• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

নুসরাত হত্যার বিচার ও একজন আইনজীবীর মহানুভবতা

প্রকাশ:  ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৪২
মুহাম্মদ সাইদুজ্জামান আহাদ

মাত্র ৬১ কার্যদিবসে, ছয় মাস সময়ের মধ্যে ফেনীর নুসরাত হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে, ষোলো আসামীর সবাইকে ফাঁসির সাজা দিয়েছেন আদালত। গণমাধ্যম শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে গেছে এই ঘটনাকে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরে পুলিশও কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে অপরাধীদের গ্রেফতারে। বিচারকেরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করেছেন, সর্বস্তরের মানুষজন নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন এই নৃশংস ঘটনার।

তবে এতজনের ভীড়ে আজকের দিনে একটা মানুষকে বিশেষ ধন্যবাদ দিতেই হবে। তার নাম অ্যাডভোকেট শাহজাহান সাজু, নুসরাতের মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী ছিলে তিনি। পুরো মামলা লড়তে তিনি বা তার সহকারীরা কেউ একটা পয়সাও পারিশ্রমিক নেননি, সাক্ষাৎকারে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরাও বলেছেন তার কথা, ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাকে।

এবছরের ২৭শে মার্চ নুসরাতের মা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করেছিলেন, সেই মামলার আইনজীবী ছিলেন সাজু। নুসরাতকে যখন পুড়িয়ে মেরেছিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ্য সিরাজউদ্দৌলার সাগরেদরা, তখন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল পুরো দেশের মানুষ, ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সবাই। শাহজাহান সাজুও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। নুসরাতের মৃত্যুর পর তার ভাই বাদী হয়ে হত্যামামলা দায়ী করেন, সেই মামলাতেও যুক্ত হন তিনি।

এরপরে গত ছয়মাস ধরে একটা লড়াই করেছেন শাহজাহান সাজু, নুসরাতের পরিবারকে ন্যায়বিচার এনে দেয়ার লড়াই। রাষ্ট্র পাশে ছিল, আইন ব্যবস্থাকে সঙ্গে পেয়েছেন, সেইসাথে ছিল পাবলিক সেন্টিমেন্টও। সেসবকে সঙ্গে নিয়েই অপরাধীদের আইনজীবিদের সাজানো গালগল্পের বিরুদ্ধে আদালতে লড়ে গেছেন তারা। বারবার নুসরাতের হত্যাকাণ্ডকে ‘আত্মহত্যা’ বলে দাবী করেছে অপরাধী পক্ষের আইনজীবীরা, কোর্টরুমে বিশৃঙ্খলা করে নুসরাতের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে। ঠান্ডা মাথায় সেসবের মোকাবেলা করেছেন অ্যাডভোকেট সাজু এবং তার সঙ্গীরা।

নুসরাতের মামলা চালাতে গিয়ে গত ছয় মাস ধরে কোন টাকা নেননি আইনজীবিরা, বিনা খরচেই এগিয়ে নিয়েছেন মামলার কার্যক্রম। শাহজাহান সাজু বলছিলেন- “আমার নিজের তিনটা মেয়ে আছে, তারা লেখাপড়া করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায়। আর কোনো মেয়েকে যেন স্কুল-কলেজে গিয়ে এমন নির্মমতার শিকার হতে না হয়। সেজন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আসামিদের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের জন্য আইনি লড়াইয়ে লড়েছি। এতে পারিশ্রমিক নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।”

মামলার কাজটা যথেষ্ট কঠিন ছিল, সেটাকে আরও কঠিন করে তুলেছিলেন আসামীপক্ষের আইনজীবীরা। সাজু বলছিলেন- “এই মামলাটি পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনীজীবীরা অনেক সময় কোর্টের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করেছেন। কিছু আইনজীবী অশোভন আচরণও করেছেন। নিজের মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে নুসরাতের জন্য লড়ে গেছি, কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করিনি।”

দিল্লির নির্ভয়া ধর্ষণকাণ্ডের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এভাবেই নির্ভয়াকে বিচার এনে দেয়ার জন্যে একত্রিত হয়েছিল মানুষ। কোনরকমের কংক্রিট এভিডেন্স ছাড়াই পুলিশ নেমেছিল দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া অপরাধীদের খুঁজে বের করতে। দিল্লি থেকে কলকাতা, সব জায়গাতেই প্রতিবাদ হয়েছিল নৃশংস এই ঘটনার। বাংলাদেশে কোন ঘটনায় আমরা এভাবে একত্রিত হতে পারিনি, এই প্রথম বোধহয় সম্ভব হলো সেটা।

আইনজীবী আর পুলিশ, এই দুই পেশার মানুষজনকে আমাদের সমাজে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখে। পুলিশ ঘুষখোর, আর উকিল মিথ্যেবাদী- এই ধারণাটা অনেকের মধ্যেই বদ্ধমূল হয়ে আছে। বলা হয়, টাকা পেলে নাকি উকিলেরা তার পরিবারের লোকজনের চরিত্রহনন করে ছাড়তে পারে! ব্যারিস্টার শাহজাহান সাজু প্রমাণ করেছেন, মানুষ খারাপ হতে পারে, পেশা নয়। তার জন্যেই নুসরাতের পরিবার একটা পয়সা খরচ না করেও তাদের মেয়ে হারানোর বিচার পেয়েছে, এমন মহানুভবতার নজির তো রোজ রোজ পাওয়া যায় না…

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

ফেনী,নুসরাত হত্যাকান্ড,বিচার সম্পন্ন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত