• রোববার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

যে শিক্ষায় আনন্দ নেই, সেই শিক্ষা মূল্যহীন

প্রকাশ:  ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৪:৩১
মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

শিক্ষা মানুষকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যমে আমরা যদি শিক্ষার্থীদের ভিতরের চিন্তাশক্তিকে বের করে আনতে না পারি তবে সে শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন আনন্দের মাধ্যমেই শিখন ফল অর্জিত হয়। যে শিক্ষায় আনন্দ নেই সেই শিক্ষা মূল্যহীন। আমাদের দেশে প্রচলিত শিক্ষার প্রধান সমস্যা হলো আমরা শিক্ষাকে কঠিন করে ফেলার কারণে মানুষ ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে তার সৃষ্টিশীল চিন্তার বিকাশ না ঘটে বরং তা কমতে থাকে। কিন্তু বিষয়টি উল্টো হতে পারতো, যার ফলাফল রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক হতো।

শিক্ষার বিড়ম্বনার কারণে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ থেকে সরে না গিয়ে বরং শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হতে পারতো। এই আগ্রহ সৃষ্টির জায়গাটি আমাদের তৈরী করতে হবে। মানুষ শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে ফেললেও নিজের ভবিষ্যত জীবনের কথা চিন্তা করে শিক্ষা গ্রহণ করছে। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যমে নিজের চিন্তার উৎকর্ষ সাধনের জায়গাটি তার অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। আমাদের যে পাঠ্যপুস্তক রয়েছে এগুলো থেকে অর্জিত জ্ঞান কিভাবে মানুষের জীবনে কাজে লাগানো যায় তার কোনো দিক নির্দেশনা নেই। ফলে লক্ষ্যহীন শিক্ষা না পারছে আনন্দের অনুসর্গ হিসেবে কাজ করতে, না পারছে চিন্তাশীলতার জায়গা সৃষ্টি করতে। আবার প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বইগুলোর মধ্যে যে সম্পর্ক বা ধারাবাহিকতা থাকার কথা ছিল সেটিও নেই।

বইগুলোর বিষয় নির্বাচন ও লেখার ক্ষেত্রে কোনো পরিকল্পিত চিন্তা ও পরিকল্পনা নেই। শিক্ষা গবেষণায় দেখা যায়, যে কোনো ধরণের বই, সেটা হতে পারে বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস কিংবা সমাজ বিজ্ঞানের-সেগুলোকে কথাসাহিত্যের আদলে সহজভাবে লিখতে পারলে তা মানুষের মধ্যে চিন্তাশীলতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। গতানুগতিকভাবে মুখস্ত না করে মানুষ মৌলিক কিংবা ফলিত জ্ঞানকে সারাজীবন মনে রাখতে পারে এবং কর্মক্ষেত্র ও জীবনে তার প্রয়োগ করতে পারে। শিক্ষার একটি প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক কল্পনাশক্তি সৃষ্টি করা।

এটি সম্ভব সৃজনশীল ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে। যেমন: একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের গল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞানের কোনো একটি বিষয় তুলে ধরে এর সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরতে পারে। এভাবে ঐ বিষয়টিতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হবে এবং তাদের নিজের ভাবনা বা মতামত জানাতে পারবে। হতে পারে সেটা ভুল কিংবা শুদ্ধ। কিন্তু বিভিন্ন শিক্ষার্থীর চিন্তার ভিন্নতা যেমন এক্ষেত্রে পাওয়া যাবে তেমনি শিক্ষার্থীরা চিন্তাশক্তি প্রয়োগের সুযোগ পাবে। এ ধরণের শিক্ষা প্রক্রিয়া প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রেই থাকতে হবে। এতে করে একজন শিক্ষার্থী এক শিক্ষা স্তর থেকে আরেক স্তরে পৌঁছানোর সাথে সাথে তার মেধার বিকাশও ঘটতে থাকে। আরেকটি বিষয় ভাবা যেতে পারে তা হলো, শিক্ষা স্তরের ভিত্তিতে বিভিন্ন শিক্ষামূলক খেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভিতরের চিন্তাশক্তিকে বের করে আনা যেতে পারে। নিচের শিক্ষা স্তরের শিক্ষামূলক খেলাগুলো খুব সহজ হবে এবং যতই শিক্ষা স্তরের উপরের ধাপে একজন শিক্ষার্থী যাবে তার শিক্ষামূলক খেলাগুলোও ততো বেশি সৃজনশীল হবে ও তার চিন্তাশীলতার পরিধি বাড়বে।

তবে শিক্ষামূলক খেলাগুলো যাতে শিক্ষার্ধীদের মনের উপর চাপ সৃষ্টি না করে তার মনস্তাত্তি¡ক গবেষণা থাকতে হবে। শিক্ষা জীবনের প্রথম স্তর থেকেই ছোট ছোট বাস্তব পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে শেখানোর চর্চা থাকতে হবে। পৃথিবীর উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোতে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তরে জীবনাচরণের শিক্ষা দেওয়া হয়। যেমন কিভাবে রাস্তা পার হতে হয়, কিভাবে মিলেমিশে কাজ করতে হয়, কিভাবে মানুষ ও সমাজের উপকার করতে হয়, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা, কিভাবে তা যাচাই করতে হয়, কিভাবে বড় ও ছোটদের প্রতি আচরণ করতে হবে, প্রকৃতিকে কিভাবে চিনতে ও জানতে হবে, বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা কিভাবে রোধ করা যাবে, বিজ্ঞানকে কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, দেশকে কেন ভালোবাসতে হবে, কোনো একটি বিষয় কিভাবে উপস্থাপন করতে হবে-এই বিষয়গুলি আনন্দ ও খেলার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়।

শিক্ষার সকল স্তরে আমাদের স্বাধীনতা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিকভাবে জ্ঞান আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের দেশে শিক্ষাজীবনে প্রবেশের শুরু থেকেই একজন শিক্ষার্থীকে বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়, যা তার মনে শিক্ষার প্রতি একধরনের নেতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা দর্শন বিশ্লেষণ করে বলেছেন, “শিশুকাল হইতেই কেবল স্মরণশক্তির উপর সমস্ত ভর না দিয়া সঙ্গে সঙ্গে যথাপরিমাণে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তির স্বাধীন পরিচালনার অবসর দিতে হইবে। ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারেরও মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয় , মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন, ছাত্ররা দুই-চার পাত কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে।

তারপর পরীক্ষার সময় এই বিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপরে মার্কা পড়িয়া যায়। শিশুদের জ্ঞানশিক্ষাকে বিশপ্রকৃতির উদার রমণীয় অবকাশের মধ্য দিয়া উন্মেষিত করিয়া তোলাই বিধাতার অভিপ্রায় ছিল। সেই অভিপ্রায় যে পরিমাণে ব্যর্থ করিতেছি সেই পরিমাণেই ব্যর্থ হইতেছি। সুগমতা, সরলতা, সহজতাই যথার্থ সভ্যতা। কেবল গ্রন্থগত বিদ্যা নয়, প্রাকৃতিক জ্ঞানভাণ্ডার থেকে নানান উপকরণ আহরণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে। চিত্ত যখন সমস্ত উপকরণকে জয় করিয়া অবশেষে আপনাকেই লাভ করে তখনই সে অমৃত লাভ করে।

নানা তথ্য, নানা বিদ্যার দিয়া পূর্ণতররূপে নিজেকে উপলব্ধি করিতে হইবে। পরিণত জ্ঞানে জ্ঞানী হইতে হইবে। আমাদের ছাত্রগণ যেন শুধুমাত্র বিদ্যা নহে, তাহারা যেন শ্রদ্ধা, যেন নিষ্ঠা, যেন শক্তি লাভ করে তাহারা যেন অভয় প্রাপ্ত হয়, দ্বিধাবর্জিত হইয়া তাহারা যেন নিজেকে নিজে লাভ করিতে পারে।” এই শিক্ষা দর্শন থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে শিক্ষাকে এমনভাবে সাজানো দরকার যাতে শিক্ষার্থীরা তা আনন্দের সাথে গ্রহণ করে নিজের ভিতরের সুপ্ত মেধাশক্তির প্রকাশ ঘটাতে পারে। অনেকেই ভাবেন শিক্ষা থাকলে পরীক্ষা থাকতে হবে।

পরীক্ষা ছাড়া যেন মেধার মূল্যায়ন সম্ভব নয়। বিষয়টি লজিক্যাল ও যুক্তিপূর্ণ নয়। কারণ পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার মূল্যায়ন, কল্পনাশক্তি সৃষ্টি ও চিন্তাশক্তির বিকাশ সম্ভব নয়। সারা বছর কোনো একটি বিষয় পড়ে একদিনের তিন ঘন্টার একটি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করা যাবে এটি অবাস্তব। এ ধরণের পরীক্ষার মাধ্যমে ভারসাম্যহীন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তির সৃষ্টির জায়গাটিতে চাপ সৃষ্টি করে বরং তা নিস্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। যেখানে মেধার মূল্যায়ন পরীক্ষায় কে কত বেশি মার্কস পেলো এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে করা হয় সেখানে নতুন চিন্তাশক্তি সৃষ্টির পরিবর্তে না বুঝে বিষয়টি মুখস্ত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। যা শিক্ষার্থীর মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরী করে তার শেখার আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

এখানে একজন শিক্ষার্থী অন্য আরেকজন শিক্ষার্থীকে বন্ধু না ভেবে তার প্রতিযোগী হিসেবে ভাবে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে বিষয়গুলো শেয়ার করার পরিবর্তে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে উঠে। দীর্ঘ মেয়াদে যার প্রভাব আমাদের সামাজিক, মানবিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিরূপভাবে পড়ে। তবে আশার কথা হচ্ছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কথা বলছেন। এই পরিবর্তনের প্রধান দিকটি হচ্ছে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় এই তিন শ্রেণীতে কোনো ধরনের পরীক্ষা থাকছে না। শিশুর ওপর থেকে পরীক্ষার চাপ কমাতে ফিনল্যান্ডসহ উন্নত বিশ্বের আদলে শিক্ষাব্যবস্থা সাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ১৩ মার্চ প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুকে পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত চাপ না দিতে অভিভাবক, শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমি এটুকুই বলব, কোনোমতেই যেন কোমলমতি শিশুকে কোনো অতিরিক্ত চাপ না দেয়া হয়। তা হলেই দেখবেন তারা ভেতরে একটা আলাদা শক্তি পাবে। আর তাদের শিক্ষার ভিতটা শক্তভাবে তৈরি হবে। কোমলমতি বয়সে লেখাপড়ার কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করাকে তিনি ‘একধরনের মানসিক অত্যাচার’ বলে অভিহিত করে বলেন, শিশু প্রথমে স্কুলে যাবে এবং হাসি-খেলার মধ্য দিয়ে লেখাপড়া করবে। তারা তো আগে থেকেই পড়ে আসবে না, পড়ালেখা শিখতেই তো সে স্কুলে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শিশুর পাঠদান সম্পর্কে নিজস্ব অভিব্যক্তি সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে গিয়ে আরও বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই ৭ বছরের আগে শিশুকে স্কুলে পাঠায় না।

আমাদের দেশে অনেক ছোটবেলা থেকেই বাচ্চারা স্কুলে যায়। কিন্তু তারা যেন হাসতে, খেলতে, মজা করতে করতে পড়াশোনাটাকে নিজের মতো করে করতে পারে, সেই ব্যবস্থাটাই করা উচিত। সেখানে অনবরত ‘পড়’, ‘পড়’, ‘পড়’ বলাটা বা ধমক দেয়াটা বা আরও বেশি চাপ দিলে শিক্ষার ওপর তাদের আগ্রহ কমে যাবে, একটি ভীতির সৃষ্টি হবে। শিক্ষার প্রতি সেই ভীতিটা যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আমি আমাদের শিক্ষক এবং অভিভাবকদের অনুরোধ করব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় আমরা দেখি প্রতিযোগিতাটা শিশুর মধ্যে না হলেও বাবা-মায়ের মধ্যে একটু বেশি হয়ে যায়। এটাকেও আমি একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা বলে মনে করি। ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওইসব দেশে বাচ্চাদের কোনো পরীক্ষা নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা কীভাবে শিশুর মেধার মূল্যায়ন করে, সেসব বিষয় খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনে কমিটি গঠন পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি ক্লাসের পরীক্ষা যেন শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য কোনো ধরনের বাধা হতে না পারে, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেন।

এখন মূল বিষয় দাঁড়াচ্ছে পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে কোন ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক হবে। শিক্ষা নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তারা বিভিন্ন ধরনের মেধাশক্তি যাচাইয়ের মডেল দিয়েছেন। মারিয়া মন্তেসেরি তাঁর শিক্ষা পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে বলেন, এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের কোন শ্রেণী বিন্যাস থাকবে না, আনুষ্ঠানিক কোন পরীক্ষা থাকবে না, কোন প্রতিযোগিতা থাকবে না। স্কুলের পরিবেশ খোলামেলা হবে এবং স্কুলকে শিক্ষার্থীরা তাদের বাড়ি বলে মনে করবে। শিক্ষাকে আনন্দের অনুসর্গ হিসেবে প্রকাশ করতে তিনি কাঠের তৈরী বর্ণমালা তৈরী করেন, যার আকার আকৃতি শিক্ষার্থীরা স্পর্শ করে সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন ভাবে নিজের ভাবনা প্রকাশ করবে। স্টেইনার তাঁর শিক্ষা পদ্ধতিকে আধ্যত্বিক জগতের উন্মোচন বলে মনে করতেন।

তিনি শরীর, মন ও আত্মার বিকাশের মাধ্যমে শিশুদের চিন্তাশক্তিকে বের করে আনার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। শিশুরা নিজের ভাষায় জ্ঞান অর্জন করবে এবং শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য তাদের নাচ, গান, আবৃত্তি ও খেলাধুলার সাথে সম্পৃক্ত থেকে নিজেদের মনের বিকাশ ঘটাবে। হার্কনেস এর শিক্ষা পদ্ধতিতে কোন কারিকুলাম নেই। এই পদ্ধতিতে ক্লাসের মাঝখানে একটি গোল টেবিল রাখা থাকে। সেই গোল টেবিলের চারপাশে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সাথে বসে খোলামেলাভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে।

আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে। ফ্রয়েবেল তাঁর শিক্ষা পদ্ধতিতে শিশুর স্বাধীনভাবে ভাবার ও আগ্রহের বিষয়গুলোকে প্রধান্য দিয়েছেন। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক বিকাশ, সংগীতের মাধ্যমে মনের বিকাশ, নাচের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে চিন্তাশক্তির প্রকাশ ঘটানোই ছিল এই শিক্ষা পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য। রিগিও এমিলা তাঁর শিক্ষা পদ্ধতিতে পিতা-মাতার ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। এই পদ্ধতিতে স্কুলগুলো বাড়ির মত করে ডিজাইন করা হতো। কোন কারিকুলাম বা লেসনপ্ল্যান এই পদ্ধতিতে নেই। শিশুদের বিভিন্ন ছবি সরবরাহ করে সেখান থেকে শিশুরা নিজেরা কি মনে করে এই বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।

শিশুদেরও বিভিন্ন বিষয়ে আঁকতে হতো। শিক্ষকরা এই পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কেবলমাত্র ধারাবাহিক মেধাশক্তির মূল্যায়ন করতেন। বাংলাদেশেও পরীক্ষাবিহীন শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। ইবাদ আলী তাঁর গবেষণার মাধ্যমে শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। তিনি মনে করেন শিক্ষা পদ্ধতি হবে মৌলিক ও গবেষণাধর্মী। বিজ্ঞান এই শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। যার দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব শিশুদের মধ্যে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। তাঁর মতে শিশুরা প্রধানত তিনটি বিষয়কে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এবং প্রথমে তারা যে বিষয়টি দেখে বা শিখে সেটিকে তার চিন্তাশক্তি বিকাশের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। এই তিনটি বিষয় হলো- বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা যা বলেন শিশুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা অক্ষে অক্ষে পালন করে, শিশুদের পাঠ্য বইয়ে যা লেখা থাকে সেটি তারা মনে প্রানে বিশ্বাস করে, টেলিভিশনের মাধ্যমে যা দেখে বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের কার্টুন সেগুলোর অনুকরণ তারা করতে চায়। শিশুশিক্ষা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই তিনটি বিষয়কে মূল্যায়ন করে তিনি শিক্ষার কিছু মৌলিক বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন।

তাঁর মতে, মানুষ জীবনের প্রথম পর্যায়ে বস্তুর নাম শেখে, বর্ণের নাম নয়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কিছু সফটওয়্যার আছে, আর এগুলো বাহ্যিক নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত হয়। ক্লাসের মূল্যায়ন পদ্ধতিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি কয়েকটি উপাদানের কথা বলেছেন। যেমন- শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার, সময়ানুবর্তিতা, আচারণ ও মানবিক ব্যবহার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ও এর চর্চা, কোনকিছু বোঝার মানসিক ক্ষমতা ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারিক কাজ। এছাড়া পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে আরও অনেক শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। এই ধরনের গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে। পর্যায়ক্রমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পরীক্ষামুক্ত রাখতে হবে। মানুষের চিন্তাশক্তির বিকাশের ভিত্তি হিসেবে মানসিক শক্তির বিকাশকে প্রাধান্য দিতে হবে।

তবেই শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করবে দেশকে আলোকিত করবে। শিক্ষা গবেষণা ও শিক্ষা গবেষকের গুরুত্ব অনুধাবন করে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নরওয়ে, কোরিয়া ইত্যাদি দেশে শিক্ষা নিয়ে পড়ার জন্য পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। বিষয়টি আমাদের দেশেও ভাবা যেতে পারে। কারণ গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার ভিত্তি গড়ে না উঠলে শিক্ষার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করে রাষ্ট্র উন্নয়নে দক্ষ ও মেধাবী জনশক্তি গড়ে তোলা যায় না। কিন্তু তা সত্তে¡ও উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ক্ষেত্রটি আমাদের দেশে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। আর যেটুকু গবেষণা হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে সেভাবে এর বাস্তব প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরা যত বেশি আলোচনা করছি, শিক্ষা গবেষণা নিয়ে সেভাবে কোনো আলোচনা নেই।

আশার কথা হচ্ছে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি বলেছেন, "শিক্ষার সফলতা আরো সুসংগঠিত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। অব্যাহত থাকবে শিক্ষার মান উন্নয়নের। দেশে শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে টিম হিসেবে আমরা কাজ করবো। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মান উন্নয়নসহ স্বচ্ছতা জবাবদিহি দরকার। সমালোচনাকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকবে। কোথাও কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন করার প্রয়োজন হলে তা করবো।" এখানে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, শিক্ষার সফলতা ও সুসংগঠিতকরণ, শিক্ষার মান উন্নয়ন, টীম ওয়ার্ক বা গ্রুপভিত্তিক প্রচেষ্টা, জবাবদিহিতা, সমালোচনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখা ও পরিবর্তন। প্রকৃত শিক্ষারস্বরূপ উন্মচন করে শিক্ষার্থীর চিন্তাশীলতাকে বের করে আনার মধ্যেই রয়েছে শিক্ষার সফলতা। গ্রুপভিত্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন করে কিভাবে এটিকে বিশ্বমানের করা যায় সেটি নিয়েও ভাবতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের জন্য যে পরিবর্তন ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে তা করতে হবে। এভাবেই শিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত