Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
  • ||

সময়ে বদলেছে মানুষের মুখ ও মুখোশ 

প্রকাশ:  ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:০৬
ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট icon

অদ্ভুত পৃথিবী| তার থেকে বেশি অদ্ভুত মানুষ| পৃথিবীর অদ্ভুত চরিত্রের মধ্যে বৈচিত্র্য আছে| নিজেকে উজাড় করে দেবার স্বকীয়তা আছে| কিন্তু মানুষের চরিত্রের কোনো স্থিতিশীল স্বরূপ নেই| নিজের স্বার্থের জন্য বদলে যেতে মানুষের সময় লাগে না| আজকে যেটা খাঁটি সোনা কালকে সেটা কয়লা বলতে তাদের মুখে বাধে না| নিজের জন্য যেটা নৈতিক অন্যের জন্য সেটা অনৈতিক বানানোর মতো কূটকৌশল তাদের থেকে আর বেশি কেইবা জানে| এর জন্য কতরকম খোঁড়া যুক্তি তারা দাঁড় করায় তার ইয়ত্তা নেই| তাদের চাল চলন, আচার আচরণ দেখে সাধারণ মানুষ ভেবে বসে থাকে আহা লোকটা কত নীতিবান| কিসের নীতি কিসের কি? সুবিধাবাদিতা আর দল পাকানো এদের কাজ| অন্যকে মিথ্যে ও কল্পিত অপবাদ দিয়ে নিজেকে মহান বানানো এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়| এদেরকে অনেকে অতি বুদ্ধিমান প্রাণী বলে সার্টিফিকেট দিয়ে থাকেন কিন্তু আমার কাছে এটা একধরণের অতিমাত্রার চতুরতা| এক ধরণের প্রতারণা| সবার কাছে সাধু সেজে নিজের আখের গোছানো এধরণের লোক তো জীবনে কম দেখা হলোনা| এখনো দেখছি| এদের চেয়ে অভিনয়ে পারদর্শী আর কেউ নেই| হুমায়ুন আজাদের "এখানে অসতেরা জনপ্রিয়, সৎ মানুষেরা আক্রান্ত" কথাটা এখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। আমার সাফ কথা সাধু হও, সাধু সেজনা| ঘুমানো ভালো, জেগে জেগে ঘুমানো ভালোনা| অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, লেখক ও নির্দেশক আফজাল হোসেনের একটা লেখার কথা মনে পড়ে গেলো| লেখাটা এমন :

"গাধা ও মানুষের মধ্যে ব্যাপক তফাত। মানুষেরা গাধা হতে চায় না, গাধা বানাতে চায়। অন্যদের বানাতে গিয়ে নিজেরাই গাধা বনে যায়, তা টের পায় না। অন্যের মধ্যে গাধামো আবিষ্কার করতে পারে মানুষ। অন্যজনের গাধামোতে অধিক পরিমাণে আনন্দিত হয়। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ পরিচয়ের মানুষ অন্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হয়ে আত্ম-আবিষ্কারের সাধ্য হারিয়ে ফেলে। আত্মতুষ্টির ঘোর তাদের করে রাখে আহ্লাদে আটখানা। তা গাধামোর বিশেষ আর এক ধরন।

যেসব মানুষ নিজেকে বুদ্ধিমান আর অন্যকে বোকা ভাবতে পছন্দ করে, তারা স্বভাবে হয় একচোখা ও একরোখা। নিজেরা অনেক মানে, বোঝে এবং অন্যরা কিছুই বোঝে না মনে করে। তারা জাহির করতে ভালোবাসে। চোখেমুখে নিজেরাই শুধু বলে থাকে এবং অন্যরা তা কান পেতে কেবলই শুনবে বলে আশা করে। নিজে যা ভাবছে, ষোলো আনা ঠিক, অন্যদের ভাবনা এক শ ভাগ ভুল। যারা অন্যকে ছোট, দুর্বল ও ভুল ভাবতে ভালোবাসে, তাদের মধ্যে অন্যদের শোনা, জানা, বোঝার আগ্রহ থাকে না। এমনটা স্বাভাবিক নয়। শিষ্টাচার, সভ্যতার তোয়াক্কা না করে নিজেকে জাহির অবশ্যই আত্মম্ভরিতা এবং গাধামো। অন্যকে ছোট ভেবে অসম্মান করে নিজেকে বড় প্রমাণের চেষ্টা কৌতুককর। আমি ভালো, তুমি খারাপ। আমি সত্য, তুমি মিথ্যা। এসবই শ্রেষ্ঠ পরিচয়ের বিপরীত। অস্বাভাবিকতা। অসম্মান, অবিবেচনা, মিথ্যাচার, হিংসা যা যা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ পরিচয়কে ক্ষুণ্ন করে, সবই গাধামো সমতুল্য।" একটা মানসিক রোগের কথা মনে পড়লো| বাইপোলার ডিসঅর্ডার| বাইপোলার ডিসঅর্ডার হলো হঠাৎ করে জেগে ওঠা মুডের ফলে যে মানসিক ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে 'ম্যানিয়া' বলা হয়।

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের প্রাথমিক বা প্রথমদিকের সতর্ককারী উপসর্গ বা চিহ্নগুলো জেনে রাখুন। প্রতিটি রোগীর আলাদা আলাদা সতর্ককারী রোগ উপসর্গ বা চিহ্ন থাকে একথা বলেছেন ডা. ভিগুরা। আপনি যদি দেখেন যে আপনার বন্ধু কোনো ম্যানিক বা বিষণ্নতার পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, যখন দেখেন যে সে

· খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে

· কয়েক দিন ধরে ঘুমিয়ে আছে

· খুব বেশি কথা বলছে/মজা করছে

· খুব বেশি মার্কেটিং করছে, কেনাকাটা করছে

· অত্যন্ত আনন্দে টগবগ করছে

· হুমকি দিচ্ছে

· গালাগালি করছে

· আক্রমণ করতে চাইছে

· আত্মহত্যার কথা বলছে

তখন আপনি আপনার বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বন্ধুকে সতর্ক করতে পারেন, তার ডাক্তারকে এ ব্যাপারে জানাতে পারেন|

যাক অনেক কথা বললাম| হয়তো অনেকে আমার প্রতি রুষ্ট হতে পারেন| সন্ত্রাসীদের দিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর অতি উৎসাহও দেখতে পারেন| আমার বিরুদ্ধে তদন্তের নামে মিথ্যা নাটক সাজাতে পারেন| আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার কৌশল গ্রহণ করতে পারেন| আপনারা সবই পারেন| জজ মিয়া নাটক সাজানোর গল্প তো সবার মনে আছে| উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে| কারণ আপনাদের তো কথা একটাই আমরা সংখ্যা গরিষ্ঠ| গোপনে গোপনে আঁতাত| টেলিফোনে টেলিফোনে ষড়যন্ত্র| ধুয়া তুলসী পাতা সব যেন| আপনাদের সঙ্গে থাকলে মহাচোর হন মহানায়ক আর আপনাদের বিপক্ষে গেলে মহানায়ক হন মহাশয়তান| এর সাথে আছেন তথাকথিত নিরপেক্ষবাদীরা| যারা নিজেদের অতি চালাক ভাবেন| ব্যালেন্স রেখে কথা বলেন| মুখে মধু অন্তরে বিষ| তবে নিউট্রাল গেয়ারে যে গাড়ি চলেনা সেটি তারা বুঝতে চান না|

মানুষের মধ্যে পরজীবী বা প্যারাসাইট গোছের কিছু হোমোসেপিয়ান্স আছেন| তারা যেদিকে বৃষ্টি সেদিকে ছাতা ধরেন| তাদের কথা নাইবা বললাম|

অহংকারের পতন ঘটে| বিনয় মানুষকে মহান করে| কারণ বড় হতে হলে প্রথমে ছোট হতে হয়|

অহংকারের পরিণতি সম্পর্কেও ঈশপ বহু গল্প বলেছেন। তার একটি গল্প এ রকম:

এক বনের কিনারে ছিল বিরাট একটি গাছ। তার শিকড় যেমন মাটির অনেক গভীরে পৌঁছেছিল তেমনি ডালপালাও চারপাশের অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছড়িয়েছিল। গাছটির ঘন পাতার রাশি সূর্যের আলো প্রতিরোধ করে মানুষকে ছায়া দিত। গাছটিতে অসংখ্য পাখি বাস করত। মানুষ ও পাখির সমাগমে গাছটির চারপাশের এলাকা মুখরিত থাকত।

এই বিরাট গাছের নিচে একটি গাছের চারা গজিয়ে ওঠে। এটি ছিল একটি নমনীয় ও নাজুক হলদি গাছ। সামান্য একটু বাতাসেই তা নুয়ে পড়ত। একদিন দু’ প্রতিবেশী কথা বলছিল। হলদি গাছকে লক্ষ্য বড় গাছটি বলল: ওহে খুদে প্রতিবেশী, তুমি তোমার শিকড়গুলো মাটির আরো গভীরে প্রবেশ করাও না কেন? কেন আমার মত মাথা উঁচু করে দাঁড়াও না?

হলদি গাছ মৃদু হেসে বলল: তার কোনো প্রয়োজন দেখি না। আসলে এ ভাবেই আমি নিরাপদ আছি।

বড় গাছ বলল: নিরাপদ! তুমি কি মনে কর যে তুমি আমার চেয়ে নিরাপদ আছ? তুমি কি জান আমার শিকড় কত গভীরে প্রবেশ করেছে? আমার কাণ্ড কত মোটা ও শক্ত? এমনকি দু’জন লোক মিলেও আমার কাণ্ডের বেড় পাবে না। আমার শিকড় উৎপাটিত করবে ও আমাকে ধরাশায়ী করবে- এমন কে আছে?

গাছটি হলদি গাছের দিক থেকে বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। কার ভাগ্যে কখন কী ঘটে তা কে বলতে পারে?

একদিন সন্ধ্যায় ওই এলাকার ওপর দিয়ে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেল। ঘূর্ণিঝড়ে শিকড়সহ গাছ উপড়ে পড়ে, বনের গাছপালা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল।

ঝড়ের পর গ্রামবাসী ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখতে বের হল। আকাশচুম্বী গাছগুলোর অবস্থা একেবারে শোচনীয়। সেগুলো হয় উপড়ে পড়েছে অথবা ভেঙে চুরে শেষ হয়ে গেছে। সারা বনের মধ্যে যেন গাছপালার কঙ্কাল ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে শুধু একটি ব্যতিক্রম সবার নজর কাড়ে। তা হলো হলদি গাছ। সেও ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল ঝাপটার শিকার হয়ে এদিক ওদিক হেলে পড়েছে কিংবা মাটিতেও লুটিয়ে পড়েছে। ঝড় শেষ হয়ে যাবার পর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে ও আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তার বিরাট প্রতিবেশী গাছটির কোনো চিহ্নও দেখা গেল না।

সবকিছুই কল্পিত ভাবনা| কারো সাথে কারো তুলনা করে নয়| দর্শন একটা শাস্ত্র মাত্র আর দার্শনিক একজন মানুষ মাত্র| দর্শন চর্চা করে দার্শনিক হওয়া যায়না, মানুষের চিন্তার শক্তি যখন অদৃশ্যকে দেখতে পায় তখন তা থেকে জ্ঞান সৃষ্টি হয়| তখনও দার্শনিক তৈরী হয়না, দর্শন শাস্ত্র বলে কেউ তা মেনে নেয়না| কিন্তু সময় আর ইতিহাস একদিন পৃথিবীকে তার পিছনের খোলা চোখ চিনিয়ে দিয়ে মানুষকে বলতে বলে : যা পড়েছিল অযত্নে সেটাই দর্শন| যে মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিলো নতুন ভাবনা সেই মুখটির গর্বিত মানুষটিই হচ্ছে দার্শনিক|

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত