• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

সাংবাদিক গ্রেফতারে পুলিশের তড়িৎ গতি দেখে আশ্চর্য হতে হয়

প্রকাশ:  ৩১ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:১০
আজহারুল আজাদ জুয়েল

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গত ২৪ অক্টোবর বীরগঞ্জ উপজেলার দুইজন সুপরিচিত সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সাংবাদিকগণ হলেন মোঃ আবেদ আলী এবং মোশাররফ হোসেন। নিজপাড়া ই্উনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ খালেক সরকারের দায়ের করা একটি মামলায় তাদেরকে গ্রেফতার করা হয় সেই দিন, যেদিন মামলাটি দায়ের হয়েছে। রাত সাড়ে আটটায় মামলার পর রাত ১১টার দিকে পুলিশ ঐ সাংবাদিকদের গ্রেফতার করেন। সাংবাদিক গ্রেফতারে পুলিশের এত তড়িৎ গতি দেখে আশ্চর্য হতে হয়। অথচ ঐ মামলায় আরও ৬জনকে আসামি করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়। তাদের কাউকে গ্রেফতার করার খবর এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত জানা যায় নাই।

মামলার প্রায় সাথে সাথেই বীরগঞ্জের পুলিশ দুই সাংবাদিককে তাদের বাড়ি থেকে ধরে আনার ঘটনায় মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, পুলিশ ঐ দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যে কোন কারণেই ক্ষিপ্ত ছিলেন এবং মামলা হলেই গ্রেফতার করা হবে এমনটা আগাম জেনে নিয়েই চেয়ারম্যান খালেক মামলা দায়ের করেছিলেন। গ্রেফতারের পরিকল্পনা নিয়েই মামলা করানো হয়েছে তা বলা যায় নিশ্চিতভাবে।

আবেদ আলী বীরগঞ্জে অন্তত ৩০ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছেন। সম্ভবত দৈনিক জনমত দিয়ে শুরু। পরবর্তী সময়ে দৈনিক করতোয়ায় কাজ শুরু করেন। অনলাইনেও কাজ করেন। একজন প্রবীণ সাংবাদিককে মামলা হওয়ার সাথে সাথে গ্রেফতারের কারণটা বোধগম্য নয়। বীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ সাকিলা পারভিন জানিয়েছেন, আটক দুই সাংবাদিক সাংবাদিকতার আড়ালে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের সাথে জড়িত। চাঁদা না দিলে মিথ্যা সংবাদ তৈরী করে ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করতেন।

ওসি সাকিলা পারভিনের এই অভিযোগ সত্য হলেও হতে পারে। এর জন্য মামলা হয়েছে, বিচার হবে। বিচারের রায় বিপক্ষে গেলে তারা জেল খাটবেন। কিন্তু তার আগেই তাদেরকে পুলিশ যেভাবে গ্রেফতার করে এনেছে, তাতে মনে হয় যেন তারা কোন দূর্ধর্ষ ডাকাত, গুন্ডা, খুনী, ছিনতাইকারি, লুটেরা ছিলেন! অথচ তারা ছিলেন সাংবাদিক। দীর্ঘদিনের এই সাংবাদিকদের এভাবে গ্রেফতারের মধ্যে কোন ধরণের প্রতিহিংসা কাজ করতে পারে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে ধারণা পোষণ করি। খুব অবাক লেগেছে এটা ভেবে যে, দুইজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হলেও বীরগঞ্জের সাংবাদিকগণ এর প্রতিবাদে কোন ভূমিকা পালন করেন নাই। দিনাজপুরে জেলা পর্যায়ে যারা সাংবাদিকতা করছেন তাদের অনেক সংগঠন, কিন্তু কোন সংগঠনের পক্ষ হতেই দুই সাংবাদিককে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে ন্যুনতম কর্মসুচি এমনকি একটি বিবৃতি পর্যন্ত দেয়া হয় নাই!

জাতীয় সংসদের সর্বশেষ নির্বাচনের আগে আগে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পার্লামেন্টে অনুমোদন করিয়ে নিয়ে প্রায় সাথে সাথেই কার্যকর করেছেন। ঐ আইন স্বাধীন সাংবাদিকতাকে খর্ব করবে এমন আশংকায় সাংবাদিকদের পক্ষ হতে তখন আপত্তি জানানো হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকদের আশংকার কোন কারন নেই।’ কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই বেশি ব্যবহার হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ ক’জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। এর ফলে কিছু ভুঁইফোর সাংবাদিক, যারা প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্থানে তোষামুদি করে চলেন তাদের জন্য ভালই হয়েছে। তাদেরকে প্রয়োজন মত ব্যবহার করিয়ে নেয়া যায়। তারা ইচ্ছেমত ব্যবহার হতেও রাজি থাকেন। তোষামুদি নিউজ করিয়ে নেয়া যায় তাদের দ্বারা। কিন্তু যারা সাহস করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখতে চান তাদের বিরুদ্ধেই ডিজিটাল আইনের খড়গ নেমে আসে এবং বিচারের আগেই তাদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, যেমনটি ঘটেছে বীরগঞ্জের দুই সাংবাদিকের ক্ষেত্রে সাধারণত পুলিশ ও প্রশাসনের সাথে সাংবাদিকদের একটা ভাল সম্পর্ক সব সময়ই থাকে। কিন্তু বিভিন্ন কারনে কখনো কোথাও সম্পর্কের অবনতিও হয়। সম্পর্কের অবনতি হলেই সাংবাদিককে কাবু করার জন্য মামলা-মোকদ্দমা দেয় হয়।

মামলা হলেই তো কেল্লা ফতে। সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা সহজ হয়ে যায়। এখন এসেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। পান থেকে চুন খসলেই বিপদ। সাংবাদিকদের ফাঁসানো এখন কোন ব্যাপার না। আর সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি তো আছেই। আবেদ যদি এক প্রেসক্লাবের সভাপতি হন তো, বীরগঞ্জের আরো একটি প্রেসক্লাবের সভাপতি অন্য একজন। একজন গ্রেফতার হরে আরেক জন খুব খুশি। এই অবস্থা দিনাজপুরে, সারাদেশে। বিভক্তিই সাংবাদিকদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতায় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে পারছেন না কেউ।

বীরগঞ্জের সাংবাদিক আবেদ হোসেনের ভুল-ক্রুটি থাকতে পারে। হয়তো অনেক অন্যায় তিনি করেছেন। যারা তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনেছেন, হয়তো সেই অভিযোগগুলো সত্য, কিন্তু প্রমাণিত নয়। অভিযোগ হলে আদালতে বিচার হবে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণের আগেই সাংবাদিকদের গ্রেফতারের কারনে পুরো সাংবাদিকতাই হুমকীর মুখে পড়ে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে কেন প্রতিবাদ আসছে না, বোঝা মুশকিল।

বাংলাদশে সাংবাদিকদের মধ্যে ভয়ংকর বিভাজন আছে। এর ফলে অন্যেরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারছে! কিন্তু সাংবাদিকরা নিজেরা নিজেদের রক্ষায় কোন অবস্থান নিতে পারছেন না। খুব দুঃখজনক।

আজহারুল আজাদ জুয়েল

সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

ই-মেইল: [email protected]

ফেসবুক: AZHARUL AZAD JEWEL

আজহারুল আজাদ জুয়েল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত