• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর বরগুনার রাজনীতি

প্রকাশ:  ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:৫৪ | আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৩৮
বিভুরঞ্জন সরকার

বরগুনায় রিফাত শরিফ হত্যাকাণ্ডের পর তিন মাস পূর্ণ হতে চললো। গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডে ১৪/১৫ জন অংশ নিয়েছিল, যেটা অনেকেই দেখেছেন। হত্যাকাণ্ডটি যখন সংগঠিত হয়, তখন কেউ তা প্রতিরোধে এগিয়ে না এলেও দূরে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করেছিলেন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এবং দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। নয়ন বন্ড নামের একজন পরিচিত সন্ত্রাসী ওই হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দেয়। নয়ন বন্ড পরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এরমধ্যে এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা নিয়ে নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে, ঘটে চলেছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টিও সামনে এসেছে। মামলা নিয়ে যে বিষয়টি অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে সেটা হলো নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির গ্রেফতার। মিন্নি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী। তাকে গ্রেফতার করায় তার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান তৈরি হয়। তবে তার প্রতি, সম্ভবত নারী হওয়ার কারণে সহানুভূতি বেশি। পুলিশ রিফাত হত্যা মামলার চার্জশিট দিয়েছে। তাতে ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। মিন্নি এজাহারভুক্ত ৭ নম্বর আসামি। সাক্ষী থেকে আাসামি হওয়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আছে। মিন্নি দোষী কি নির্দোষ সেটা এখন আদালতের বিচার্য বিষয়। ৪৮ দিন আটক থাকার পর মিন্নি জামিনে মুক্ত হয়েছেন। উচ্চ আদালত তাকে মিডিয়ার সঙ্গে কথা না বলার শর্তে জামিন দিয়েছেন। এক আসামি জামিন পেলে অন্য আসামিদেরও জামিন পাওয়ার যুক্তি জোরালো হয় হয় কিনা সে প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনি মামলায় আসামিদের বেশির ভাগ অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়াটাও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, এখন বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। তাই এই পর্যায়ে এই মামলা নিয়ে কোনো আগাম মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের পর বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিরোধের যে চিত্রটা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সে দিকে একটু নজর দিতে পারি। বরগুনা আওয়ামী লীগ এখন কমপক্ষে তিনটি গ্রুপে বিভক্ত। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। আরেক গ্রুপের নেতা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন। এর বাইরেও একটি বা দুটি ছোট গ্রুপের কথাও শোনা যায়। তবে এরমধ্যে শম্ভুর সঙ্গে বিরোধ বেশি দেলোয়ার গ্রুপের। গত নির্বাচনের আগে এই বিরোধ চরমে উঠেছিল।

এস এম মশিউর রহমান শিহাব নামের একজন উদীয়মান নেতাও বরগুনার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। শিহাব নিজেই আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি শম্ভুর হাত ধরেই রাজনীতিতে এসেছেন কিন্তু এখন শম্ভুকে হটিয়ে নিজে সংসদ সদস্য হতে চান। এক্ষেত্রে তার বড় যোগ্যতা তিনি গত কয়েক বছরে ব্যবসা করে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। টাকা হলে এখন নেতা হওয়া নাকি সহজ। কারণ টাকার বশ কে না! খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এমপি হওয়ার মতো আরো বেশ কয়েকজন এখন বরগুনায় আছেন। শিহাবের নাম তালিকার পেছনের দিকেই। শুধু বরগুনায় নয়, সারা দেশেই আওয়ামী লীগ এখন আর ঐক্যবদ্ধ নয়, এক দলের ভেতরে বহু দল।

কোথাও বিবাদ-বিসম্বাদ প্রকাশ্য এবং প্রবল, কোথাও ছাইচাপা আগুনের মতো। বরগুনায়ও আওয়ামী লীগের সব গ্রুপই এখন কৌশলগত কারণে শম্ভুবিরোধী এক ধরনের ঐক্য গড়ে তুলেছে। শিহাব আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি আওয়ামী পরিবারে জন্ম নিয়েছেন এবং বেড়ে উঠেছেন। ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগ, তারপর এখন আওয়ামী লীগের ‘সহসম্পাদক’। যদিও তার রাজনৈতিক অতীত সম্পর্কে বরগুনার রাজনৈতিক মহলের তেমন কিছু জানা নেই। তিনি আমাকে বলেছেন, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর রাজনীতি ৫০ বছর সহ্য করেছি, এখন তার ছেলেরটাও করবো? তা হতে দেয়া হবেনা। এর জন্য যা যা করতে হয় তিনি তার সবই করবেন। ১০০ কোটি টাকা খরচ করতে হলেও, প্রয়োজনে তিনি তা করতে রাজি আছেন।

শিহাব ছোট থেকে বড় হয়েছেন। সবাই তাই হয়। বড় হওয়ার একটি প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু শিহাবের উত্থানকাহিনী স্বাভাবিক নয়। তার এখন প্রচুর অর্থসম্পদ এবং তার সব সম্পদ তিনি বরগুনাবাসীর জন্য বিলিয়ে দেবেন বলেও আমাকে বলেছেন। তিনি এ যুগের দাতা হাতেম তাই হবেন। কার জন্য কত টাকা তিনি ব্যয় করেছেন, দলের জন্য কত টাকা ব্যয় করেন, সেসব গল্প আমি শুনেছি। তার কাছে গেলে যে কেউ খালি হাতে ফিরে আসে না, তা-ও আমি শুনেছি। এ যুগে এমন দানবীর সত্যি বিস্ময়কর। বরগুনাবাসী ভাগ্যবান শিহাব তাদের ত্রাণকর্তা হয়ে এসেছেন।

ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর বিরুদ্ধে শিহাবের অভিযোগের শেষ নেই। আগে ভালো ছিলেন, এখন ভালো নেই। দুর্নীতি করে টাকাপয়সা কামিয়েছেন। এখন তার ছেলে সুনাম দেবনাথকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাকে মাঠে নামিয়েছেন। সুনাম হলো বরগুনার ‘মাদক সম্রাট’। ইত্যাদি ইত্যাদি। এই অভিযোগগুলো ইদানীং কিছু কিছু গণমাধ্যমেও ছাপা হচ্ছে। এখানে প্রশ্ন হলো, গণমাধ্যম কর্মীরা সুনামের দুর্নামের এত কেচ্ছাকাহিনী এতদিন চেপে ছিলেন কেন? রিফাত হত্যার পরই কেন সব গোপন তথ্য প্রকাশের হিড়িক পড়লো?

আমার কাছে এ তথ্য আছে যে, সুনাম দেবনাথ পড়াশোনা শেষ করে কিছুদিন ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে বরগুনা গিয়েছেন ২০১১ সালে। বরগুনায় মাদক ব্যবসা ও ব্যবহার কি ২০১১ সালের পর শুরু হয়েছে? যদি আগে শুরু হয়ে থাকে তাহলে কে বা কারা নিয়ন্ত্রণ করতো মাদক সাম্রাজ্য? গণমাধ্যম কর্মীদের কেউ কেউ যখন অতি উৎসাহের সঙ্গে সুনামকে অপরাধী সাব্যস্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করছেন, তখন অনুসন্ধানটা একটু প্রসারিত হলে কি ভালো হয় না? সুনাম দোষী হতে পারেন, হতে পারেন ভয়াবহ একজন মানুষ, কিন্তু তার পূর্বসূরি কারা? সুনামের গডফাদার এবং সহযোগী কারা?

ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু পাঁচ বার সংসদ সদস্য হয়েছেন। একবার উপমন্ত্রী ছিলেন। একাধিক বার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, এখনও করছেন। আমাদের দেশের রাজনীতির যে ধারা তাতে এই দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার সঙ্গে থেকে তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ যদি বেড়ে থাকে, সেটা কি খুব অস্বাভাবিক? এখন কোন এমপি, মন্ত্রী, নেতা আছেন যিনি ক্ষমতার সঙ্গে থেকে নিঃস্ব হয়েছেন? শম্ভু বাবুর দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, তা নয়। কিন্তু সেটা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়া কি ভালো?

একজন রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হবে, দান-দক্ষিণা করলেই সহানুভূতি পাবে, আরেক জন সারাজীবন রাজনীতি করে বিদ্বেষের শিকার হবেন, এটা কেমন কথা? বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকেই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়গুলো সামনে আনা হয়ছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

রিফাত হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যে সংগঠিত হয়েছে। অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন। পুরো ঘটনার ভিডিওচিত্র আছে। হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীরা সবাই শনাক্ত। প্রায় সবাই গ্রেফতারও হয়েছে। অনেকে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। অভিযুক্তদের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয় এখন আর অজানা নয়। প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ড নিহত। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে সবারই ধারণা। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের কারো সঙ্গে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু কিংবা তার ছেলে সুনাম দেবনাথের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ নেই। অভিযুক্তরা প্রায় সবাই ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত। আর বরগুনার ছাত্রলীগ শম্ভু বাবুর প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণে। শম্ভু বাবু বা তার ছেলে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতে পারেন না তা নয়, কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই তার প্রতিপক্ষের লোক দিয়ে করাবেন না ! নয়ন বন্ড অথবা ‘কিলিং মিশনে' অন্য যারা ছিল তারা যদি শম্ভু এমপি বা তার ছেলের লোক হতো তাহলে তা কি গোপন রাখা যেতো?

জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবিরের পুত্র। জাহাঙ্গীর কবির একসময় শম্ভুর সঙ্গে থাকলেও এখন তিনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। নয়ন বন্ডের সঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি অনিকের গভীর ঘনিষ্ঠতার কথা বরগুনায় কারো অজানা নয়। নয়ন বন্ডকে শম্ভু গ্রুপের বানানোর চেষ্টা হাস্যকর। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অপর দুই প্রধান আসামি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের নিকটাত্মীয়।

প্রায় ৩০ বছর ধরে বরগুনার রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ শম্ভুর হাতে রয়েছে। তিনি পাঁচ বারের এমপি। তারও হয়তো কিছু নিজস্ব লোক বা ক্যাডার আছে। কিন্তু তাদের কেউ কি রিফাত হত্যায় জড়িত ছিল? সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা পুলিশি তদন্তে কি তা বের হয়ে আসছে? আমরা চাই রিফাত হত্যাকাণ্ড নিয়ে নোংরা রাজনীতি বন্ধ হোক। প্রকৃত দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি হোক। প্রতিপক্ষ ঘায়েলের অপতৎপরতা বন্ধ হোক। রাজনীতিতে সুস্থ ধারা ফিরে আসুক – কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সর্বত্র।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বরগুনা,ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু,মিন্নি,নয়ন বন্ড
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close