• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

মনপুরা: শেষ দফায় ছাত্র নেতার হাতেও...

প্রকাশ:  ২৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:০৬ | আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:১৭
মিজান মালিক

সকালে অনেকগুলো পত্রিকা দেখতে হয়। একজন সাধারণ পাঠক সকালের কাগজের কাছে যা চান, তাদের যে আবেদন, সাংবাদিক হিসাবে আমার কাছে হয়তো আরেকটু বেশি।‌ আরো ভালো কিছু পাঠকের হাতে দেবার তাগিদ। সাধারণত আমি যখন কাগজ হাতে নিই আমার সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয় ছেলেও পাশে বসে। খেলার পাতা তার পড়া চাই।‌ এরপর ভালো লাগলে অন্য শিরোনামেও চোখ দেয়।

আজকের সকালের খবরের কাগজে 'মনপুরার চরে মাকে ধর্ষণ, স্পিডবোটে শিশুর কান্না' শিরোনামে রিপোর্ট দেখে মা ও সন্তানের কষ্টকর ও ক্ষতবিক্ষত সময়ের একটা দৃশ্য তার মানসপটে ভেসে উঠে মনে হলো। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো- আব্বু আমি কী পুরো রিপোর্টটি পড়তে পারি!

আমি কী বলবো বুঝতে পারছি না। কারণ, এই রিপোর্টে নষ্ট মানুষের মুখোশটা বেরিয়ে এসেছে।‌ একজন মায়ের করুণ আর্তনাদ উঠে আসে।‌ একটা শিশুর নিরূপায় কান্না ভেসে উঠেছে।

লঞ্চ না পেয়ে যাত্রীবাহী স্পিডবোটে চারজন যাত্রী দেখে অনেকটা ভরসা নিয়েই আড়াই বছরের শিশুকে বুকে আগলে মা ওই বোর্টে ওঠেন।‌ গন্তব্য চরফ্যাশন থেকে মনপুরা। উদ্দেশ্য- দিনমজুর স্বামীর সাথে দেখা করা। হয়তোবা একটা ভালো সময়ের অপেক্ষা ছিলো দুজনের। বাবা দেখতে পাবেন সন্তানের মুখ। স্ত্রীর আবেগী দৃষ্টি।

যে চার যাত্রীকে পেয়ে স্পিডবোর্টে উঠেন ২৪ বছর বয়সী ওই নারী মাঝপথে চালকের সহায়তায় সে বোর্ডটি থামিয়ে নারীটিকে জোর করে চরে নিয়ে যায় চার যাত্রী। সে সময় তার কোলে থাকা শিশুটি চিৎকার করে মা মা বলে কাঁদছিল। শিশুটি মায়ের জন্য ছটফট করছে। আর মানুষের মতো দেখতে চার যাত্রী চরে নিয়ে নারীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।‌ নারীর সেই নিষ্ঠুর সময়ের কান্না কারো কাছেই পৌঁছায়নি।

চারজনের হাতে ধর্ষিত নারীর বিপদের খবরটি শুনে স্পিডবোটের মালিকের উচিৎ ছিলো, তার নৌযানের চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। চার যাত্রীকে আইনের হাতে তুলে দেয়া। কিন্তু না। এরপর যা ঘটেছে তা আরও ভয়ংকর। খবর পেয়ে স্পিডবোর্টের মালিক সাকুচিয়া ইউনিয়নের ছাত্র লীগের সাবেক সভাপতি, ছাত্র নেতা নজরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে যান। তিনি প্রথমে ধর্ষণকারী চার যাত্রীকে মারধোর করে তাড়িয়ে দেন। এরপর অসহায় ধর্ষিত নারীকে চরের ভেতর তিনিই আবার ধর্ষণ করেন। শুধু তাই নয়, তার বোর্টের চালককে দিয়ে ধর্ষণের চিত্র মোবাইলে ধারন করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়ার হুমকিও দেন।‌

ঘটনা শনিবারের। ওইদিন রাতে ওই নারী ছাত্রলীগের নেতা, তার চালক ও চার যাত্রীর বিরুদ্ধে মনপুরা থানায় মামলা করেন।‌

আমার ছেলে জানতে চাইল, সে এ নিউজটা পড়বে কীনা। আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। কারণ সমাজের এই অন্ধকার দিক এই ক্ষত সম্পর্কে তাদের মতো অবুঝ শিশু কিশোরদের কোনো ধারণা নেই। আলো ঝলমল হেমন্তের শুভ্র সকালে কে চায় মন খারাপের দিন শুরু করতে!!

কিন্তু আমাদের করতে হয়। কারন, আমরা মনে হয় একটা নষ্ট সময় পার করছি। আমাদের বিবেকের শেকড়ে পচন ধরেছে। যাদের বিশ্বাস করে এক অবলা নারী পৌঁছতে চেয়েছিলেন গন্তব্যে, তারাই হয়ে উঠলো নরপশু। ধর্ষক। আর ছাত্র নেতা যেখানে নিপীড়নের শিকার নারীকে উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে নেয়া বা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা উল্টো তিনিও ঝাঁপিয়ে পড়লেন ক্ষতবিক্ষত বিপন্ন নারীর ওপর।

ওই নারীর সব আজ শেষ হয়ে গেল। এখন দেখার বিষয় পুলিশ অপরাধীদের বাঁচাতে কোন রকম রাস্তা তৈরি করে কীনা। কারন ‌এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে যে, ধর্ষিত নারীকে পতিতা বানিয়ে ধর্ষকদের রক্ষা করার চেষ্টা চলে ।‌ এই ঘটনায় সে রকম কিছু না করে নেতাছাতা সব কয়টাকে ধরে জেলে দিন। এদের বিরুদ্ধে চার্জশিট হবে। বিচার হবে। এখন এটা চাওয়া ছাড়া নির্যাতনের শিকার নারী বা তার স্বামীর কি-ই বা চাওয়ার আছে!

আড়াই বছরের যে শিশুটি দেখলো তার মাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, মা পেছনে তাকাচ্ছে তার বিলাপ করছে, শিশুটি নিজেও কাঁদছে- তার কাছে আমরা কী জবাব দেব জানি না।

লেখক: কবি ও গীতিকার/ বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক যুগান্তর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত