• বৃহস্পতিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার বন্ধ না হলে সামাজিক বিপর্যয় রোধ করা যাবে না

প্রকাশ:  ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:৩৮ | আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:৩৩
আলমগীর শাহরিয়ার

বলা হচ্ছে এটা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কাল। পৃথিবী এর আগে তিনটি শিল্পবিপ্লব দেখেছে। যা পাল্টে দিয়েছে মানব সভ্যতার গতিধারা। এর একটি ছিল অষ্টাদশ শতকে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, দ্বিতীয়টি উনিশ শতকে বিদ্যুৎ, বিংশ শতাব্দীতে ইন্টারনেট। আর বর্তমানে একুশ শতকে ডিজিটাল বিপ্লব হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হিসেবে পরিচিত।

এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কালে আমাদের সমাজ একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যা খুব বেশি প্রযুক্তি প্রভাবিত। এর নানামুখী ঘাত অভিঘাত দৃশ্যমান। ভেঙ্গে পড়ছে সমাজের চেনা মূল্যবোধ, শৃঙ্খল, প্রথা ও পদ্ধতি। আদিম সমাজ ছিল কম বৈচিত্রময়। কিন্তু এখন সমাজ বিপুল বৈচিত্রময় আঙ্গিকে, আকারে ও প্রকারে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, সমাজের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্পর্ক বা মিথস্ক্রিয়া(reciprocal relation or interaction)। সমাজ পরিবর্তনের অর্থ হলো সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক বা মিথস্ক্রিয়ায় পরিবর্তন। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় নানা উপাদান, আচার, অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিবর্তন। এসব উপাদান যদি এমন হয় যে একটি গোঠা সমাজ কাঠামোর বিদ্যমান রূপ সম্পূর্ণভাবে বদলিয়ে দেয়ে তবে তা সমাজের আমূল পরিবর্তন হিসেবেই বিবেচিত। বিকাশমান প্রযুক্তি সমাজের সে আমূল পরিবর্তন ও মিথস্ক্রিয়ার এখন সবচেয়ে বড় মাধ্যম ও নয়া হাতিয়ার।

একাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ পরিবর্তনের নানা প্রচলিত মতবাদ রয়েছে। এগুলো ইতিহাসের দার্শনিক ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ক্যোঁৎ, স্পেনন্সার, হবহাউস, মার্কস, স্পেংলার, প্যারোটো, চ্যাপিন, সরোকিন, টয়নবি প্রমুখ সমাজ পরিবর্তনের নানা দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সমাজ পরিবর্তনের এসব তত্ত্বের অনেক কিছুই এখন আর খুব বেশি প্রাসঙ্গিক তা বলা যাবে না। তবে নিয়ত পরিবর্তনাকাঙ্ক্ষী সমাজ বাস্তবতা বোঝার জন্য কিছু কিছু এখনও বেশ প্রাসঙ্গিক।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কালে প্রযুক্তি পৃথিবীর দূরত্ব ঘুচিয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব সাধন করেছে। সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা পরিধিকেও সংকুচিত করেছে। বেড়েছে রাষ্ট ও পুঁজির প্রয়োজনে নাগরিক নজরদারি।

‘দূরত্ব যতই হোক, কাছে থাকুন’–বললেও এ কাছে থাকা যতোটা না ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তি ও সমাজের অন্তরঙ্গ মিথস্ক্রিয়ার তারচেয়ে ঢের বেশি পণ্যরতির বিজ্ঞাপন আয়োজনের। চাহিদানুসারে পণ্যের বিজ্ঞাপন ও বিপণন সহজ করতে যা যা প্রয়োজন নানা মাধ্যমে তার সবটাই করছে প্রযুক্তির স্বতন্ত্র সতর্ক চোখ।

স্প্যানিশ সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল ক্যাসেল বলছেন এটা ‘ইনফরমেশন এজ’। শ্রমঘন ভারীযন্ত্র শিল্পোত্তর বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশেষ করে সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকে এই ইনফরমেশন এজের বিকাশ ঘটেছে। ক্যাসেল একে নেটওয়ার্ক সোসাইটির উত্থান বলেও আখ্যায়িত করেছেন। যেখানে বৈশ্বিক জ্ঞানকর্মীরা (knowledge worker) কোন নির্দিষ্ট ভূগোলের গণ্ডিতে আটকে থাকবে না। বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের কর্মপরিধি সারা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে।

হালের ফ্রি-ল্যান্সিং একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে। প্রযুক্তি প্রচলনের এই সুফলের সঙ্গে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে কিছু প্রাথমিক ঘাত প্রতিঘাতও সমাজকে মোকাবেলা করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের মত সমাজ ব্যবস্থায়। যেখানে উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ ও মানসম্পন্ন শিক্ষার ঘাটতি বেশ প্রবল। তাছাড়া প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের মিথস্ক্রিয়ারও ব্যাপার আছে।

সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম এফ অগবার্নের সাংস্কৃতিক ব্যবধান(Cultural Lag) তত্ত্ব এক্ষেত্রে আলোচনার জন্য বেশ প্রাসঙ্গিক একটি থিওরি। প্রায় শতবর্ষ পূর্বে ১৯২২ সালে ‘Social Change’ নামক গ্রন্থে তিনি এ তত্ত্বের মাধ্যমে বস্তুগত ও অবস্তুগত সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন।

তিনি তার তত্ত্বে বলেন, সমাজে বস্তুগত সংস্কৃতি যে গতি ও হারে বৃদ্ধি পায় বা এগিয়ে চলে অবস্তুগত সংস্কৃতি সে তুলনায় অনেক ধীরে এগুতে থাকে। ফলে উভয় সংস্কৃতির মধ্যে একটি ব্যবধান ও দূরত্ব তৈরি হয়। ১৯২২ সালে ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন প্রযুক্তি আবিষ্কার না হলেও এ তত্ত্বে এই মুঠোফোন যন্ত্র প্রযুক্তি উদাহরণ হিসেবে বেশ প্রাসঙ্গিক। কেননা মানুষ, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে অভ্যস্ত নয়, খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত নয়। ফলে খাপ ছাড়া আচরণ সমাজে বিশৃঙ্খলা ও কোন কোন ক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করছে। আবার চেনা সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনেক কিছুকে চ্যালেঞ্জও করছে। ভাবনার জগত বদলে দিচ্ছে। যা প্রযুক্তিপূর্ব সময়ে বেশ অভাবনীয় ছিল। এক্ষেত্রে আরব বসন্তের উদাহরণ টানা যায়। যদিও আরব বসন্ত বা বিপ্লবের ব্যর্থতা, ফলাফলহীন গন্তব্য বা লক্ষ্য নিয়ে বিতর্ক অন্য বিষয়।

দূরশিক্ষণ, মি টু আন্দোলন ও অবরুদ্ধ নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। প্রযুক্তি বিকাশের ফলে প্রথাগত অনেক চাকুরি হারিয়ে অনেকে বেকার হয়ে পড়ছে আবার একই সঙ্গে এও সত্য যে নতুন নতুন অনেক কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে। ফ্রি ল্যান্সিংযের বাইরে আমাদের স্থানীয় বাজারে ‘উবার’ ‘পাঠাও’ সেবা তার বড় উদাহরণ।

গত দেড় দশকে দেশে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন, কম দারিদ্র্যের হার, শিক্ষার প্রসার এবং দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের সুবাদে আমাদের সমাজে প্রযুক্তিজ্ঞানে অদক্ষ একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে প্রযুক্তিও পৌঁছে গেছে। এর সুব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তিজাত নানা অসঙ্গতি দৃশ্যমান। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনেক সীমাবদ্ধতাও আমাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। যা প্রায়ই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা স্থিতিবস্থা ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য হমকি স্বরূপ।

নানা কুচক্রীমহল এই সুযোগ নিচ্ছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ ছিল লবণ নিয়ে গুজব। বাজারে লবণের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মজুত থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে রটানো হয় বাজারে পেঁয়াজের মত লবণ সংকট আসন্ন। মুহুর্তেই বাজারে বিভ্রান্ত ও শঙ্কিত মানুষের দৌড় শুরু হয়। দোকানে দোকানে মজুত থাকা লবণ উধাও হয়ে যায়। বিক্রি হয় বেশি দামে। যদিও প্রশাসনের তড়িৎ উদ্যোগ ও তৎপরতায়, মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।

কিন্তু ভোলার বোরহানউদ্দিনে ফেসবুক ইনবক্সের একটি লেখাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তার আগে ব্রাম্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরেও একই কায়দায় সহিংসতা উসকে দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে কালিমা লেপন করা হয়েছে। কক্সবাজার জেলার রামুর স্মৃতিও ভুলবার নয়। এভাবে দেশের নানা জায়গায় নানা সময় ফেসবুকের মাধ্যমে গোষ্ঠী বিশেষের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পায়তারা সফলও হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় বানচাল করার অপচেষ্টাও দেখা গেছে।

সাধারণ মানুষের সিংহভাগই টেকনোলজিক্যালি স্মার্ট না। শিক্ষিত ও সচেতন না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন বললেও অত্যুক্তি হবে না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নানা মহল সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কালে প্রযুক্তির নেতিবাচক ও আত্মঘাতী ব্যবহার রোধে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শিক্ষা ও ব্যাপক সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধির এখনই সময়। অন্যথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ সুনামির মতো হঠাৎ ধেয়ে আসা অনেক প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার বন্ধ না হলে সামাজিক বিপর্যয় রোধ করা যাবে না। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এআর

প্রযুক্তি,বিপর্যয়
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত