• সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩ চৈত্র ১৪২৬
  • ||

নৈতিকতার স্খলনে সেলুলয়েডের কাছে হার মানে পাপিয়া সিনড্রোম

প্রকাশ:  ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:২৫ | আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:৩৮
কাজী নুসরাত শরমীন

রাজনীতির মাঠ এখন পাপিয়াকাণ্ডে সরব। ঢি ঢি পড়ে গেছে চারদিকে। অবশ্য এমনটাই তো হওয়ার কথা। যুব মহিলা লীগের নরসিংদী জেলার বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক পাপিয়া এদেশের দমবন্ধ রুগ্ন রাজনীতির বাই প্রোডাক্ট। সমাজ ধর্ষকামী, তাই পাপিয়ারা আজ আসন পেতে বসেছে। একটি যৌন বিকারগ্রস্ত সমাজে পাপিয়াদেরই তো ছড়ি ঘোরানোর কথা ! অবশ্য এখানে একথা খুবই যুক্তিযুক্ত যে, পাপিয়া বা সম্রাট একই মুদ্রার এপিট-ওপিট। দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ স্খলনের কোন সীমায় পৌঁছেছে, এটা তারই সিনড্রম। একটু তৃণমূলে যেতে চাই, তাহলে কেমন করে জেলা পর্যায়ে দলগুলো তাদের কর্মসূচী চালাচ্ছে ? কি তাদের কর্মী নির্বাচন প্রক্রিয়া ? নির্বাচনের আকাশে বঞ্চনার নানা কথা ভাসে। সে বাতাস ভারী হয় বঞ্চিত কর্মীদের হাহাকারে। যদিও লাভ-লোকসানের দর কষাকষিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ত্যাগী কর্মীরা হন পদবঞ্চিত। আর সেই সুযোগে দলে ঢুকে পড়ে এই পাপিয়া শ্রেণী। অবশ্য ইতিমধ্যে তাকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু ভূত যে সর্ষের ভেতরেই।

পাপিয়ার আয়ের অন্যতম উৎস নারীদের দিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ করানো। অনৈতিক কাজে বাধ্য না হলে তাদের নানাভাবে নির্যাতন করা হতো। বিকৃত যৌনাচার, নারী পাচার, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাম থেকে আসা মেয়েদের যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করা, জাল মুদ্রা সরবরাহ, বিদেশে অর্থপাচার এবং অবৈধ অস্ত্র রাখাসহ নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অনৈতিক কার্যকলাপের ভিডিও ধারণ করে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতেন তারা। এই অভিযোগগুলো যার বিরুদ্ধে, এমন একজন চতুর্থ শ্রেণীর দলীয় কর্মীর এতো এতো দুষ্কর্মের কথা নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা কিছুই জানতেন না ? শুধু তাই নয়, কার বা কাদের নাম ভাঙিয়ে, কাদের ছত্রছায়ার এতদিন চলেছে পাপিয়ার অপরাধ রাজত্ব ? যে হোটেলে এমন আসর বসতো, যে তারকা হোটেলের সুইমিং পুলে দলীয় নৃত্যের ভিডিও আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সয়লাব, পাপিয়ার এহেন দুষ্কর্ম যদি অপরাধ হয়, তবে এই দুষ্কর্ম নির্বিঘ্নে চলতে দেয়ার ক্ষেত্র সেই পাঁচ তারকা হোটেলগুলো এই অবৈধ কর্ম সম্পাদনে সহযোগিতার অপরাধে অভিযুক্ত নয় ?

প্রশ্ন এখানেই শেষ নয়। অপরাধী যেই হোক পাপিয়া বা যে কেউ, কেনো সেই সব অপরাধের ক্ষেত্রগুলো চুলচেরা বিশ্লেষনে আসছে না। কোন বিষয় যদি অবৈধ হয়, তবে সেই কর্মে সহায়তা, কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্র তৈরিও অবৈধ। কোথায় কোন হোটেলগুলোতে পাপিয়া মোটা অংকের বিল দিয়েছেন, তারা কেনো আইনের আওতায় আসবে না ? এবার আসি পাপিয়ার কল লিস্টে পাওয়া ১১ মন্ত্রী আর ৩৩ এমপি প্রশ্নে। তারা কারা ? একথা দুধের শিশুটিও জানে মন্ত্রী, এমপি’র ফোন নাম্বার পাওয়া কোনো ছেলে খেলা নয়। নাম্বার কল লিস্টে থাকা আর সেলফিবাজি এককথা নয়। কি কথা ছিলো দালাল পাপিয়ার তাহাদের সাথে ? সে রহস্য উন্মোচিত হবে কী ? যেহেতু পাপিয়ার পাপের তালিকা পুলিশের হাতে, তাই এই অপরাধ সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি, প্রতিষ্ঠান খোঁজা খুব দুরূহ কাজ নয় নিশ্চই। কিন্তু সেই আবার প্রশ্ন, ভূতটা ছাড়াবে কে ? ক্যাসিনোকাণ্ডে এত এত থলের বেড়াল বেরিয়ে আসার পর নেতাকর্মী পর্যায়ে দুর্নীতির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কতোটা জিরো টলারেন্স দেখাতে পেরেছে ? একটি গোয়েন্দা সংস্থা পাপিয়াকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে রিপোর্ট দেয়ার পর ধৃত হন পাপিয়া। এর আগে যারা পাপিয়া আশেপাশে ছিলেন, পাপিয়ার আসরে সভ্য হয়েছেন, সমস্ত দুষ্কর্মের সারথী ছিলেন, সব জেনেবুঝেও সুবিধা নিয়েছেন, চুপ ছিলেন, তাদের কে শাস্তি দেবে ? তাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়া সবচেয়ে জরুরি।

পাপিয়া কিন্তু একা নন। পাপিয়ার স্বামীর সুমনের থাইল্যান্ডে বারের ব্যবসা রয়েছে। তিনিও কিন্তু হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে আসেননি। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র-মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একাধিক মামলা বিচারাধীন। শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ব্লাকমেইল ছিল সুমনের প্রধান পেশা। ২০০১ সালে একটি প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আরোচিত হন সুমন। রাজনীতিবিদদের সাথে তার ঘনিষ্টতা আরও আগে থেকেই। যে রাজনীতিবিদরা পেলেপুষে পাপিয়া আর সুমনদের হাতে তৃণমূলের নেতৃত্ব ছেড়ে দিলেন, তারা কি অপরাধী নয় ?

ক্লাবঘর থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্ম হয়নি। এদেশের মেহনতি মানুষের হৃদয়ে যে বঙ্গবন্ধু রাজত্ব করতেন, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছেড়ে সাধারণ একটি বাড়িতে যে বঙ্গবন্ধু অতি সাধারণ জীবন-যাপন করতেন, অর্থ নয়, জ্ঞান-নিষ্ঠা, ত্যাগ আর প্রজ্ঞায় যে রাজনৈতিক দলটি মুক্তিকামী মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো, সেই আওয়ামী লীগ কোথায় আজ ? এক লুটেরা শ্রেণী ঘুণ পোকার মতো খেয়ে ফেলছে বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী এই দলটিকে। এটা মেনে নেয়া খুব কষ্টের। দেশের আর্থিক খাত আজ বিপর্যস্ত, ধ্বংস হয়েছে শেয়ার বাজার। বিনিয়োগকারীরা পথে বসেছে, ব্যাংকগুলোতে টাকা নেই। সর্বত্রই পাপিয়াদের রাজত্ব। রাজনীতির রুগ্ন দশাই পাপিয়াদের তৈরি করেছে। টানা ১১ বছরের ক্ষমতায় আলস্য আর ভোগ বিলাসে পেয়ে বসেছে ক্ষমতাসীন দলটির দৃশ্যমান এই স্খলিত অংশকে। তদবির, ফাইল বাণিজ্য, লোভ আর লুটপাটে ভেঙে গেছে সততা ও আদর্শিক রাজনীতি। দলীয় শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই আর। তাই পাপিয়া আজ আর ব্যক্তি পাপিয়া নন, রাজনীতি ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে এরা। দুর্নীতির মড়ক লাগা দেশ এখন পাপিয়া সিনড্রোমে আক্রান্ত। তাই পাপিয়া দৃশ্য বাংলা সিনেমাকেও হার মানায়। বিকৃত সাজে লাঠি হাতে বসে থাকা এমন দৃশ্য তো আমরা কেবল সিনেমাতেই দেখেছি ! নৈতিকতার স্খলন কোন পর্যায়ে নামলে বাস্তবতা সেলুলয়েডের কাছে হার মানে ?

লেখক : কবি ও সাংবাদিক।

রাজনীতি,পাপিয়া পিউ,কাজী নুসরাত শরমীন,সাংবাদিক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close