• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

আজ নষ্ট রাজনীতিতে ভরপুর এই দেশ

প্রকাশ:  ২২ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:১৫ | আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:৪৭
তাহমিনা নাসরীন

‘অনন্যা তিথি’ ... আবরার ফাহাদের বুয়েট সহপাঠী। আবরারের মৃত্যু পুরো বাংলাদেশের মানুষকে যেমনভাবে কাঁদিয়েছিল তেমনি তার সহপাঠীদের অনেক বেশি মর্মাহত করেছিল। পুরো বুয়েট পরিবার মানতেই পারছিল না তাদের পরিবারের সদস্য বিনা অপরাধে তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে এভাবে নির্মমভাবে খুন হবে। তাই পুরো বুয়েট আবরার হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল উন্মাদ হয়ে পড়েছিল । তাদের দাবি এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার, দুষ্ট রাজনীতি বন্ধ, কেম্পাসে নিরাপত্তা- আরো অনেক কিছু। পুরো ক্যাম্পাস যখন তুঙ্গে তখন ‘অনন্যা তিথির’ ভুমিকা অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল অন্যদের। ছোট্ট একটি মেয়ে, তার ধারালো প্রশ্নগুলো অনেক স্বচ্ছ এবং সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল। তার সত্যের কাছে অসত্যগুলো যেনো মাথা তুলে কথা বলতে পারছিল না। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম, সত্য কতটা ভয়ঙ্কর সাহসী ও সুন্দর হতে পারে, আর অসত্য যত বড়ই হোক না কেনো ,সে তো ভীতু কাপুরুষ। অবশ্যই, এই মেয়ে তার পরিবার থেকে সত্য বলা শিখেছে। যে সব সন্তান ছোট বেলা থেকে “সাদাকে সাদা আর কালো কে কালো বলা শিখবে -সে সব সন্তানরা আদর্শ থেকে কখনো পিছ পা হবে না, চলার পথে পা পিছলালেও আবার সঠিক পথে ফিরে আসবে।

অথচ আমরা আমাদের সন্তানকে “সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো” বলতে শিখাতে ভয় পাই। কারণ “কালোকে কালো” বলার পরিণতি কী ভয়ানক হতে পারে তা আমরা “আবরার ফাহাদের মৃত্যুতে বুঝতে পেরেছি।

আবরার হত্যার প্রতিবাদে একটি কথা বারবার উঠে আসছিল “ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা হোক”। যত দোষ হলো এই ছাত্র রাজনীতির উপর। অথচ এই ছাত্ররা একদা রাজপথে নেমেছিল বলে আজ আমরা মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলছি, স্বাধীন দেশে বুক ফুলিয়ে হাঁটছি। এই ছাত্ররাজনীতি আজকের নয়, বাংলাদেশ জন্মের আগে থেকে, কত স্বচ্ছ আর সুন্দর রাজনীতি ছিল । তাদের জীবন ছিল অনেক সাদাটে , তাদের চিন্তা চেতনায় দেশ ছাড়া কিছুই ছিল না, ছিল না ঘর সংসারের প্রতি মায়া কান্না। কতটা নিঃস্বার্থ আর নির্লোভ ছিলেন সেসব ছাত্ররাজনীতিবিদরা। কতজন যে এই রাজনীতির জন্য তার হ্রদয়ে গভীরে জমা ভালবাসাকে বিসর্জন দিয়েছেন, পথে পথে রাত কাটিয়ে দিয়েছেন , একে বারে ছন্ন ছাড়া জীবন- যাকে এক কথায় বলা যায় “ যাযাবর”। যাদের শরীর থেকে শুধু সুধা মাটির ঘ্রাণ আসত, যেখানে অর্থ, সম্পদের মোহ এদের কখনো আকৃষ্ট করেনি। এরা দেশের মাটি আর মানুষের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।তাঁরা এতোটা সাধারণ জীবন যাপন করতেন যেনো এদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারে। তাই তো এদেশের ভাষা , মাটি আর মানুষের জন্য নিজের জীবন দান করে গেছেন। কঠিন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে তাদের এক ফোঁটা ভয় লাগেনি।

এই দেশ সাধারণ দেশ নয়, লক্ষ শহীদের রক্তে সিক্ত “ বাংলাদেশ “। যারা ছাত্র রাজনীতি করেছিল তাঁরাই সর্ব প্রথম বুক পেতে দিয়েছিল হানাদার বাহিনীর দিকে। তাঁদের বুকের উপর দাঁডিয়ে আছে আজ “স্বাধীন বাংলাদেশ “।

তাহলে আজ কেনো ছাত্র রাজনীতি কলঙ্কিত?

এই ছাত্র রাজনীতি তো কখনই নীতিহীন ছিল না, নীতিহীন ছাত্ররাজনীতি হলে আজ “সোনার বাংলা” হতো না, পরাধীন বাংলায় মুখ বুজে থাকতে হতো, যেমনটি এখন আছি। স্বাধীন দেশে পরাধীনতার শিকল।

এখন রাজনীতি কলুসিত, অন্ধকার, ধাঁধা। যেখানে কুয়াশা ছাড়া কিছুই নেই, এক কথায় অস্বচ্ছ। বিন্দু পরিমাণ সততা নেই। রাজনীতির পোশাক পরিধান করে এক একজন টাকার কুমির। তাদের শরীরে এখন মদ আর নারীর পচা গন্ধ। যেন টাকার পাহাড় গড়তেই এরা রাজনীতি করতে এসেছে। রাজনীতি আজ তাদের কাছে সাইনবোর্ড, যেন ইচ্ছে মতো দুর্নীতি, লুটপাট করতে পারে।

অথচ এই সোনার বাংলার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর যৌবন কাল জেলে কাটিয়ে দিয়েছেন। জীবনের অনেক মূল্যবান সময় তিনি পরিবার থেকে দূরে থেকেছেন। তাঁর এই মূল্যবান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন, কিন্তু এই স্বাধীনতাও আজ পরাধীন। সত্য আজ অসত্যের কাছে, নিয়ম আজ অনিয়মের কাছে হেরে গেছে। ঘুষখোর আর দুর্নীতিতে আজ ভরপুর বাংলাদেশ । “মুক্তি যুদ্ধ” এবং “বঙ্গবন্ধু” দুটোই আমার

অদেখা বিষয়। যতটুকু জেনেছি তা পরিবার আর বই থেকে। বঙ্গবন্ধুর কিছু বক্তব্য আমাকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করে এবং অনুপ্রেরণা দেয়। তাঁর ভরাট কণ্ঠে বলিষ্ঠ বক্তব্য এদেশের মানুষের প্রাণ ছিল। তাইতো তাঁর ডাকে এদেশের মানুষ সাড়া না দিয়ে পারেনি। সেই আদর্শ নেতার আদর্শে গড়া আজকের আওয়ামী লীগ। অথচ আজ সেই আদর্শ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি দলে পরিণত হয়েছে কিছু নব্য কীট পতঙ্গের কারণে। আজ নষ্ট রাজনীতিতে ভরপুর এই দেশ। সততার মূল্য নেই, শুধু টাকা, নারী আর নেশায় মাতাল রাজনীতি। গণতন্ত্র এখন মুমূর্ষু অবস্হায় । এই মুহূর্তে আমার বঙ্গ বন্ধুর সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠের ভাষণটির কথাগুলো মনে পড়ছে -

“তোমরা আদর্শ নওজোয়ান হও ,

সবসময় সৎ পথে থাকবে ।

মনে রাখবে মুখে হাসি, বুকে বল ,

তেজে ভরা মন।

মানুষ হয়ে জন্মেছো যখন মানুষ হইতে হইবে। কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে অমানুষ হয়ে যাই। এদেশে এখন ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, আর লুটেরায় ভরপুর।

আমার যৌবনকাল পার করে দিয়েছি জেল খানায় আর ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। এদেশ থেকে যদি পাকহানাদার বাহিনীকে বের করে দিতে পারি তাহলে কি পারব না এই দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোরকে প্রতিহত করতে??””

আমাদের দেশ আজ ঘুন পোকায় আক্রান্ত। পুরোনো চাল কিছুদিন অযত্নে রেখে দিলে পোকা ধরে, তখন যদি একটু যত্ন নেওয়া হয় তখন এই পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যায় , কিন্তু বেশি পোকায় খেয়ে ফেললে তখন আর চাল থাকে না ঝাঁঝডা হয়ে যায়। তাই ছাত্ররাজনীতি নয়, অসৎ রাজনীতি বন্ধ হোক। গণতন্ত্র জাগ্রত হোক।

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এআর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত