• শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

ধন্যবাদ প্রিয় ওবায়দুল কাদের

প্রকাশ:  ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৩৪
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

আজ ৩ ডিসেম্বর এক আনন্দময় দিন। ৩ ডিসেম্বর, ’৭১-এ আমি ছিলাম কেদারপুরে। ভারতীয় বিমানবাহিনী ৩ ডিসেম্বর রাতে প্রথম ঢাকায় বোমা ফেলে অনেক কিছু তছনছ করে দেয়। পাকিস্তানি যত স্যাবর জেট ছিল সবকটি এক হামলাতেই মুখ থুবড়ে পড়ে। রানওয়ের ওপর কাটা ফেলা হয়েছিল। যে কারণে তেজগাঁও বিমানবন্দরে এক দিনেই ওঠানামা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আকাশপথ হয়েছিল একেবারে পঙ্গু। আমরা ৩০ নভেম্বর প্রচ- শক্তি নিয়ে নাগরপুর থানার ওপর দুই দিন আক্রমণ চালিয়েছিলাম। অর্ধেক ব্যর্থ হয়ে কেদারপুর ফিরেছিলাম। তিন দিন আগে ভারত থেকে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী এসেছিলেন। আমি ধরা পড়ে গেছি এমন একটি উড়ো খবরে কেদারপুর শিবিরে সে এক ভয়াবহ কান্নার রোল পড়েছিল। ২ ডিসেম্বর বিকালে কেদারপুর ফিরলে সবার মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। কাউকে না পেয়ে কেউ যে কতটা যন্ত্রণা পেতে পারে তা আমাদের নেতৃবৃন্দের কেদারপুরের অভিজ্ঞতা আর আমার অমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল ধলাপাড়া চৌধুরী বাড়িতে অস্ত্র উদ্ধারে কমান্ডার মনিরের দলকে পাঠানোর পর অনেক দেরিতে তাদের ফেরায়। ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রথম অভিযান বারো আনা সফল হয়েছিল আমাদের সঠিক খবরের জন্য। আমাকে বিমানঘাঁটির চার-পাঁচ জন কর্মী নিখুঁতভাবে খবর দিয়েছিল; যার ফল ছিল নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানা। পরের কথা ডিসেম্বরে স্বাধীনতার মাসে কোনো জায়গায় নিশ্চয়ই বলব।

একটা আনন্দের ঘটনা বলি। ’৭০-এর নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু অনেক সভা করেছিলেন। আমিও তাঁর ১৫-২০টি সভায় উপস্থিত ছিলাম। এখন তো ১৯-২০ দিনের নির্বাচনী প্রচারণা। ’৭০-এর প্রচারণা ছিল প্রায় বছরব্যাপী। সকাল-বিকালে সভা হতো। দেশের লোক ছিল এখনকার অর্ধেকেরও কম। কিন্তু তখন বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর সভায় এখনকার যে কোনো সভার চাইতে ১০-১৫-২০ গুণ লোক হতো। আমি যেসব সভায় গেছি অনেক সময় দেখেছি বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ দিতেন তখন কেন যেন শুনতে শুনতে এমনিতেই মুখ খুলে যেত। যে কথা শুনতে চাইতাম বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে সে কথা বেরিয়ে আসায় আঁতকা হাঁ আরও বড় হয়ে যেত। বঙ্গবন্ধু নিজের কথা নয়, সব সময় মানুষের কথা বলতেন। তাই তিনি অত জনপ্রিয় হয়েছিলেন। সেদিন টিভিতে মৎস্যজীবী সমিতির সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য শুনছিলাম। পেশাজীবী সংগঠনের সম্মেলন নিয়ে আমি এমনিতেই বিরক্ত। কৃষক লীগে কৃষক নেই, ছাত্রলীগে ছাত্র নেই, যুবলীগে খুব যুবক নেই। আওয়ামী সব সহযোগী সংগঠনেই একই অবস্থা। থাবথুব জোড়াতালি দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগের সম্মেলন হয়ে গেছে। সেদিন মৎস্যজীবী সমিতির অনুষ্ঠান যখন দেখছিলাম তখন খুবই বিরক্ত লাগছিল। আমরা ভাতে-মাছে বাঙালি, কৃষক লীগ হয়েছে টাইপরা ভদ্রলোকদের নিয়ে। একটা ধানের চারা বুনলে কয়টা গাছ হয় অনেক নেতাই জানেন না। তারা হলেন কৃষক লীগের নেতা! ধানের সরকারি দর ১০৪০ টাকা। বিক্রি হচ্ছে ৫৫০-৬০০ টাকায়। নেতানেত্রীদের কিছুই করার নেই। কিন্তু তারা সম্মেলন করছেন বড় করে, জোরেশোরে। মৎস্যজীবী সম্মেলনের সমাপনীতে যখন ওবায়দুল কাদের বক্তৃতা করবেন ঠিক সেই সময় তিনি কী করে যেন বঙ্গবন্ধুর মতো আমার মনের কথা বলেছেন। আশপাশের কয়েকজন নেতা এবং বন্ধুদের নিয়ে বলছিলাম আমি মুসলমানের ঘরে জন্মেছি সত্য, কিন্তু আমার গুরু হিন্দু। আমার শিক্ষাগুরু দুখীরাম রাজবংশী। জেলেকে সাধু ভাষায় রাজবংশী বলা হয়। সেই জেলেদের নিয়ে টানাটানি। তাদের জন্মই মাছের মধ্যে। তার পরও যারা পুকুরে-খালে-বিলে মাছ চাষ করে সফলতা অর্জন করেছে তাদের নিয়েও যদি এই সম্মেলন হতো তাহলেও কিছু ভাবার ছিল। তার কিছুই হয়নি। কিন্তু যখন ওবায়দুল কাদেরের মুখে শুনলাম আসল মৎস্যজীবীদের আড়ালে রেখে যারা তাদের ওপর দাপিয়ে বেড়াতে মৎস্যজীবী না হয়েও সংগঠন করছেন তারা ভালোভাবে কাজ না করলে যে আশায় করছেন, তার গুড়ে বালি। ফাঁকিবাজদের নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে জায়গা নেই, কোনো সংগঠনে শুধু সুবিধা আদায়ের জন্য জায়গা হবে না। বহুদিন পর ওবায়দুল কাদেরের বাস্তব উপলব্ধি আমাকে যারপরনাই নাড়া দিয়েছে। আমাদের দুর্বলতাই হলো শ্রমিক সংগঠনে শ্রমিক নেই, কৃষক সংগঠনে কৃষক নেই, ছাত্র সংগঠন একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। যুব সংগঠনের অবস্থা তো দেখাই যাচ্ছে। আর মূল সংগঠনের সবাই টাকাওয়ালা। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম মূলত অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য, পাকিস্তানের ২১ জমিদার পরিবার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কেন যেন স্বীকার করতে হয়, পাকিস্তানের ২১ জমিদার পরিবারের হাত থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশে লাখো নব্য জমিদারের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের সম্পদ কিছু বিদেশে পাচার, বাকিটা রক্ষা করতে ব্যবসা ছেড়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। একেবারে গ্রাম পর্যায়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও উচ্চ পর্যায়ে রাজনীতি এবং সরকারি প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সেটা নয়, এটা একেবারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরিব অসহায় হয়ে পড়ছে। আইনের শাসন, ন্যায়নীতি সম্পূর্ণ ভাবনার বাইরে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো কিছু যে দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এটাই ভাবা যায় না। ৩০ নভেম্বর টাঙ্গাইলে ছিলাম। পৌর উদ্যানে লৌহজং নদ উদ্ধারে ঢোল-তবল পিটিয়ে তিন বছর পূর্তি করা হলো। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে লৌহজং নদের যেটুকু পরিষ্কার করা হয়েছিল, প্রশস্ত করা হয়েছিল তার এক-দেড় শ গজের মধ্যে টাঙ্গাইলের একসময়ের স্বনামধন্য এসপি পুলিশ লাইনসের পাশ দিয়ে জেলখানা পর্যন্ত নদ ভরাট করে ‘এসপি পার্ক’ করেছেন। একদিকে সরকারি টাকা খরচ করে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে লৌহজং নদ দখলমুক্ত করা, তার ১০০ গজ উত্তরে একসময়ের মহান এসপি নদ ভরাট করে এসপি পার্ক করেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তখনকার আইজি এসপি পার্ক নির্মাণে অর্থের উৎস জিজ্ঞাসা করেছিলেন। এসপি মহোদয় সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। আমতা আমতা করে বলেছিলেন, দানবীর লোকজনের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছেন। আর জেলখানার উত্তরে একটি এক্সিবিশন হয়েছিল। সে এক্সিবিশনের উদ্যোক্তারা অনেক অনুনয়-বিনয় করে এসপি সাহেবকে টাকাপয়সা দিয়েছিলেন। তা দিয়ে তিনি করেছেন। দুদক কতজনকে কতভাবে হেনস্তা করে কিন্তু এটা চোখে পড়ে না। অনেকেই বলেছেন, যে কোনো কাজ করলে সরকারি বরাদ্দ লাগে অথবা স্বেচ্ছাশ্রমে করতে হয়। এসপি পার্ক নির্মাণে কোনো সরকারি বরাদ্দও নেই, কোনো স্বেচ্ছাশ্রমও নেই। অন্যদিকে ডিসি লেক, সেখানে জেলার জন্য কাবিখা ও অন্যান্য প্রকল্পের টাকা খরচ করে ডিসি লেক করেছেন। ডিসি-এসপি সরকারি কর্মচারী। তাদের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান হওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু দেদার হচ্ছে। কে বলবে? সরকারের যদি এসব দেখার দৃষ্টি না থাকে তাহলে কারও কিছু করার নেই। অন্যদিকে টাঙ্গাইল জেলার নতুন পানির ট্যাংকের নিচে ইটপাটকেল দিয়ে কীসব করা হচ্ছে; তা যারা করছে তারাও হয়তো ভালোভাবে জানে না। টাঙ্গাইলের সবচাইতে বড় বধ্যভূমি জেলা সদরের পানির ট্যাংকের নিচে। লাল ইট দিয়ে কী করা হচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। অথচ তখন যেখানে যাকে পেয়েছে তাকেই গুলি করে মাটিচাপা দিয়েছে। কে এসব করছে কিছুই জানি না। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি বা দেখেছি তারা বেঁচে থাকতে তাদের কারও কাছে কেউ জিজ্ঞাসা করছে না। কত জায়গায় কত স্মৃতিসৌধ হচ্ছে। ক্ষমতাবানরা যে যা ভাবছে তাই হচ্ছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত স্থানগুলোর দিকে কোনো নজর নেই। কাদেরিয়া বাহিনী বহেরাতলিতে শপথ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। সেই বহেরাতলির কোনো নামগন্ধ নেই। এভাবে আর যা কিছু হোক মুক্তিযুদ্ধকে সম্মান করা হয় না, মুক্তিযোদ্ধাদেরও না। কিছুদিন যাবৎ মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন করে যাচাই-বাছাই হচ্ছে। কাদেরিয়া বাহিনীর যে সদস্যরা স্বাধীনতার পরপর তালিকাভুক্ত হননি তারা এখনো জটিলতায় ভুগছেন। বঙ্গবন্ধুর আমলে সরকারি তালিকার তেমন চেষ্টা হয়নি। তালিকার চেষ্টা জোরদারভাবে শুরু হয় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মুক্তিযোদ্ধাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে তাদের সাপোর্ট নেওয়ার চেষ্টা করেন, কিছুটা সফলও হন। শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রস্তুত। স্বাধীনতার পর প্রায় সব মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যে তঞ্চকতা করেছে পাকিস্তানি জল্লাদ-হানাদাররাও অতটা প্রতারণা করেনি। তালিকার জন্য কার কাছে কী কাগজপত্র আছে জমা দিতে বললে অনেকেই তা জমা দেয়। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর কাদেরিয়া বাহিনীর যারাই ছিল তাদের সিংহভাগ নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে; যেহেতু আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধে সক্রিয় ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা বলতে মুক্তিযোদ্ধারা তখন ঢোকে ঢোকে পানি খেতেন। কেউ নিজেকে কাদেরিয়া বাহিনী বলবেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দিয়েছেন বলবেন- এমনিই জান বাঁচে না। তাই জিয়াউর রহমানের পুরো সময় টাঙ্গাইলে অনেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে চাননি। তার পরও জিয়াউর রহমানের গোয়েন্দারা খুঁজে খুঁজে ধরে ধরে তাদের জেলে পুড়েছেন। এরশাদের আমলে ব্যাপারটা কিছুটা হালকা হয়ে এলেও মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। দেশে ফিরে ’৯৬-এর পরে সংসদে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা এবং মন্ত্রণালয় দাবি করলাম ধীরে ধীরে সরকার মন্ত্রণালয়সহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটা ভাতা দেওয়া শুরু করল। তখন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম ওঠা নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হলো। সেখানে আমার ইস্যু করা অনেক সার্টিফিকেট নতুন নেতারা অস্বীকার করতে দ্বিধা করেননি। কারণ সরকারের সঙ্গে আমার ওঠাবসা নেই। খুবই বিরক্তিকর। আগে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করার কারণে কাদেরিয়া বাহিনীর যোদ্ধারা জাতীয় তালিকায় নাম লেখাতে পারেননি। সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় এখন অনেকেই বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। অথচ মুক্তিযোদ্ধারা কোনো দলের ছিলেন না, কোনো মতের ছিলেন না। মুক্তিযোদ্ধারা সব সময় সব দল-মতের ঊর্ধ্বে, দেশের সম্পদ- সেভাবেই তাদের বিবেচনা করা উচিত। মুক্তিযোদ্ধারা কোনো চাকর-বাকর নন। কিন্তু সরকারি কর্মচারীরা তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন যে, অফিসার সাহেব-মনিব, মুক্তিযোদ্ধারা চাকর। বিশেষ করে উপজেলা সমাজকল্যাণ অফিসার যার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বিতরণ করা হয়। তিনি তো মুক্তিযোদ্ধাদের বাপ-চাচার চাইতেও বড় মাতব্বর। সমাজকল্যাণ অফিসের বারান্দায় মুক্তিযোদ্ধারা সারা দিন পায়চারি করে অফিসার সাহেবের দেখা পান না। কাউকে ১০টায় আসতে বলে অফিসার সাহেব ৩টায় আসেন- এটা আমার নিজের দেখা। এসব থেকে কবে যে পরিত্রাণ পাব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ৭৫ টাকা সম্মানী শুরু হয়েছিল। শহীদদেরও একটা ভাতার ব্যবস্থা ছিল। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ধীরে ধীরে ৭৫ টাকা থেকে হাজার দুই বা তারও একটু বেশি হলে আমার আপ্রাণ চেঁচামেচিতে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০০ থেকে এখন ১২ হাজার টাকায় এসেছে। আগে ভাতা পেতেন যুদ্ধাহতরা, তারপর মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খেতাবপ্রাপ্তদেরও সম্মানীর ব্যবস্থা করেন। এই সময় মারাত্মক এক গজব পড়ে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন এক রাজাকারের ছেলে। যখন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার জন্য সরকারি ভাতা মঞ্জুর হয় বা বরাদ্দ হয় তখন রাজাকারের ছেলে বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ শ্রীচাণক্যের মতো বলে বসেন, মুক্তিযোদ্ধাদের এই তিন স্তরের ভাতার যেটা সর্বোচ্চ বীর মুক্তিযোদ্ধারা শুধু সেটাই পাবেন। বর্তমানে যুদ্ধাহত সম্মানী সব থেকে বেশি। বীরপ্রতীক, বীরবিক্রম, বীরউত্তম এমনকি বীরশ্রেষ্ঠের চাইতেও যুদ্ধাহত ভাতা সামান্য বেশি। রাজাকারের ছেলে বিশ্বপ-িত সচিবের নির্দেশমতো দু-তিন বছর জটিলতা চলেছে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতার প্রধান কথা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা। তারপর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। তাই কেউ যদি যুদ্ধাহত ভাতা পান তিনি মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে যুদ্ধাহত হলেন কী করে? মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন বলেই যুদ্ধ করতে করতে কোনো না কোনো জায়গায় আহত হয়েছেন তাই তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। যারা বীরত্বসূচক খেতাব পেয়েছেন তারাও তেমনি যুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন বলে তাকে খেতাব দেওয়া হয়েছে। প্রথমে যুদ্ধাহতরা সম্মানী পেতেন। তিনি যেমন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তেমন যুদ্ধাহতও ছিলেন। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ছিল না বা সম্মানী ছিল না, তাই তারা পাননি। যখন মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হলো তখনো তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা পাননি, শুধু যুদ্ধাহত হিসেবে ভাতা পান। এ এক বেআইনি কাজ। সর্বোপরি শেখ হাসিনা সরকার যখন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী বরাদ্দ করে সেটা খেতাবপ্রাপ্তদের সম্মানী না দিয়ে এই তিন স্তরের সম্মানী যেটা সর্বোচ্চ সেটা দেওয়া আরও বেআইনি কাজ। একজন মুক্তিযোদ্ধা, তিনি অবশ্য অবশ্যই প্রথমে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী পাবেন। তারপর খেতাবপ্রাপ্ত হলে খেতাবপ্রাপ্তেরটা পাবেন, যুদ্ধাহত হলে যুদ্ধাহতেরটা পাবেন। যুদ্ধাহত এবং খেতাবপ্রাপ্ত যে কোনো মুক্তিযোদ্ধার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ওটা আলাদা ব্যাপার। সবাই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী পাবেন। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বেইজ ওটা না থাকলে কী করে যুদ্ধাহত হবেন আর কী করেই বা খেতাবপ্রাপ্ত হবেন! কেন যে রাজাকারপুত্র সচিবের কথায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়েছে বুঝতে পারছি না। স্বাধীনতার পর থেকেই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার একটা সম্মানী পেতাম। কয়েক বছর আগে শেখ হাসিনার সরকার খেতাবপ্রাপ্তদের সম্মানী ভাতা বরাদ্দ করেছে। বছর কয়েক আগে সেই রাজাকারের পুত্র সচিবের আগের দিকে মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী পেয়েছি। আজ কয়েক বছর শুধু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানী পাই। আফসোসের শেষ নেই। কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে যে সম্মানী দেওয়া হয়েছে কাউকে কাউকে দুটি-তিনটি, তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চটা পাবেন, বাকিটা কেটে নেওয়ার চিঠি দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এমন ছেলেখেলা ভালো না। এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : রাজনীতিক।

www.ksjleague.com


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত