• শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ২৭ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

করোনার ঝুঁকি সত্ত্বেও মানুষের পাশে যারা

প্রকাশ:  ২৭ মার্চ ২০২০, ০১:২৮ | আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২০, ০১:৩৯
নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনাভাইরাসের বিস্তার রুখে দিতে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছেন চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংবাদকর্মীরা। আক্রান্ত রোগীর ধরাছোঁয়ার মধ্যে থেকেও তাদেরকে নিরলসভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। সংক্রমণরোধে পর্যাপ্ত পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যবহার্য সামগ্রী কিছুই নেই তাদের। মনে নানা শঙ্কা এবং দায়িত্ববোধের কারণে পিছিয়ে যেতে চাচ্ছেন না। শঙ্কিত পরিবার পরিজন কর্তব্য কাজে বাধা দিচ্ছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্যও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে-কিন্তু দায়িত্ববোধ, সেবাব্রত আর মানবিকতাবোধ তাদেরকে কর্মস্থলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই ডাক্তার, নার্স, সাংবাদিক, র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ঝুঁকি জেনেও দায়িত্ব থেকে পিছপা হননি ফায়ার সার্ভিসকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স চালক, লাশ সৎকারকারী লোকজন, আয়া, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্ন কর্মীরা। কর্মস্থলে পর্যাপ্ত মাস্ক, গ্লাভস, অ্যাপ্রন, জীবাণুনাশক নেই, করোনা ঝুঁকি থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার নিশ্চিত কোনো ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যায়নি।

অনেক ক্ষেত্রে করোনা রোগীর আত্মীয়স্বজনরা পর্যন্ত পালিয়ে যাচ্ছে, করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশটাও গ্রহণ করছে না কেউ। কিন্তু সেখানেও এসব পেশার মানুষ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও মানবিকতা নিয়ে স্বজনদের মতোই দায়িত্ব পালন করে চলছে। হাসপাতালগুলোয় ডাক্তার-নার্সদের সবার কাছে এখনো পিপিই সুবিধা পৌঁছেনি, তারা সাধারণ অ্যাপ্রন, মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার করেই আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীদের সেবা দিয়ে চলছেন। ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে ভাইরাস জেনে বুঝেও আক্রান্ত রোগীর গা ঘেঁষেই চলছে তাদের দায়িত্ব পালন। করোনায় আক্রান্ত রোগী আসার খবর শুনে চিকিৎসাধীন অন্য গুরুতর রোগীরাও যখন হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যান, তখনো মাস্টাররোলে চাকরি পাওয়া আয়া পারুল, সাজেদা, মিনা আক্তারদের হাসপাতাল ত্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়। পরিচ্ছন্ন কর্মীরাও চরম ঝুঁকি নিয়েই করোনা রোগীর বিছানাপত্র, পরিচ্ছদ, ব্যবহার্য সামগ্রীর সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালনে বাধ্য হন। ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টগুলো দেখে নতুন ওষুধপথ্যের প্রেসক্রিপশন লিখে খালাস হলেও রোগীর গা ছুঁয়ে ইনজেকশন দেওয়া, ওষুধপথ্য সেবন করানোর ঝুঁকি চাপে নার্সদের কাঁধে।

আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ডা. এম মুশতাক হুসাইন বলেছেন, ‘করোনা আক্রান্ত রোগীর কাছাকাছি যাওয়া ডাক্তার, নার্স, আয়াদের মাস্ক, অ্যাপ্রন ও হ্যান্ডগ্লাভস থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ পিপিই ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এমনকি যারা হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট নানা কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তাদেরও পিপিই ব্যবহার করতেই হবে। নইলে তাদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না কোনোভাবেই।’

চিকিৎসা সেবায় সম্পৃক্ত ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয়, আয়ারা যতটুকু পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ব্যবহার করছেন-সেই সুবিধাটুকুও জুটছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংবাদকর্মীদের ভাগ্যে। দায়িত্ববোধ, মনোবল আর সচেতনাকে পুঁজি করেই তারা ছুটে চলছেন মরণঘাতী ভাইরাসটির সঙ্গে সঙ্গে। করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে সবচেয়ে জরুরি ভূমিকা পালন করে চলছেন সংবাদকর্মীরা।

