• শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু 

প্রকাশ:  ০৫ মার্চ ২০২০, ০৯:৩৭ | আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২০, ০৯:৫৮
ফারজানা ইসলাম লিনু

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু

" থাকবো না কো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে"।

দুনিয়া দেখার এই দুর্নিবার শখ আমার কুনোব্যাঙ স্বভাবের কারণে বাধাগ্রস্ত হয় সেই ছোট বেলা থেকেই। হিমালয়-আল্পস দূরে থাক, ঘর থেকে বেরিয়ে একটি ধানের শিসের উপর একটা শিশির বিন্দু দেখা হয় না ভালো করে।

শিশির দর্শন নিয়ে বিন্দুমাত্র আফসোস নেই আমার। সূর্যের হাসি, চাঁদের আলো, উত্তুরে বাতাস, দক্ষিণা মলয় এক চিলতে গৃহকোণে উঁকি দেয় নিত্য।

মাঝে মাঝে আবার আষাঢ়ে মেঘের ডাকে কুনোব্যাঙের মন ব্যাকুল হয়। তখন আর বাড়ির পাশের ডোবায় নয়, দরিয়ার পানিতে ঝাপাঝাপির সাধ জাগে।

বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় সাগর,পাহাড় দর্শনে বুচকা গুছিয়ে আমি তৈরি। কিন্তু সময় যত এগোয় আমার উদ্দীপনার উত্তাপ তত কমে। সফর শুরুর আগ মুহুর্তে পুরাই ফিউজ। ব্লাড প্রেসার নেমে যায়, বুকের ভেতর অশান্তির তুফান শুরু হয়।ভ্রমণ বাতিলের ব্যর্থ বাহানায় কাজ হয় না।

সঙ্গীদের কাছে আমার ঘরব্যাঙ স্বভাব খোলাসা হয়েছে ততদিনে। পাহাড়ে জঙ্গলে স্বস্তি লাগে না, সমুদ্রে পা ভেজাতে মন চায় না। হোটেলের লবিতে বসে সমুদ্রের গর্জন ও অপার সৌন্দর্য্য দেখে তপ্ত হৃদয় তৃপ্ত হয়।

ছানাপানাদের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য হয়ে একটু একটু করে সমুদ্রের কাছে গেলেও নীল জলারাশি আমারে টানে না।

নিরাপদ দুরত্বে দাঁড়িয়ে তর্জনী উঁচিয়ে সতর্ক সংকেত ও মহা বিপদ সংকেতের সাথে চলে কঠোর হুশিয়ারি, এই শেষ তোমাদের সমুদ্র দর্শন। আর যদি এ জীবনে তোমাদের নিয়ে সমুদ্রে এসেছি তো আমার নাম...........

পাহাড়ে, জঙ্গলেও সরিসৃপের ভয়। অহেতুক তটস্থতা ও উসখুসে অভিযাত্রীদল ত্যক্তবিরক্ত। নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করার দুর্ভিসন্ধিতে অপরাধীর কাঠগড়ায় আমি।

সফর সঙ্গীরা আমাকে প্রতিহত করতে বদ্ধ পরিকর। রুদ্ধদ্বার বৈঠকের অনঢ় সিদ্ধান্ত, পরবর্তী সফরে সঙ্গী করা হবে না কুনোব্যাঙকে।

কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা , "একা ছাড়বো না তোদের"।

ভ্রমণ সংকট উত্তরণে পুত্র কন্যাদের সাথে কোন সমঝোতা হতে না হতেই বাড়ি যাওয়ার দরকার পড়ে।

জার্নির ভয় তুচ্ছ করে তা ধিন ধিন তালে পিত্রালয়ে গমণের কারণে হেতু তিরস্কার আবার মাটিতে পড়ে না। পক্ষপাত দুষ্টতার দায়ে অভিযুক্ত হলেও সব অভিযোগ গায়ে মাখি না।

রাত জেগে আড্ডা, গল্প, মাস্তিতেও ক্লান্তি নেই। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে গ্রামের ধুলাবালি, আলো-বাতাস গায়ে মেখে একটি ধানের শিসের উপরের শিশির বিন্দু দেখতে আবার বেরিয়ে পড়ি।

হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের গন্ডি পেরিয়েছি অনেক আগে। চার কিলোমিটার দূরের কাঞ্চন পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পা রাখতেই দেখি সূর্য মধ্য গগনে প্রায়। তপ্ত দুপুরে ঘাসের শিশির ধুলায় মিশে একাকার।

মাত্র ক'বছর আগেও পন্ডিতমশাইয়ের চাটাইয়ের পাঠশালা ছিলো এখানে। তারপর রেজিস্টার্ড স্কুল।

হাকালুকি হাওর সংলগ্ন কৃষিজীবি ও মৎস্যজীবি পরিবারের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাই মুলত এই স্কুলের শিক্ষার্থী। গ্রামের বিত্তবানরা শহরমুখী। সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট বড় শহরে পাড়ি জমিয়েছেন আগেই।তাই বলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা কি পিছিয়ে থাকবে?

সরকারের আন্তরিক সহযোগিতায় রেজিস্টার্ড স্কুল সরকারি হয়েছে। সুদক্ষ প্রধান শিক্ষক ফারহানা ফেরদৌসীর নিয়োগে চেহারা ফিরেছে স্কুলের। আঘাটে ঘাট হয়েছে, আপথে পথ হয়েছে। সুবিধা বঞ্চিত শিশুরাও পাচ্ছে শিক্ষার ন্যুনতম আলো।

মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার, মুজিব বর্ষের আয়োজন, বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি ও ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল কর্মের সমারোহ ছোট স্কুলের প্রতিটা রুমে।

অপর্যাপ্ত চারুকলা সামগ্রী ও সরকারি অনুদানে প্রাপ্ত পাঠ্যবহির্ভূত বইগুলো থেকে শিশুরা শিখছে আপন আগ্রহে। বড় আপার (হেডমিস্ট্রেস) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিশুরা পড়ালেখার পাশাপাশি ছবি আঁকা ও সঙ্গীতের চর্চা করছে সাধ্যমতো। শিশুদের হাতে তৈরি মৃৎশিল্প শোভা পাচ্ছে শিক্ষক মিলনায়তনে।

এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঠেকায় না পড়লে কেউ আসবে না জ্ঞানের আলোর জ্বালাতে। শুকনা মৌসুমে যানবাহনের অপ্রতুলতা ও বর্ষায় ডিঙি নৌকাই ভরসা।

একেবারে ঘরের কাছের আধুনিকায়িত প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এই দুর্গম স্থানে কর্মস্থল পরিবর্তনের পেছনে একজন প্রধান শিক্ষকের পেশাগত দায়বদ্ধতা কাজ করলেও মানবিক দায়বদ্ধতা তিনি এড়াতে পারেন নি। কথায় কথায় জানালেন সহজে এই স্কুল ছেড়ে যাচ্ছেন না।

সবাই যদি শহরমুখি হয় তাহলে এইসব শিশুদের কি হবে?

নিবেদিত প্রাণ এক প্রধান শিক্ষিকার অক্লান্ত পরিশ্রমে সরকারি অনুদানের সুষম প্রয়োগ নিশ্চিত হচ্ছে। আলোর মুখ দেখছে অবহেলিত এই প্রতিষ্ঠান। স্কুলের শ্রী বৃদ্ধিতে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিও অনেক আন্তরিক।

সুবিধাবঞ্চিত কর্মজীবি শিশুদের জন্য আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইউনিয়ন পর্যায়ের কোন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ ছিলো না কিছুদিন আগেও। এখন এই শিশুরা যাচ্ছে উপজেলা পর্যায়ে। শীঘ্রই এই গন্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েও যেতে পারবে তারা।

আমার আচমকা উপস্থিতিতে বিস্মিত হলেও লেখক পরিচয় পেয়ে ভীষণ খুশি শিশুরা। স্বহস্তে বানানো ফুলের তোড়া দিয়ে অতিথিকে বরণ করতে এগিয়ে আসে জনা কয়েক শিশু। তাদের সৃষ্টিশীল শিল্পকর্মে রুচির ছাপ স্পষ্ট।

স্কুলের ক্লাস অসমাপ্ত রেখেই প্রতিদিন অনেক শিশু ছুটি নিয়ে চলে যায় বাপের সাথে ক্ষেতে কাজ করতে। কেউ বাপের জন্য খাবার নিয়ে যায় হাওরে। কেউ বা মাকে গৃহস্থালির কাজে সহায়তা করে।

কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে অংশ নিতে কতজন মাটি কাটার কাজ করে, বোরো ধানে সেচ দেয়। এক পেটে খায়, আধা পেটে সয়। তবুও তারা প্রত্যুষে বই হাতে স্কুলে আসে। সমাবেশে শুদ্ধ উচ্চারণে জাতীয় সঙ্গীত গায়, বিজয় ফুল বানায়।

"নীড় ছোট ক্ষতি নেই তাতে, আকাশ তো বড়ো।"

শত সীমাবদ্ধতার মাঝে এই শিশুদের আকাশটা অনেক বড় হবে একদিন। অভাব, অনটন ও অপ্রাপ্তি ডিঙিয়ে অদম্য গতিতে এগিয়ে যাবে বলে তারা।

ফারজানা ইসলাম লিনু, ৫ মার্চ, ২০২০ সাল

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

লেখক,ফারজানা ইসলাম লিনু
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close