• বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

আওয়ামী লীগে বিতর্কিতদের বিদায় করার চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ:  ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০১:১৯
পীর হাবিবুর রহমান

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবিরাম দ্বার্থহীন কণ্ঠে বলছেন, দুর্নীতিবাজদের ছাড় নেই। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বারবার বলছেন, বিতর্কিতদের দলের কোথাও জায়গা হবে না। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে। বিতর্কিতদের দলের কোথাও রাখা হবে না- এমন বক্তব্যে আওয়ামী লীগই নয়, গোটা দেশের মানুষের মাঝে রাজনীতির প্রতি অনীহা-হতাশার কালো আঁধার সরিয়ে আশার আলো জ্বালিয়েছে। প্রত্যাশা জেগেছে। আওয়ামী লীগ কী সত্যি বিতর্কিত, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, তদবিরবাজ, দখলবাজ ও কমিটি বাণিজ্যের কারিগর ও অবৈধ কর্মকাে র সঙ্গে জড়িতদের বাদ দিয়ে দলের প্রতি নিবেদিত আদর্শবান ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব কেন্দ্র থেকে তৃণমূল ও সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করার কঠিন চ্যালেঞ্জটি নিতে সফল হবে? বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে আদর্শবানদের দলের সব স্তরের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা আওয়ামী লীগের কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হলে আওয়ামী লীগ তার আদর্শিক গণমুখী ঐতিহ্যের চরিত্র ফিরে পাবে, দেশের রাজনীতি প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে উঠবে। অন্য দলকেও এ পথ নিতেই হবে। এটা দলকে ও দলের নেত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা তুঙ্গেই নেবে না মানুষের ও রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ তীব্র হবে। রাজনীতিতে মেধাবী তরুণ প্রজন্মও যুক্ত হবে। তেমনি দেশে আদর্শিক রাজনীতি ফিরে আসবে।

সারাদেশের রাজনৈতিক সচেতন মানুষসহ সকল মহলের দৃষ্টি এখন আওয়ামী লীগের ২০ ও ২১ ডিসেম্বরের জাতীয় কাউন্সিল থেকে তৃণমুলের নেতৃত্বে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে পরিচ্ছন্ন আদর্শবান গণমুখী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জে মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা কতটা বিজয়ী হন তা দেখতে। পর্যবেক্ষকদের মতে এটা দূরূহ এক কাজ। দলের সাধারণ সম্পাদক পদে ওবায়দুল কাদের বহাল থাকলেও প্রেসিডিয়ামকে অভিজ্ঞ সারাদেশে পরিচিত ও জনপ্রিয় নেতাদের নিয়ে যেমন তৈরি করা প্রয়োজন তেমনি তরুণদের নিয়ে দলের সম্পাদক মন্ডলীকে শক্তিশালী করা দরকার। উপদেষ্টা মন্ডলীতে আলোচিত বরেণ্যদের সঙ্গে ওয়ার্কিং কমিটিতেও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের তুলে আনা অপরিহার্য্য।

সবার আশা দলের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত নতুন ওয়াকিং কমিটিতেই নয়, ঢাকা মহানগরীর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটি থেকে জেলা পর্যায়ে নেতৃত্বে বিতর্কিতদের মুখ আর কেউ দেখতে চায় না। বিতর্কিতরা এলে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান ও দলের শুদ্ধি অভিযানে অর্জন শেষ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে অনেক জেলা সম্মেলনে ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব আসতে দেখা যায়নি। জাতীয় শ্রমিক লীগে একজন ও ঢাকা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃত্বে বিতর্কিত দুজনের নাম ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে। একজন বঙ্গবন্ধুর খুনী ফারুকের অনুমোদিত কমিটিতে তার শ্যালকের সঙ্গে ছিলেন আরেকজনের দখলবাজ হিসেবে দুর্নাম। এক সময়ের ছাত্রলীগের মেধাবি সংগঠক হিসাবে আন্দোলন সংগ্রামের মুখ আফজালুর রহমান বাবুর মতোন ভদ্র বিনয়ী নেতাকে স্বেচ্ছাসেবকলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক করায় সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। দলে ক্লিন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার এ চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হতে হলে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকেই দলে আদর্শবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে দলের দীর্ঘদিনের যে বলয় বা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে তারা সহজে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও রাজনীতিনির্ভর বাণিজ্যের এ সাম্রাজ্যের পতন হতে দিতে চাইবে না। আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন থেকে এবারই প্রতিটি জেলা সম্মেলন এবং সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের পরিচ্ছন্ন বা ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে দলের আদর্শিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের সূচনা ঘটাতে হবে। পরিচ্ছন্ন নেতৃত্ব বের করে আনতে হলে বর্তমান বহাল কমিটিগুলোর ওপর নির্ভর করে আনা যাবে না। কেন্দ্র থেকে সার্চ কমিটির মতো করে যাচাই-বাছাই করেই আনতে হবে। তবে বিতর্কিতদের নেতৃত্ব তেকে অব্যাহতি দিলেও তাদের শোধরানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ফিরে আসার দরজা খোলা রাখা উচিত বলে অনেকে মনে করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, উপমহাদেশের রাজনীতিতেও আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী গণমুখী আদর্শিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলনে দেওয়া আবেগঘন বক্তৃতায় চমৎকারভাবে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম। বিশ্বে এই ধরনের একটি রাজনৈতিক দল বিরল।’ সৈয়দ আশরাফ অকালে চলে গেলেও তার আকুতি আজ সত্য হয়ে শুধু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীই নয়, গণমানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার জাতীয় চার নেতাসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীর রক্তে লেখা এ দলের ইতিহাস ত্যাগের, আদর্শের। সংগ্রামের ও গভীর দেশ প্রেমে মানবকল্যাণের।

আওয়ামী লীগ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন যৌবন কারাগার থেকে ফাঁসির মঞ্চ হয়ে রাজপথে আপসহীন লড়াইয়ের নেতৃত্বে ক্যারিশমায় গণরায় নিয়ে জাতিকে এক মোহনায় মিলিত করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বই দেয়নি, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মহান বিজয় নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নীলনকশায় অতি বিপ্লবীদের উগ্র হঠকারী রাজনীতির অশান্ত-অস্থির পরিবেশ আর দলের একটি উন্নাসিক অংশের দাম্ভিকতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একদল বিশ্বাসঘাতক বিপথগামী সেনাসদস্য মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকা- ঘটায়। সেদিন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত লাশ ধানমন্ডির বাসভবনে রেখে দলের ষড়যন্ত্রের খলনায়ক, বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর খন্দকার মোশতাক আহমেদ সশস্ত্র খুনিদের শক্তিতে অসাংবিধানিক, অবৈধ রাষ্ট্রপতি হয়ে সরকার গঠন করেন। আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য তার সঙ্গে যুক্ত হলেও সেই সময় হত্যাকান্ড প্রতিরোধ ও খুনিদের প্রতিহত করতে ব্যর্থ সব বাহিনী তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর পর যে চার নেতা সুমহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের রাতের আঁধারে কারাগারে হত্যা করা হয়। গোটা দেশে কারফিউ, অস্ত্র আর ভয়ের শাসন কায়েম হয়। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের নেতৃত্বে দলের তরুণ কর্মীরা পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রতিরোধযুদ্ধে ছুটে যান। অন্যদিকে আপস না করা দলের সারা দেশের সংগঠকদের কারাগারে নিক্ষিপ্ত করা হয়। কঠোর নির্যাতন চালানো হয়।

আর এদিকে ক্যু পাল্টা ক্যুর মধ্য দিয়ে সেনাশাসক জিয়াউর রহমান বিচারপতি আবু সাদাত সায়েমকে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগ করিয়ে নিজে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, প্রেসিডেন্ট, এক কথায় সব ক্ষমতার প্রভুতে পরিণত হয়ে আওয়ামী লীগের ওপর চরম নির্যাতন অব্যাহত রাখেন। সেই দুঃসময়ে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হয়। ছাত্রলীগকেও সুসংগঠিত করা হয়। ৭৮ সালের কাউন্সিলে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হন আবদুল মালেক উকিল, সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আবদুর রাজ্জাক। কারাগারে বসে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। এদিকে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের ইন্ধনে মিজানুর রহমান চৌধুরী ও নূরে আলম সিদ্দিকীদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি ক্ষুদ্র অংশ দলে ভাঙন নিয়ে আসে। তবুও সেদিন আবদুর রাজ্জাককে মধ্যমণি করে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির দর্শনে বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা সারা দেশে সংগঠিত হন। কারাগারে বসে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন ওবায়দুল কাদের, বাইরে থেকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন বাহালুল মজনু চুন্নু। বিরোধী দলের জন্য গণতন্ত্রহীন সামরিক শাসনকবলিত সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের সেই মার্শাল ল জমানায় কঠিন পরিস্থিতির মুখে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ায়। ছাত্রলীগ সারা দেশে জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়। একদিকে সামরিক শাসকের দমন-পীড়ন, অন্যদিকে অতিবাম, অতিবিপ্লবীদের অপপ্রচার ও বাধার মুখে দল এগিয়ে যেতে থাকলে আওয়ামী লীগের ’৮১ সালের ইডেন কাউন্সিলে দলের বৃহৎ অংশ আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে সুসংগঠিত থাকলেও আরেকটি অংশ তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে দাঁড়িয়ে যায়। সভাপতি পদে নেতৃত্বে লড়াইয়ে দল যখন ভাঙনের মুখোমুখি তখন ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দিল্লিতে নির্বাসিত মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

এক অন্ধকার সময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে ফিরে পরিবারের সব সদস্য হারানোর বেদনার ভারী পাথর বুকে চেপে আওয়ামী লীগকে নিয়ে নতুন সংগ্রামের সূচনা করেন। এর মধ্যে ’৮১ সালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগে ভাঙন ধরানো হয়। ’৮৩ সালে তার রেশ ধরে আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ বাকশাল গঠন করে বেরিয়ে যায়। তবু শেখ হাসিনা অমিত সাহস নিয়ে সামরিক শাসন থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করার পাশাপাশি দলকে গণমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলার নিরলস পরিশ্রম করেন। দীর্ঘ ২১ বছরের লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পর তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় দফা চূড়ান্ত বিকাশ ঘটান। মৃত্যুর সঙ্গে বার বার মোকাবিলা করে গণতন্ত্রের আন্দোলনে নির্ভীক নেতৃত্ব দিয়ে একুশ বছর পর দলকে ক্ষমতায় আনতে সক্ষম হন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে। এর আগে দলে ভাঙন ঘটিয়ে যারা নানা সময় চলে যান তাদেরও তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধভাবে ফিরিয়ে আনেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের কোথাও ঘরছাড়া, কোথাও হামলা-মামলায় নিঃস্ব করে দিতে থাকে। এমনকি একের পর এক দলের নেতাদের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে একুশের গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাকেও উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একদিকে বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন, অন্যদিকে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের কারা নির্যাতন ভোগ করে সব ষড়যন্ত্র নির্বাসনে দিয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা কারামুক্তই হননি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিকে এক প্লাটফরমে নিয়ে এসে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রজ্ঞা, মেধা, সাহস ও দক্ষতার নতুন নজির স্থাপন করে এক অন্য শেখ হাসিনা আবির্ভূত হন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে। দেশের অর্থনীতিকে বিস্ময়কর উত্থান ঘটিয়ে দুনিয়াকেই চমকে দেননি, দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে বিপ্লবই ঘটাননি, আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্র বিজয় করে সীমান্ত সমস্যার সমাধানও নিয়ে আসেন। বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একাত্তর ও পঁচাত্তরের খুনিদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন। এমনকি বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে তাদের অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে কানাডার আদালতের রায়ে জয় নিয়ে দেশ শাসনে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। যারা একদিন তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল তাদের কার্যত কূটকৌশলে নেতৃত্বহীন করে রাজনীতিতে পঙ্গু এতিম বা প্রতিবন্ধী বানিয়ে দুর্বল করে রেখে দিয়েছেন।

আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবার কাছে সত্য এটাই হচ্ছে যে, শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনাই। শেখ হাসিনা একদিনের জন্য সরে দাঁড়ালে গোটা দেশ রক্তগঙ্গায়ই ভাসবে না, চরম নৈরাজ্যের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হবে। শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। সর্বশেষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন। আওয়ামী লীগের একদল সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী, এমপি, নেতা, পরিবার-পরিজন এবং সুবিধাবাদী নিয়ে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেমন সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন করেছেন, তেমনি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের একদল এমপি, নেতা-কর্মী বেআইনি কর্মকান্ড, দুর্নীতি, তদবির, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও লুটপাটের মধ্য দিয়ে রাজনীতিকে রাজদুর্নীতিতেই প্রবেশ করাননি, আওয়ামী লীগের মতো একটি গণমুখী আদর্শিক দলকে প্রশ্নবিদ্ধই করেননি, কোথাও কোথাও দলকে গণবিচ্ছিন্ন করেছেন। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা তার দূরদর্শিতা দিয়ে তাই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ঘর থেকে মানে নিজ দল থেকেই শুরু করেছেন।

এদিকে দলের অভ্যন্তরে একদল বিতর্কিত নেতা-কর্মী তৈরি হয়েছে, তেমনি তাদের হাত ধরে গত ১০ বছরে সুবিধাবাদী বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতাও আওয়ামী লীগে প্রবেশ করে পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে লুটপাটকে মহোৎসবে পরিণত করেছে। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তার আপসহীন নীতিতে যেমন অটল, তেমনি বিতর্কিতদের দলের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে কার্পণ্য করেননি। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দলের জন্য দিবারাত্রি পরিশ্রম করে নিজের চিকিৎসার সময়টুকু বের না করায় রীতিমতো জমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন মানুষের দোয়ায়। সুস্থ হয়ে এসে আগের মতোই সরকার ও দলের জন্য নিজেকে নিবেদিত করে বলছেন, ত্যাগী, আদর্শিক নেতা-কর্মীদের দলীয় নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিভিন্ন দল থেকে যারা বিতর্কিতদের দলে ভিড়িয়েছিলেন তাদের বের করে দেওয়ার জন্য নির্দেশই দেননি, তালিকাও তৈরি করছেন। ক্ষমতার দম্ভে একেকজন এমপি, নেতা-কর্মী ক্ষমতার অপব্যবহার করে সন্ত্রাসকে যেমন প্রশ্রয় দিয়েছেন, মাদক বাণিজ্যকে যেমন আশ্রয় দিয়েছেন, তেমনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে দুহাতে অবৈধ অর্থ-বিত্তের মালিক হতে গিয়ে বিতর্কিত করেছেন।

আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের জাতীয়, কেন্দ্রীয় এবং তৃণমূলের সম্মেলন শুরু হয়েছে। কিছু অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিতর্কিত নেতাদের আগেই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

অনেকে মনে করেন। এসব সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটিতে যাতে সব সিন্ডিকেট প্রথা নির্বাসনে দিয়ে, বিতর্কিতদের ছুড়ে ফেলে ত্যাগী, আদর্শিক, পরিচ্ছন্ন বা ক্লিন ইমেজের নেতা ও সংগঠকদের খুঁজে বের করে দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করা না গেলে আওয়ামী লীগ তার আদর্শিক ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার করতে পারবে না।

পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলের অভিজ্ঞ, পোড় খাওয়া আদর্শিক নেতাদের নিয়ে একদিকে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করে তাদের মাঝে অপরাধী লুটেরাদের বের করে দিতে হবে। অন্যদিকে গত ১০ বছরে যারা সন্ত্রাস, দুর্নীতিতে ডুবেছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মন্ত্রী, এমপি, দলীয় পদবি বা রাজনৈতিক নিয়োগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়ে অঢেল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন তাদের তালিকা করে কোথাও কোনো সংগঠনে কোনো পদ-পদবিতে যাতে আসতে না পারে সেটি যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি অভিমানেই হোক, কমিটি ও পদ বাণিজ্যের কারণেই হোক আর সিন্ডিকেটের কমিটি ভাগাভাগির খেলার কারণেই হোক দল থেকে ছিটকে পড়া সব ত্যাগী নেতা-কর্মী, যারা পঁচাত্তরের পর থেকে ১৯৯৬’ ও ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দলের মহাদুঃসময়ে ভূমিকা রেখেছে তাদেরই কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে বসাতে হবে। তাহলেই দলে আদর্শবান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ যেমন বিজয়ী হবে, তেমনি দল জনপ্রিয় সাংগঠনিক সফলতা অর্জন করে গণমানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে। যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এমন কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম নেই জীবন দেয়নি, জেল খাটেনি, পুলিশের নির্যাতন ও প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়নি, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার, জাতীয় চার নেতা থেকে শুরু করে অসংখ্য নেতা-কর্মীর রক্তে ভেজা আওয়ামী লীগকে আদর্শিক নেতৃত্বনির্ভর রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে পারলে ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকেও সেই পথ নিতে হবে। এতে কেবল আওয়ামী লীগের রাজনীতি আদর্শিক রাজনীতি হবে না, অন্যরা অনুসরণের কারণে দেশের রাজনীতিতেই গুণগত পরিবর্তন আসবে। আওয়ামী লীগকে তাই জাতীয় সম্মেলন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত তার সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনে নির্লোভ, গণমুখী চরিত্রের, ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার বিপ্লব ঘটাতে হবে।

অনেকে মনে করেন, ’৭৫ পরবর্তী ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বাহালুল মজনুন চুন্নু, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, খ ম জাহাঙ্গীর, আব্দুল মান্নান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মুকুল বোস, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদরা নেতৃত্বদানকালে সারা দেশে যারা ছাত্রলীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারাই এখন সমাজে অভিভাবকত্ব করছেন। অনেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এদের অনেকের সাংগঠনিক দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকলে চলমান সিন্ডিকেট কমিটিতেই ঢুকতে দিচ্ছে না। এদের যারা এখনো রাজনীতি ও সমাজে ক্লিন ইমেজ নিয়ে আছেন, কোথাও ঠাঁই পাচ্ছেন না তাদের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তালিকা করে দলের সভানেত্রীর হাতে দিয়ে তার পরামর্শ রাখতে পারেন। শেখ হাসিনা নিজেও অনেককে ভালোভাবে চিনেন। অভিজ্ঞ প্রয়োজনীয় প্রবীণ, মধ্যম ও নবীনের সমন্বয় ঘটালেই দল লাভবান হবে। ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ সভাপতি থেকে বিদায় নেওয়ার পর দীর্ঘদিন অভিভাবকদের ভূমিকা পালন করছেন। এ জন্য তিনি একটি তালিকা তৈরি করে যাকে যেখানে প্রয়োজন দলের সভানেত্রীকে সেখানেই কাজে লাগানোর পরামর্শ দিতে পারেন। এটি তার দায়িত্বও। বিতর্কিতদের বিদায় ও আদর্শবানদের প্রতিষ্ঠিত দলের নেতৃত্বের কাঁধে এখন বড় দায়। এক্ষেত্রে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ অন্যরা তাকে সহযোগিতা করতে পারেন। একই সঙ্গে আনুপাতিকহারে দলের সকল স্তরে সৎ ত্যাগী ছাত্রলীগ ও পেশাজীবী সংগঠন করে আসা মেধাবি দক্ষ আলোকিত নারী নেতৃত্বের সুযোগও রাখতে হবে। যাকে তাকে নয়, সমাজ আলোকিত পরিচিত এবং ছাত্রলীগ করে ব্যাক গ্রাউন্ডার নেত্রীদেরই প্রাধান্য দিতে হবে। বিতর্কিতদের নয়। অযোগ্য অদক্ষকদেরও নয়।সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

পীর হাবিবুর রহমান,সাংবাদিক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত