• রোববার, ২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

করোনার বিরুদ্ধে যারা জীবন বিপন্ন করে লড়বে তাদের বীরের মর্যাদা দিন

প্রকাশ:  ২১ মার্চ ২০২০, ১৩:১৩
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)। ফাইল ছবি

ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট জনশূন্য নিষ্প্রাণ। পুরো শহরটা বিষাদে ছেয়ে আছে। সচেতন বেশীরভাগ মানুষ নিজেরাই স্বেচ্ছা বন্দী। স্মার্টফোনের যুগে বেশীরভাগ মানুষ চীন এবং ইতালির ভয়াবহতা থেকে জানতে পেরেছে আমাদের জন্য হয়তো আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। ইতোমধ্যে আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ডসহ বেশীরভাগ দেশ লক ডাউন করেছে এই রোগ যাতে ছড়াতে না পারে সেই চেষ্টায়।

পৃথিবীর সমস্ত দেশে আমাদের দেশের মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এয়ারপোর্ট বন্ধ করার সুযোগ নেই।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। যদিও দায়িত্ববান গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন ব্যক্তিবর্গ বরাবরের মতোই ঘোষণা দিয়েছিলেন করোনা মোকাবিলায় আমরা যথেষ্ট পরিমাণে প্রস্তুত। কার্যত দেখা গেছে ঠিক উল্টো চিত্র। ডাক্তারদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পোশাক নেই, মাস্ক নেই, ইকুইপমেন্ট নেই, করোনা টেস্ট করার কীট নেই, ভেন্টিলেটর নেই।

করোনা আতঙ্কে সাধারণের জন্য ভোগান্তি আরও বেশী, কোথাও মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে না, হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই।

এরই মধ্যে চলছে ভণ্ড আলেমদের ফতোয়াবাজি ও দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি লোক জমায়েত। অনেকের মতে উত্তরার দিয়াবাড়ি, আশকোনার হাজী ক্যাম্পের সাথে সাথে প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নিয়ে ভাঙ্গার অপেক্ষমাণ হাতির ঝিলের বিজিএমইএ ভবনটি আপদকালীন হাসপাতাল বা কোয়ারেন্টাইন সেন্টার করা হোক।

এই মুহূর্তে এগিয়ে এসেছে বুয়েটের ছাত্ররা হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানাচ্ছে, মাস্ক বানাচ্ছে এবং বিলাচ্ছে। তারা ফর্মুলাটা প্রকাশে দিয়ে দিয়েছে যাতে করে অন্যরাও বানাতে পারে। ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরাও এগিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেকেই এগিয়ে আসবেন।

পিপিই না থাকা সত্বেও নিজেদের প্রোটেক্ট করে মানুষের সেবা দেবার লক্ষ্যে নিজ উদ্যোগে, নিজ খরচেই এইসব বানিয়ে নিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের ১১ নাম্বর ইউনিট।

সবাই ঘরে ঢুকে গেলেও করোনার বিরুদ্ধে লড়াইটা ডাক্তার আর নার্সগণই করবেন। সাহসীরাই পাল্টে দেয়ার ক্ষমতা রাখে যেকোন পরিস্থিতি।

বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া নতুন করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ পরীক্ষার সহজ ও স্বল্পমূল্যের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে ডক্টর জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। আমাদের দেশের সোনার ছেলে ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রাঈদ জমিরউদ্দিন ও ড. ফিরোজ আহমেদ এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।

এরা আমাদের জন্য গর্বের, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার। আমরা দেশের উদ্বিগ্ন মানুষ আপনাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ।

জার্মানির একজন বৈজ্ঞানিক চরম ক্ষোভে বলছিলেন, ‘একজন খেলোয়াড় যত টাকা পায় তাঁদের নিয়ে যত মাতামাতি হয় আমাদের নিয়ে তা হয় না।’

আমাদের দেশেও যেন এই কথাটি সত্য।

কানাডাতে থেরেসা ট্যামের কথাই যেনো বেদবাক্য। ট্যাম কি বলেন, কি চান- তা শোনার জন্যই যেনো অপেক্ষায় থাকে পুরো সরকার, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। থেরেসা ট্যাম, কানাডা চীফ পাবলিক মেডিকেল অফিসার।

থেরেসা ট্যাম এবং তার টীমকে চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে দিতে চান না ট্রুডোর সরকার। সরকারের চাওয়া চিকিৎসকদের মনোযোগ কেবল চিকিৎসার দিকে, রোগীদের দিকে, গবেষণার দিকেই থাকুক। তাদের প্রয়োজন মতো সবকিছু সরবরাহ দেওয়ার দায়িত্ব সরকার নিজের কাঁধে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন। এই মুহূর্তে সরকার প্রধান হিসেবে জাস্টিন ট্রুডো সবার হৃদয়ে আর প্রার্থনায় আবারও জায়গা করে নিচ্ছেন নিয়ত। এই জায়গাটি মানবিকতার এই জায়গাটি একান্ত ভরসার।

দেশের এই ক্রান্তিকালে সবাই মিলেই লড়তে হবে। একা লড়ার কোন সুযোগ নেই। দেশের মানুষ এই মুহূর্তে মিথ্যার ফুলঝুরি ছোটানো ব্যক্তি বর্গের কথা শুনতে চায় না। বৈজ্ঞানিক, ডাক্তারদের কাছ থেকে আশ্বাস খুঁজে বেঁচে থাকার। এই মুহূর্তে মানুষ ক্ষমতার কাছে নয় সৃষ্টিকর্তার কাছে নতজানু হয় আশ্রয় খুঁজে। ডাক্তার আর চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাই একমাত্র ভরসা।

আমি ১৯৩৭ এর প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ দেখিনি, ১৯৪৫ এর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ দেখিনি। শত বছর আগে ঘটে যাওয়া কোন মহামারী দেখিনি। ১৯৭১ সুমহান স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখিনি কিন্তু ২০২০ এর করোনা প্রতিরোধের যুদ্ধ দেখছি। ভাইরাসের সাথে মানুষের যুদ্ধ। মানুষ কতোটা অসহায়। সেনাবাহিনী, পুলিশ, ডাক্তার, নার্স, চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং সাহায্যে এগিয়ে আসা সাধারণ মানুষ এই যুদ্ধে যারা নিজের জীবনকে বিপন্ন করে যারা অবদান রাখছে এবং ভবিষ্যতে রাখবে তাদের বীরের মর্যাদা দেওয়া হবে এখনই ঘোষিত হোক।

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ

খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close