• বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

ভিক্ষুক নয় এক মহৎ মানুষ

প্রকাশ:  ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:৩১
বাউল রিপন

ডাক্তার বলেছেন হাঁটতে। তাই ভাঙা পা নিয়েই হাঁটতে হচ্ছে। আমার সাথে তন্ময় তনু এবং জয়নাল আবেদীন। একাডেমী থেকে ক্লাশ শেষে বের হয়েছি আমরা তিনজন। তমালতলা হয়ে বসাকপাড়া, বজ্রাপুর, মৃধাপাড়া, মালগুদাম হয়ে গেইটপাড়।শফি মিয়ার বাজারে ঢুকতেই দুর থেকে শুনতে পেলাম অসাধারণ মায়াবী কণ্ঠের কোরআন তেলাওয়াত। এই কণ্ঠ অতি প্রিয়, অতি পরিচিত আমার কাছে। আমি তাকে ডাকি "হুজুর" নামে। তনু আর জয়নালকে দাঁড়াতে বললাম। কাছাকাছি আসতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো তার। তাকে চমকে দেবার ইচ্ছেতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমি। কাছে আসতেই বললাম, কি রহম আছেন হুজুর? আমার কণ্ঠে আনন্দে আত্মহারা তিনি। চিৎকার করে উঠলেন, আরে রিপন ভাই ! কবে আইছেন আফনে ইন্ডিয়া থেইকা? প্রায় ৬ মাস পর মুখোমুখি আমরা। কাছে এসে আমার ঘাড়ের দু'পাশে দু'হাত রাখলেন সাবলীল ভঙ্গিতে। কিন্তু চমকে গেলেন যেন! বললেন,কি ব্যাপার রিপন ভাই, আপনি এত শুকাইছেন ক্যান? আমি তাকে সংক্ষেপে আমার অসুস্থতার কথা জানালাম । এরই মধ্যে তনু তার নিজের মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে তার হাতে দিলো। জয়নাল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে এসব। আমার কথা শুনে ভীষন বিমর্ষ "হুজুর"। অবশেষে বললেন, কিচ্ছু হবো না আফনের রিপন ভাই। আল্লাহর রহমতে সুস্থ হইয়া যাবেন আফনে। আল্লাহ তার প্রিয় বান্দা গরে বিপদ-আপদ, বালা-মুসিবত দিয়া পরীক্ষা নেন। এরপর আমাকে উত্তর দিক হয়ে দাঁড়াতে বললেন। দাঁড়ালাম আমি। তিনি আমার পেছন দিকটায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত কয়েকবার হাত বুলিয়ে দিয়ে দোয়া করে দিলেন।

দুর থেকে, কাছে থেকে অনেকেই এসব দেখছিলেন! শেষে আগামী রবিবার তার এতিমখানায় দাওয়াত দিলেন আমাকে। বললেন, আমি যেন একবেলা এতিমদের সাথে একটু সময় দিয়ে আসি। সেখানে আমার জন্য তিনি দোয়ার ব্যবস্থাও করবেন। আমার ভীষন কান্না পেতে থাকলো। মানুষের ভালবাসা ছাড়া জীবনে আর কোন প্রাপ্তি নেই আমার। আমার ভালোর জন্য মানুষের আকুলতা আমাকে আবেগপ্রবনও করে দেয়। এতটা ভালবাসে মানুষ এটা ভাবতেই আরও কিছুদিন বাঁচতে ইচ্ছে করে এই সুন্দর পৃথিবীতে।

যারা জামালপুর সদরের মূল শহরের কাছাকাছি থাকেন তাদের প্রায় সবার কাছেই পরিচিত এই মানুষটি। পরিচিত তার কণ্ঠস্বর। অন্ধ তিনি। এই পৃথিবীর আলো, রূপ, আকার তার দৃষ্টি সীমানায় নিষিদ্ধ। প্রতিদিন তিনি শহরে আসেন না। বিশেষ করে শুক্রবার রাতে সন্ধ্যার পর জামালপুর শহরে বের হন তিনি। রাস্তার একপাশ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যান।কন্ঠে তার বাঁজতে থাকে পবিত্র কোরআন শরীফের আয়াত। আমি জীবনে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া অনেকের কোরআন তেলাওয়াত শুনেছি কিন্তু এমন মধুর স্বরের পাইনি কাউকে। তার কণ্ঠে যেন মধু ঝরে! এত দরাজ কণ্ঠ, যেন দুর থেকে ভেসে আসে সুমহান বার্তা। স্পন্দিন হয় চেতনা, শিহরিত হয় তনু-মন, অনূরনিত হয় অস্তিত্ব। লম্বা গাছ এলাকায় তিনি থাকলেও তার কন্ঠ শোনা যায় দয়াময়ী মোড় থেকে। যেন ইথারে ভাসে স্বর্গীয় উন্মাদনা। মাঝে মাঝে হামদ্ কিংবা নাত এ রাসূল গেয়ে যান তিনি। অতুলনীয় বোধ হয় আমার কাছে তার গায়কী, তার সুর। কুচকুকে কৃষ্ণ কালো বর্ণের এলোমেলো পোষাক পরিহিত অগোছালো মানুষটার ভেতরে সুরের এমন শক্তি, এমন অসাধারণ ক্ষমতা থাকতে পারে এটা না শুনলে, তাকে না দেখলে কারও বিশ্বাস হবে না। তার সুমধুর কণ্ঠের একজন প্রেমিক আমি। এমন মানবিক মানুষের একজন গুনগ্রাহী আমি। তাকে ভিক্ষা চাইতে দেখিনি কখনও।রাস্তার একপাশ ধরে হাঁটতে হাঁটতে যান আবার, অন্যপাশ ধরে ফিরে আসেন। অনেকেই বললে ভুল হবে অসংখ্য মানুষ তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন সাহায্যের। দেখলে মনেই হতে পারে অনেক টাকার মালিক তিনি। অথচ আজ পর্যন্ত তার পরনে ময়লা পাঞ্জাবী আর ময়লা লুঙ্গী ছাড়া ভাল কোন পোষাক দেখিনি কোনদিন। গভীরে ঢুকে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে জানতে গিয়ে খুঁজে পাই একজন মহৎ মানুষের ঠিকানা। নিজের ভিক্ষালব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি নিজে গড়ে তুলেছেন এতিমখানা। সেখানে ছোট ছোট এতিম, অনাথ অসহায় বাচ্চাদের নিজে কোরআন শরীফ পড়ান তিনি। তাদের লালন পালনের যাবতীয় দায়িত্ব তিনিই বহন করেন। হিংসা, প্রতিহিংসা প্লাবিত স্বার্থান্ধ সমাজে অনেক সামর্থবান আছেন যারা শুধুই আত্মকেন্দ্রিক। মানুষের বেদনভার যাদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে না। সেখানে, সেই সমাজেই একজন মানুষ ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে এতিমখানা গড়ে তুলেছেন।এতিমদের লালন পালন শিক্ষা প্রদান করে চলেছেন তিনি। জীবনের প্রকৃত সুখ আস্বাদনে এমন মহানুভবতা বিরল। যতবার ভাবি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে আমার।


পূর্বপশ্চিমবিডি/এস.খান

বাউল রিপন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত