• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

পিতার শততম শুভ জন্মদিন

প্রকাশ:  ১৭ মার্চ ২০২০, ০২:৩০
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

আজ তোমার শততম শুভ জন্মদিন। সারা দেশে পালিত হচ্ছে জন্মশতবার্ষিকী। কেন যেন আমাদের মাঝে আগের মতো সে আবেগ অনুভূতি নেই। কষ্ট হয়, কিন্তু কী করব? সময়ের দাবি উপেক্ষা করি কী করে? মাঝে মাঝে এও মনে হয় সেই কবে তুমি চলে গেছ, তোমাকে ছাড়া এতটা দিন কী করে কাটালাম। তুমি কেমন আছো, কীভাবে আছো সেটাও জানি না। কী জাদুই করেছিলে পরিচয়ের পর এক শ্বাসের জন্যও তোমাকে ভুলতে পারিনি। তাই সব সময় একটা সুপ্ত জ্বালা নিয়ে থাকি। অনেক সময় এসব থেকে মুক্তি চাই। কিন্তু কিছুতেই কিছু করতে পারি না। চোখ খুললেও তুমি, বন্ধ করলে তো খোলা চোখের চাইতে বেশি দেখি।

দীর্ঘ নির্বাসনে থেকে ’৯০-এ দেশে ফিরে বেশ কিছু তরুণ সাংবাদিক পেয়েছিলাম। নঈম নিজাম, সাগর, পীর হাবিব, সৈয়দ বোরহান কবীর, শেখ মামুন, শাহেদ চৌধুরী আরও কয়েকজন। ওরা অনেকেই আমার সঙ্গে অনেক জায়গা ঘুরেছে, অনেক কষ্ট করেছে। কেউ তো দিনের পর দিন, মাইলের পর মাইল হেঁটেছে। বাড়ি পালানো মানুষ, স্কুল পালানো ছাত্র আমি। পায়ে হাঁটা আমার সারা জীবনের স্বভাব। মুক্তিযুদ্ধের সময় কম করে সাড়ে ৪-৫ হাজার কিলোমিটার হেঁটেছি। মূলত সাহসী সহযোদ্ধা এবং প্রতিনিয়ত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়ানোয় পাকিস্তানি হানাদাররা আমার সঙ্গে পেরে উঠেনি। অনেকবার ভুয়াপুরে খবর পেয়ে হানাদাররা যাত্রা করে মাঝপথে জানতে পারে আমি নাগরপুরে পৌঁছে গেছি। আবার খোঁজখবর নিয়ে নাগরপুর অভিযান করবে করবে সময় শুনতে পায় আমি কালিয়াকৈরের কোথাও ধাইধাই করে ছুটে চলেছি। যে কারণে পাকিস্তান হানাদাররা কখনো আমার ওপর সুবিধাজনক আক্রমণ চালাতে পারেনি। যে কটা চালিয়েছে তার সব কটাতেই ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমার হাঁটা কোনো ব্যাপার না। কিন্তু আমার কারণে সাংবাদিকদের মাইলের পর মাইল হাঁটা বড় কষ্টের।

একবার নেত্রকোনা সফরে শেখ মামুনকে দেখেছিলাম, রাতে বিছানায় বসে নিজের পা নিজেই টিপছে। আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। কাকে যেন বলেছিলাম সরিষার গরম তেল মামুনের পায়ে লাগিয়ে দিতে। সেদিন নঈম নিজামের এক মারাত্মক লেখা পড়েছি, “হঠাৎ শুনলেন সব ব্যাংক লুটেরা করোনায় আক্রান্ত”। চমৎকার লিখেছে। সারা পৃথিবীতে করোনাভাইরাস নিয়ে এক তুলকালাম কান্ড চলেছে। শুধু ব্যাংক লুটেরা নয়, ব্যাংক লুটেরা, সুদখোর, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী কেউ বাদ নেই। ‘চিকিৎসার খুব একটা ব্যবস্থা নেই। বস্তায় বস্তায় লুটের টাকা হাসপাতালে এনে ফেলেছে। কিন্তু কেউ তা স্পর্শও করছে না যদি তাদেরও করোনা হয়। চিকিৎসার যন্ত্রপাতি নেই, চিকিৎসা করার ভালো লোকজনও নেই, বিদেশে যাবেন সব বন্ধ।’ চমৎকার।

এদিকে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক জনাবা মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা। ভদ্র মহিলাকে চিনি না। প্রতিদিন করোনা নিয়ে বুলেটিন দিয়ে দেশকে অবহিত করছেন। ভালো কথা। কিন্তু কেমন যেন দরদহীন কড়কড়ে কণ্ঠ। আরও খারাপ লাগল, বিদেশে যারা আছেন চট করে বলে দিলেন, ‘দেশে আসবেন না, যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন।’ কী নির্মম মানবতা লঙ্ঘন। দেশ দেশের মাটি শিশুর কাছে মায়ের কোলের চেয়েও প্রিয়। আর সেই জন্মসূত্রে নাগরিককে চট করে বলে দিলেন ‘কেউ দেশে আসবেন না। যেখানে আছেন সেখানেই থাকুন’- এও কি বলা যায়? এটা কোনো কথা হলো? আবার সেদিন বললেন, যাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে তারা নিজের বাড়িতে স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে না থাকলে শাস্তি দেওয়া হবে। কী বিপদ! করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো যন্ত্রপাতি নেই, তাপমাত্রা মাপার কয়েকটা যন্ত্র নিয়ে কী যে বাহাদুরি বলার মতো না। পিতা, তুমি হয়তো জান না মানিকগঞ্জের কর্নেল আবদুল মালেক, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় ঢাকা সিটির মেয়র এবং মন্ত্রী ছিলেন। তার ছেলে জাহিদ মালেক কী করে যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হলো ভেবে পাই না। আজকাল মন্ত্রী হতে রাজনীতি করতে হয় না। বেশি সংখ্যক ব্যবসায়ীই এখন এমপি-মন্ত্রী। তার কৃতিত্ব কী তাও জানি না। কিন্তু মন্ত্রী। দেশের এমন দুরবস্থা, পায়ের ওপর পা তুলে যেভাবে টিভি সাক্ষাৎকার দিচ্ছে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তোমার সময় আমরা দেশ ও জাতির সামনে ওরকম পা নাচাতে সাহস পেতাম না। পা তুলে বসলে টিভি ক্যামেরায় মনে হয় শ্রোতার মুখের দিকে পা করে আছে। যাক, এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। আল্লাহ যেভাবে রাখেন যে কদিন বেঁচে আছি সেভাবেই থাকতে হবে। তবে করোনা নিয়ে যে মাতামাতি দাপাদাপি তাতে ভিরমি খাওয়া ছাড়া উপায় কী? তোমার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আর কত ক্ষমতা, আইইডিসিআর-এর পরিচালক জনাবা মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরার ক্ষমতা মনে হয় তারচেয়ে বেশি। প্রথমত, চীন থেকে ১৬৩ জনকে বিমান পাঠিয়ে আনা হয়েছিল। তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছিল আশকোনা হজক্যাম্পে। করোনার প্রধান শর্তই হলো আলাদা থাকা। কিন্তু সেখানে ভেড়ার পালের মতো এক জায়গায় রাখা হয়েছিল।

চীনের উহান প্রদেশ থেকে যাদের আনা হয়েছিল তাদের কারও শরীরে করোনা ছিল না। তারা ১৪ দিন ক্যাম্পে ছিলেন। তোমাকে কী বলব, সেদিন হঠাৎ ভদ্র মহিলা বললেন, তিনজন করোনা রোগী পাওয়া গেছে। এ যেন সোনার খনি আবিষ্কার। তাদের কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যাওয়া হলো। পরের দিন বা তার পরের দিন শোনা গেল সিলেটের একজনের শরীরে করোনার আলামত নেই। রইল বাকি দুই। তিন দিন যেতে না যেতে গত পরশু বললেন, তাদের দুজনেরও করোনা হয়নি। যেখানে ১৪ দিন অবজারভেশনের দরকার, সেখানে ৩-৪ দিনের মধ্যে একবার করোনা ধরা পড়ল আবার করোনামুক্ত হলো। এটা কেমন ছেলেখেলা! তিনজন করোনা রোগী ধরা পড়েছে কথাটি প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে নাক-মুখ ঢাকার জন্য যত মাস্ক ছিল সব বিক্রি হয়ে গেল। সেই ছোটবেলা থেকে জেনেছি মানুষ কার্বন-ডাই অক্সাইড ছেড়ে অক্সিজেন গ্রহণ করে। গাছপালা কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ছাড়ে। মাস্ক পরলে মানুষ যে কার্বন-ডাই অক্সাইড ছাড়ে সে তো সেটাই আবার গ্রহণ করে। কার্বন-ডাই অক্সাইড ছেড়ে কার্বন-ডাই অক্সাইডই আবার গ্রহণ করলে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হবে নাকি অসুস্থ মানুষ সুস্থ হবে? সার্জেন্টরা অপারেশনের সময় মাস্ক পরে। সেটাও বেশ হালকা পাতলা। তাদের মাস্ক পরার উদ্দেশ্য অপারেশনের সময় রক্ত যাতে নাকে মুখে না লাগে। এখন দেখছি সারা জাতি মাস্ক পরে আছে। ছেলেবেলায় দেখতাম হালচাষের সময় যে গরু ডানে-বামে মুখ চালায় তার মুখে ঠোনা পরায়। এখন দেখছি পুরো বাংলাদেশের মুখে ঠোনা পরানো হয়েছে। স্বস্তি পাচ্ছি না। আরও স্বস্তি পাচ্ছি না, তিন করোনা রোগী ধরা পড়েছে ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মুজিব শতবর্ষের সব অনুষ্ঠান কাটছাঁট। বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদিকে তুমি জান না। ’৭৫-৯০ আমি যখন ভারতে ছিলাম তখন তিনি কোনো জাতীয় নেতা ছিলেন না। তাই আমার সঙ্গেও তার কোনো পরিচয় ছিল না। কিন্তু এখন সত্যিই তিনি একজন বিবেচনা করার মতো জাতীয় নেতা। তোমার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শ্রী নরেন্দ্র মোদির আসার কথা ছিল। প্রণবদা, সোনিয়া গান্ধী আরও কারও কারও আসার কথা। সব বন্ধ হয়ে গেছে। আজ কেউ আসবে না। কেউ একত্র হয়ে দোয়াখায়ের করবে কিনা, করতে পারবে কিনা বুঝতে পাচ্ছি না। এদিকে আবার আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা ১৪ মার্চ বলেছেন, ধরা পড়া তিনজনই করোনামুক্ত। কিন্তু মন্ত্রী বললেন, করোনা আক্রান্ত আরও দুজন পাওয়া গেছে। এ যেন সম্রাট শাজাহানের মুকুটের মূল্যবান কহিনুরের খবর পাওয়ার মতো ব্যাপার।

পিতা, তোমার প্রিয়রা তোমার শতজন্মদিনে কেউ-ই ভালো নেই। এখন সব নতুনের কারবার। তবু তারা দেশপ্রেমিক মানবিক গুণসম্পন্ন হলে কথা ছিল না। কিন্তু তেমন বলতে গেলে কেউ-ই নেই। সব তোমার মেয়ের কাঁধে সওয়ার হয়ে বাহাদুরি করছে। তোমার শততম জন্মদিন দেখতে পেলাম এও এক সৌভাগ্য। তুমিও তো বেঁচে থাকতে পারতে। মাত্র ৫-৬ দিন আগে ১০৮ বছরের এক ভদ্রলোককে দেখেছি। দিব্যি হাঁটাচলা করছে, হাসি-তামাশা করছে। তুমি থাকলে কতই-না ভালো হতো। আমরা তোমার আশপাশে ঘুরঘুর করতাম, কত আনন্দ-বেদনার কলতান তুলতে পারতাম। তোমার সঙ্গে শেষ দেখা ’৭৫-এর ১৪ আগস্ট রাত দেড়টায়। তারপর কী হয়েছে কিছুই জান না। তোমাকে যারা হত্যা করেছে তারা কত বাহাদুরি করেছে। আজ তাদের তেমন দেখা নেই। কিন্তু সেই সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিকভাবে অনেক লাভবান হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এখন একবার আওয়ামী লীগে ঢুকতে পারলেই হলো, সে কে, কী তার পরিচয় এসব নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। রাত দেড়টায় যেমন তোমাকে দেখতে গিয়েছিলাম, তোমার নির্মম হত্যার খবর শুনে সকাল ৬টার দিকে উন্মাদের মতো তোমার বাড়ির দুই বাড়ি পশ্চিম পর্যন্ত গিয়েছিলাম। এক ভদ্রলোক ছুটে এসে এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে হেঁচকা টানে তার ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন,

- কোথায় যাচ্ছেন?

- বঙ্গবন্ধুর বাড়ি।

- ওখানে গেলেই আপনাকে মেরে ফেলবে। গুলিতে উড়িয়ে দেবে।

ভদ্রলোক এক গ্লাস পানি দিয়েছিলেন। পিপাসা ছিল কিনা বলতে পারি না। পানি পান করে দরদর করে ঘামছিলাম। মনে হয় বোধশক্তি ফিরে পেয়েছিলাম। সেখান থেকে এসেছিলাম মোদাব্বের দাদুর বাড়ি। ছটফট করছিলাম, কী করি কী করি। লিফলেট ছেড়েছিলাম, “খুনিরা কামাল-জামাল-রাসেলকে হত্যা করতে পারলেও বঙ্গবন্ধুকে নির্বংশ করতে পারেনি। আমি তার চতুর্থ সন্তান। পিতৃহত্যার বদলা আমরা নেবই নেব।” সারা শহর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আলোচনাও হয়েছিল ব্যাপক। তোমার নেতারা কেউ সেদিন নেতার মতো আচরণ করেনি। পাঁচ দিনের দিন সবাইকে ফেলে ঢাকা ছেড়েছিলাম। সে যে কী দুঃসময় কাউকে বোঝানো যাবে না। কোথায় মা-বাবা, কোথায় ভাই-বোন কারও কোনো নিরাপত্তা নেই। তোমার মেয়েরা ছিল জার্মানিতে। তাই তারা বেঁচে গিয়েছিল। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল-জামালপুর। সেখান থেকে ৪০-৪৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে মেঘালয়ের মোহনগঞ্জের তন্তর সীমান্তে। সেখান থেকে শিলং, শিলং থেকে দিল্লি। ভারতের মহীয়সী নারী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ২৭ অথবা ২৮ আগস্ট রাত ২টায় দেখা হয়েছিল। তিনি মাথায় ও কাঁধে হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি বেঁচে আছ আমি খুশি হয়েছি। তোমাদের সম্মান রক্ষা করে যা করণীয় আমরা করব।’ গড়ে তুলেছিলাম প্রতিরোধযুদ্ধ। সেখানে অনেক নেতা সহযোগিতা করেছেন, অনেকে আবার বিরোধিতা করেছেন, বেশির ভাগ নীরব ছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, প্রায় ৩০ বছর পর কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটে। জয়প্রকাশ নারায়ণের উদ্যোগে সৃষ্ট জনতা পার্টি আসে শাসন ক্ষমতায়। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর জানি দুশমন মোরারজি দেশাই আমাদের তছনছ করে দেন। প্রায় ছয় হাজার প্রতিরোধ যোদ্ধাকে জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেয়। হাজার কয়েক পালিয়ে বেড়ায়, আরও হাজার দুই এদিক-ওদিক চলে যায়। আমাকে বন্দী করে আসামের পানবাড়ী সেনাক্যাম্পে রাখে। প্রায় এক মাস পর নয়া প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। প্রথম প্রথম তিনি খুব একটা ভালো আচরণ করেননি। অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়। ভারতীয় অফিসাররা ভাবতেই পারেননি একজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জোর গলায় কথা বলা যায়। সে দিন তাই হয়েছিল আমাদের দুজনের মধ্যে। মোরারজি দেশাই ইন্দিরাবিরোধী ছিলেন, তাই আমাদের বিরোধী। কিন্তু নীতিবান ছিলেন। তর্ক-বিতর্কের পর আমার সঙ্গে যেসব কথা হয়েছিল তার একটিও নড়চড় করেননি। ফোন করলে ফোন ধরা, চিঠি লিখলে তার উত্তর দেওয়া এমনকি চট্টগ্রামের যুবলীগ নেতা মৌলভী সৈয়দসহ বেশ কয়েকজন জিয়াউর রহমানের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিহত হলে মোরারজি দেশাই মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। এরপর জীবন বড় বোঝা হয়ে যায়।

অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর ’৯০-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরি। সে এক অভাবনীয় ব্যাপার। ঢাকার বিমানবন্দর লোকে লোকারণ্য হয়েছিল। অত লোক আগে কেউ কখনো দেখেনি। রাত ২টায় টাঙ্গাইল গিয়েছিলাম মা-বাবা এবং সদ্যপ্রসূত মেয়ে কুঁড়িকে দেখতে। তোমাকে বলা হয়নি, ’৮৪ সালের ২৫ জুন কুমুদিনী কলেজের অধ্যক্ষ নার্গিস হামিদ ও আবদুল হামিদ কোরায়শীর মেয়ে নাসরীন কোরায়শীকে বিয়ে করেছিলাম। সে এক তুলকালাম কা-! ওই যে স্বাধীনতার পরপর এ কে এম ওবায়দুর রহমান এবং আমাকে শাহ আজিজের বাড়ি পাঠিয়েছিলে তার বাসা খরচ এবং ভাড়া দিতে। পরে ওবায়দুর রহমান খুব একটা যাননি। ’৭৫ সালে তুমি নিহত হওয়ার মাসেও আমি শাহ আজিজুর রহমানের বাসায় টাকা দিয়ে এসেছিলাম। ’৭২ থেকে ’৭৫ দু-একবার তুমি দিয়েছ। মাঝে মাঝে লজ্জা করে তোমার কাছে টাকা চাইতে যাইনি। নিজে থেকেই প্রতি মাসে সাত হাজার টাকা দিয়ে এসেছি। সেই শাহ আজিজুর রহমান এক সময় বীরউত্তম জিয়াউর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি লোক পাঠিয়ে আমার স্ত্রীর পরিবারের সবার পাসপোর্ট আটক করেছিলেন। যে কারণে ’৮০ সাল থেকে ঠিক হওয়া বিয়ে ’৮৪ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত আটকে ছিল। আমার প্রথম সন্তান দীপের জন্ম ’৮৫ সালের ৯ ডিসেম্বর, ’৯০-এর ১০ ফেব্রুয়ারি কুঁড়ির আর আকাশ বাতাস থেকে পাওয়া আরাধ্য ধন কুশিমণি ২০০৫ সালের ১৫ নভেম্বর আসে আমাদের বুকে।

কুঁড়ির জন্ম হয়েছিল ১০ ফেব্রুয়ারি ’৯০। তাই মনে হয়েছিল ওর কপালগুণেই যেন মাতৃভূমিতে ফিরে এলাম। তাই কুঁড়ির পা ধুয়ে পানি খেয়েছিলাম। মা আর কুঁড়ির পা ধোয়া আমি পানি খেয়েছি। রাতেই ঢাকা ফিরেছিলাম। পরদিন টুঙ্গিপাড়া যাওয়ার প্রস্তুতি। প্রায় ৩০০ সঙ্গী নিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণসহ ১৮ ডিসেম্বর জীবনে প্রথম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া তোমার কবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। এখন তো কয়েক ঘণ্টায় টুঙ্গিপাড়া যাওয়া যায়। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে সময় অর্ধেক হয়ে যাবে। কিন্তু সে দিন সকাল ৭টায় রওনা হয়ে রাত ১টায় তোমার কবরে পৌঁছেছিলাম। একেবারে নোংরা গরুর গোয়ালের পাশে ছিল তোমার কবর। আমি দিশাহারা ছিলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক অঝোরে কেঁদেছিলাম। আমার ছোটমতো স্ত্রী আমাকে সামাল দিতে পারছিল না। তোমার পায়ের কাছ থেকে তুলে আনতে পারছিল না। অনেক কষ্টে রাত ২টায় তোমার বৈঠকখানায় বসেছিলাম। টুঙ্গিপাড়ার লোকজন পরম আত্মীয়ের মতো রাত আড়াই-৩টায় আমাদের সবাইকে খাইয়েছিল। তখন গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের মূল নেতা ছিলেন শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। এখন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী। পরে তার স্ত্রী অনেকবার খাইয়েছেন। বড় ভালো রান্নাবান্না তার। এখন তোমার টুঙ্গিপাড়া তুমিই চিনতে পারবে না। অফিস-আদালত, দালান-কোঠায় ছেয়ে গেছে। কিন্তু আগের মতো সেই প্রাণ চাঞ্চল্য নেই। মনে হয় সাধারণ মানুষের তেমন আকুতি নেই, দরদ-ভালোবাসা নেই। এসবের জন্য তুমি দায়ী নও, দায়ী আমরা। আমাদের ব্যর্থতা দেশবাসীর কাছে তোমাকে প্রিয় না করে কেমন যেন কিছুটা অপ্রিয়ই করে তুলছি। আজ যেখানে হওয়ার কথা ছিল বাঙালি জাতির সবচাইতে আনন্দের দিন, তোমার শুভ জন্মশত দিন। কিন্তু তেমন হলো না। একে তো করোনা নিয়ে মাতামাতি, অন্যদিকে সমগ্র জাতিকে একত্র করতে যে যত্ন বা পরিশ্রম করতে হয় তার বিন্দু-বিসর্গও করা হয়নি।

সে যাক, আজকের এই শুভ দিনে তোমার কাছে অনুরোধ, সরকার এবং তোমার দলের লোকজনরা শোনে না। দল ছাড়াও যে দেশে মানুষ আছে তারা ভাবেই না। তুমি দয়া করে তোমার কন্যাকে একটু বলো, স্কুল-কলেজগুলো কয়েক দিনের জন্য বন্ধ করে দিক। কদিন স্কুলে না গেলে আসমান ভেঙে পড়বে না। কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চাদের জীবন মহামূল্যবান। সেই মূল্যবান জীবন হারিয়ে গেলে আর পাব না। তাই স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দিতে বলো। আর বলে দাও, তোমার কন্যার বিদেশমন্ত্রী যেন বেশি কথা না বলে, রূঢ় কথা না বলে। আমাদের গরিব সন্তানরা বিদেশ থেকে টাকা না পাঠালে যাদের ফুটানি চলবে না, তারা যদি বলে বাঙালিরা বিদেশ থেকে ফিরে নবাবজাদা হয়ে যায়- এটা বলার মতো কথা?

আজ তোমার ধানমন্ডির ৩২-এর বাড়িতে ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী নিয়ে আসরের নামাজ আদায় করতে চাই। যে সিঁড়িতে তুমি পড়েছিলে সেখানে এর আগেও কয়েকবার নামাজ আদায় করেছি। অনেক বছর তোমার বাড়িতে যাওয়া হয়নি। বছর দশেক আগে ১৫ আগস্ট দুপুরে লন্ডন থেকে রেহানা ফোন করেছিল, ‘কাদের ভাই, আপনি কি ধানমন্ডির বাড়িতে গিয়েছিলেন?’ না, যাইনি বলতেই রেহানা বলল, ‘ও বাড়ি শুধু আমাদের নয়, ও বাড়ি আপনারও। পানি কাটলে ভাগ হয় না। আপনার স্থান আমাদের বুকের মধ্যে। আপনি এখনই যান।’ গিয়েছিলাম এবং আসরের নামাজ আদায় করেছিলাম। তারপর কখনো গেছি, কখনো আবার অনুমতি না পেয়ে ফিরে এসেছি। তাই ১০ তারিখ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাহ আলী ফরহাদকে ফোন করেছিলাম, ১৭ তারিখ পরিবারের সবাইকে নিয়ে পিতার বাড়িতে যেখানে তিনি পড়েছিলেন সেই সিঁড়ির পাশে আসরের নামাজ আদায় করতে চাই। ভদ্রলোক বলেছিলেন, কথাবার্তা বলে পরদিনই জানাবেন। এখনো জানি না, আদৌ তোমার বাড়িতে আসরের নামাজ পড়তে পারব কিনা, তোমার জন্য দোয়া করতে পারব কিনা আল্লাহই জানেন। আজ তোমার এই শুভ জন্মদিনে দেশবাসীর পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোমাকেসহ তোমার পরিবারের সবাইকে বেহেশতবাসী করেনÑআমিন।

লেখক : রাজনীতিক।

পূর্বপশ্চিম- এনই

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী,মুজিব বর্ষ,বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close