে বিনিয়োগকারীদের তারা আজ কই? বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা যারা পাচার করেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো সেই গণশত্রুরা আজ কোথায়? বিদেশের সেকেন্ড হোম সম্পদ কি করোনা আক্রান্ত পৃথিবীতে অনিশ্চিত মনে হয় না? এদের ধরে এনে আদায় করার সময়।

সারা দেশে ১১ বছরে যারা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে রাতারাতি বিপুল অবৈধ অর্থসম্পদ গড়েছেন তাদের এখন দুই হাত ভরে মানুষকে সাহায্য করার সময়। স্থানীয় প্রশাসন, মেয়র, ইউপি চেয়ারম্যানদের হাতে নগদ অর্থ ও খাবার তুলে দিন। এ অর্থ তো আপনাদের কষ্টে অর্জিত নয়, ঘুষ দুর্নীতির টাকা। জনগণের টাকা। মানুষের টাকার একটা অংশ মানুষকে তার দুঃসময়ে ফিরিয়ে দেবেন না কেন? একদিন তো চড়া মাশুল গুনতেই হবে। প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে দিন। জেলা প্রশাসকের হাতে দিন। ইউএনওর হাতে দিন। ইউপি চেয়ারম্যানদের হাতে দিন। সৎ সাধারণ মানুষ মানবিক হাত বাড়িয়েছে। সৎ মানুষরা কষ্টের এক দিনের বেতন দিচ্ছেন। পরিশ্রম করছেন তাপদাহে। আপনি চুরি-ডাকাতির টাকা এখন না দিলে কবে দেবেন? এখনই জনগণের টাকার একাংশ ফিরিয়ে দিন।

ভারতে করোনা মোকাবিলায় ১ হাজার ৫০০ কোটি রুপি সহায়তা দিয়েছে টাটা গ্রুপের দাতব্য সংস্থা টাটা ট্রাস্ট এবং টাটা গ্রুপের হোল্ডিং কোম্পানি টাটা সানস। এশিয়ার শীর্ষ ধনী এবং চীনা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ লাখ ফেস্ক মাস্ক এবং করোনা শনাক্তকরণে ৫ লাখ কিট অনুদান দিয়েছেন। ইউরোপে বিতরণের জন্য ২০ লাখ মাস্ক দান করছেন। জ্যাক মা ফাউন্ডেশনের দেওয়া ৩ লাখ মাস্ক ঢাকায় পৌঁছেছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ১০০ মিলিয়ন ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন বিল গেটস দম্পতি। উদার হস্তে অনুদান দিতে ভারতীয় ব্যবসায়ী আদম প্রেমজির জুড়ি নেই। মুক্তহস্তে দান করার কারণে এর আগেও তিনি শিরোনামে এসেছেন। সুবিধাবঞ্চিত ও সুশিক্ষার জন্য তিনি অনুদান করে থাকেন। আর এবার দান করলেন ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ ৫০ হাজার কোটি রুপি। সালমান খান ২৫ হাজার মানুষের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছেন। আমাদের তারকারা কই? গানে-সিনেমায়-নাটকে কম পারিশ্রমিক-সম্মানী তো নেন না!

সবাই লুটেরা কৃপণ মানসিক দারিদ্র্যগ্রস্ত নন। হৃদয়বান মানুষের সংখ্যাই বেশি। আমাদের দেশে করোনার বিরুদ্ধে মানুষের জীবন রক্ষার লড়াইয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে লড়াই, সেখানে আজ দেশের সবাইকে এগিয়ে আসার সময়। যার যা কিছু আছে, বঙ্গবন্ধুর সেই অমোঘ ডাক হৃদয়ে নিয়ে আজ দাঁড়ানোর সময়। বিশ্বমানবতাকেও পাশে নিতে হবে। আমাদের লোক বেশি, সামর্থ্য কম। সবাইকে নিয়েই জয়ী হতে হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা পরিবারের আবেগ-অনুভূতির কদর করে বিএনপি নেত্রীকেও মুক্তি দিয়েছেন। প্রয়োজনে আরও কিছু ছোটখাটো অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তি দিন। এ বিপর্যয়ের পর কঠিন অর্থনৈতিক লড়াই। আমরা অর্থনীতিতে অনেক দূর গিয়ে হোঁচট খেয়েছি। আবার ঐক্যের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। দোষারোপের রাজনীতি বিরক্তিকর। পৃথিবীর কোথাও নেই। আমাদের দেশেও গুজব, মিথ্যাচার, বিকৃতি পরিহার করতে হবে। আইইডিসিআরের মুখপাত্র স্মার্ট মেধাবী জাতির সন্তান মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। সামর্থ্য অনেক থাকলেও সিম্পল, বলেন চমৎকার। পরীক্ষার ভিত্তিতে সরকারি তথ্যের বাইরে কীভাবে বলবেন? তাই বলে তার সাধারণ শাড়ি নিয়ে অসভ্য ট্রল জঘন্য বিকৃতি। সারা দেশে রোজ মৃত্যুর খবর আসছে। করোনার পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া বলবেন কীভাবে? সহনশীল হোন। ভুলত্রুটি যা হয়েছে বাদ দিন। লড়াই করুন। পশ্চিমাদের অবস্থা দেখুন। এত প্রশংসা, এত শক্তি, বলে কয়ে না আসা আকস্মিক এক জীবাণু করোনার আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়েছে লাশের পাহাড়ে। আমরাও কেউ প্রস্তুত নই। নিশ্চয় এ বিপর্যয়ে রক্ষা হলে পৃথিবী নতুন চিন্তার দরজা খুলে পথ হাঁটবে। সামরিক শক্তির চেয়ে নিজেদের পরাশক্তি আর যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা না ভেবে মানুষ হত্যার পথে না গিয়ে মানবজাতির জীবনের নিরাপত্তায় গবেষণা চিকিৎসায় মন দেবে। আমরাও বুঝলাম নিজেদের চিকিৎসা গবেষণার উন্নয়ন না হলে মহাবিপর্যয়ে বিদেশে চিকিৎসার পথও কত নির্মমভাবে বন্ধ হয়। এ কঠিন শিক্ষা। পরিবেশকে দূষণ ও তেজস্ক্রিয়তা থেকেই রক্ষা নয়, সমীহ করা। সেও ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নিতে জানে। আর দেশের সবকিছুর সঙ্গে নিজেদেরও পরিচ্ছন্ন থাকা, সচেতনতা বাড়ানোর এক তাগিদ। এখন লড়াই বিজয়ী হওয়া ও নতুন চেতনায় জাগ্রত হয়ে নতুন স্বপ্নের পথে হাঁটা।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

পূর্বপশ্চিম- এনই

পীর হাবিবুর রহমান
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close