এ ভাইরাসের গতি প্রকৃতি, সরকারের তাৎক্ষণিক নেওয়া নানা পদক্ষেপ, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের নতুন নতুন পরামর্শ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গৃহীত কর্মকান্ডের তাজা খবরা খবর সংবাদকর্মীরা পৌঁছে দিচ্ছেন সর্বত্র। নিজেরা সর্বক্ষণ যত্রতত্র ছোটাছুটি করলেও বুকে লাগিয়ে নিয়েছেন, ‘আপনারা ঘরেই থাকুন-সব খবর আমরাই পৌঁছে দিব’ লেখা পোস্টার।

প্রতিটি দুর্যোগে দেশের ক্রান্তিকালে সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেন সংবাদকর্মীরা, সব ধরনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তারাই থাকেন মাঠে। করোনা বিস্তারের এ বিপর্যয়েও প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক্স ও অনলাইন মিডিয়ায় কর্মরত সংবাদকর্মীরা বসে নেই। ন্যূনতম সতর্কতা ছাড়াই তারা ছুটছেন এয়ারপোর্টে নিচ্ছেন প্রবাস ফেরতদের ইন্টারভিউ তারপর ছুটে চলা হাসপাতালে করোনা রোগীর খোঁজে, সেখানে কথা হচ্ছে করোনার চিকিৎসা করা চিকিৎসক, নার্স, আয়াদের সঙ্গেও। তারপর আবার জনজটলার প্রেস বিফ্রিং। কখনো কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে, কখনো সেসব নিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ মিছিলে!

যে মুহূর্তে করোনার সর্বোচ্চ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে সবাই নিজ নিজ বাসা বাড়িতে নিরাপদ বসবাস করছেন ঠিক সে মুহূর্তেই সংবাদকর্মীদের অবিরাম ছোটাছুটি চলছে করোনার চারপাশে, মরণঘাতী ভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জনসমাগমস্থল, রাস্তাঘাট, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরের ইমিগ্রেশনে, হাসপাতাল ও কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে নিরাপত্তায় দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের জন্য করোনা প্রতিরোধী পোশাকের ব্যবস্থা পর্যন্ত করা যায়নি। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, সবাইকে নিরাপদে রাখার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা নিজেরা কতটুকু নিরাপদ? করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় কতটা আতঙ্কিত তারা?

এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি ট্রাফিক (উত্তর) সাইফুল হক বলেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করলেও দায়িত্বের কাছে তা তুচ্ছ। আমাদের এত মানুষের সঙ্গে মিশতে হয় যে স্বাভাবিকভাবে সংক্রমণ এড়ানো কঠিন। এরপরও যতটুকু সম্ভব নিরাপদে চলার জন্য সব পুলিশ সদস্যকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগ) মো. মাসুদুর রহমান জানান, ডিএমপিতে কর্মরত সব পুলিশ সদস্যকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পুলিশের পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) বলতে কিছুই নেই।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, পুলিশের কিছু ইউনিট নিজেরাই মাস্ক তৈরি করে সব ইউনিটে পৌঁছে দিচ্ছে। নিয়মিত সবাইকে সেলফ প্রটেকশনের বিষয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ব্রিফিং। তাছাড়া করোনা মোকাবিলায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালেও নানারকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

সূত্রাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ কাজী ওয়াজেদ তার ফেসবুকের পাতায় আবেগঘন স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, ‘অনেকের কাছে চরম ঘৃণিত, পান থেকে চুন খসলেই গালাগাল শোনা মানুষগুলোই আজ দেশবাসীর চরম বিপদের সময় আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। প্রতিনিয়ত মরার ঝুঁকি নিচ্ছি শুধুমাত্র আপনাদের পাশে থাকার জন্য। গোল্লায় যাই আমরা! গোল্লায় যাক আমাদের পরিবার!! তবুও আপনাদের ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছি না।’

সাঈদুর রহমান রিমন,করোনাভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close