Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬
  • ||

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বিএনপিই হতে পারে মূল ভরসা

প্রকাশ:  ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৫:৫৭
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ
প্রিন্ট icon

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া রাজনৈতিক দল বিএনপির আজ ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। জিয়াউর রহমান এক ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা জিয়াউর রহমানের দেশের দায়িত্ব গ্রহণ এবং তৎপরবর্তী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করে দেশের রাজনীতিই শুধু নয়, শাসন-প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিতে আমূল পরিবর্তনও আনেন। তখনকার বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রবর্তন করেন নতুন নীতিও। উল্লেখ্য, তখন জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বাংলাদেশ সরকারের প্রবর্তিত নীতির প্রশংসা করেন। আমরা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব ও তার প্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভূমিকা এবং তার সুযোগ্য সহধর্মিণী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যদি মূল্যায়ন করি, তাহলে স্পষ্টতই দেখতে পাই বাংলাদেশে কীভাবে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের দেশের দায়িত্বভার গ্রহণকালে অর্থনীতির অবস্থা ছিল নাজুক। উৎপাদন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে উৎপাদন কেন্দ্রগুলো তখন ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে। অনস্বীকার্য স্বাধীনতার স্থপতি নন্দিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তখনও জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, আত্মকলহ ও ষড়যন্ত্রের ফলে এবং সামরিক বাহিনীর কিছুসংখ্যক নির্মম ঘাতকের হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হলে জনগণের সামনে আশার প্রদীপ নিভে যায়। তখন খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়, তা স্থিতিশীল হয়নি। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তারা ঘটাতে পারেনি। জনগণের আনুগত্য ধারণ করতে সক্ষম হয়নি বিধায় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। এমন সময়ই আবির্ভাব ঘটে জিয়াউর রহমানের। তিনি ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় ঐক্যভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এরই নাম বিএনপি অর্থাৎ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। কিন্তু এর আগে জিয়াউর রহমানকে অনেক কিছু গোছাতে হয়েছে। তিনি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে পেরেছিলেন বিধায় তার গঠিত রাজনৈতিক দলের অবস্থান সারাদেশে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়। বাংলাদেশ ফিরে পায় নতুনভাবে প্রাণশক্তি জিয়াউর রহমানের সৃজনশীল নেতৃত্বে। জিয়াউর রহমানের মধ্যে জনগণ ফিরে পায় তাদের সুহৃদকে। জাতীয়তাবাদী দলের সৃজনশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের সামাজিক শক্তিগুলো ফিরে পায় নতুন এক ঐক্যসূত্র। ইতিহাসের এই সত্য অস্বীকার করলে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব হবে না। উল্লেখ্য, জিয়াউর রহমান কখনও বঙ্গবন্ধুকে অশ্রদ্ধা কিংবা অসম্মান প্রদর্শন করে কিছু করেননি। তিনি তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সব সময়ই অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা পোষণ করে গেছেন। অথচ এই সত্যের বিকৃতি ঘটানো হয়েছে নানা ক্ষেত্রে হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে।

আমরা যদি স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির সূচনা পর্বের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই কীভাবে ক্রমে ক্রমে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ক্ষুণ্ণ হতে থাকে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা কীভাবে পর্যুদস্ত হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ কীভাবে কণ্টকাকীর্ণ হয়েছিল এর বিশ্নেষণ নতুনভাবে করা নিষ্প্রয়োজন। জিয়াউর রহমান এসব কিছু অনুধাবন করে গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্নির্মাণে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের পুনপ্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে কাজ শুরু করেন। নির্মোহ অবস্থান থেকে তার গৃহীত সব সামাজিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ইতিবাচক প্রভাব লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিএনপির মতাদর্শে মানুষের আস্থা ক্রমে দৃঢ় হতে থাকে। জিয়াউর রহমানের পরে খালেদা জিয়াও ঠিক একই পথ অনুসরণ করায় বিএনপির প্রতি জনআস্থা ক্রমেই পুষ্ট হতে থাকে। জনগণ দেশ পরিচালনায় বিএনপিকে রায় দিয়ে ক্ষমতায় বসায়। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা বিএনপিকে রাজনীতির নতুন দিশা দেয়।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অপকৌশলের রাজনীতির তীরে বিদ্ধ হয় বিএনপি। সারাদেশে নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে নিপীড়ন-নির্যাতন। মামলা-হামলার শিকারে পর্যুদস্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়াই এই অপকৌশলের রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও এর শিকার। তিনি দীর্ঘদিন কারান্তরীণ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিএনপিকে নতুন করে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এগোতে হবে। জনগণের কাছে যেতে হবে। জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। সর্বসাধারণের প্রয়োজনের নিরিখে রাজনীতির কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। জিয়াউর রহমান যেমন বলতেন, জনগণের কাছে থেকে তাদের অনুভূতি ধারণ করে জনকল্যাণের রাজনীতির পথ রচনা করতে হবে, তেমনি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের উচিত হবে এরই আলোকে নতুন কর্মপন্থা নির্ণয়ের। মামলা-হামলার শিকার তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের মনোবল চাঙ্গা করতে হবে। আস্থা মজবুত করতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করেই নতুন পথে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিস্কণ্টক করতে হবে।

কিন্তু অসত্য নয় যে, বিদ্যমান পরিস্থিতি এসব কিছুরই প্রতিকূল। তবুও এই প্রতিকূলতার মধ্যেই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও নীতিনির্ধারকদের আরও সংঘবদ্ধ হয়ে মাঠে নামতে হবে। মাঠের রাজনীতি যদি পুষ্ট করা না যায়, তাহলে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পুনর্জাগরণ কঠিন হবে। দেশে গণতন্ত্র নেই। কোথাও নেই কোনো জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা। জননিরাপত্তা কঠিন প্রশ্নের মুখে। জনস্বার্থ-সংশ্নিষ্ট এই বিষয়গুলোকে ইস্যু করে মাঠের রাজনীতি চাঙ্গা করতে হবে। জনসংযোগের মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের জাগিয়ে তুলতে হবে। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন প্রত্যেকটি জেলায় নতুন কমিটি গঠন। এই কমিটিগুলো গঠন করতে হবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে। কারও ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কর্মীদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাবও করতে হবে। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা মোতাবেক তাদের পাশে কেন্দ্রীয় নেতাদের পায়নি। তাদের প্রাপ্যটুকু দিতে হবে। তাদের চাওয়া আমলে নিতে হবে।

কিছুদিন আগে বিভাগীয় পর্যায়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা-নীতিনির্ধারকরা যেভাবে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রয়াস নিয়েছিলেন, এখন ঠিক সেভাবেই জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংযোগের রাজনীতির পথ মসৃণ করতে হবে। সংযোগের রাজনীতির রূপরেখা তৈরি করে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠের রাজনীতি চাঙ্গা করার বিকল্প নেই। জনগণকে কাছে টেনে নিয়ে তাদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়গুলো রাজনৈতিক কর্মসূচির এজেন্ডা করা জরুরি। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করার পর যেভাবে জনগণের অনুভূতি ধারণ করে এগিয়ে ছিলেন, ঠিক সেভাবেই বর্তমানেও একই কৌশলে এগোতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ক্রান্তিকালে সময়ের চাহিদার প্রেক্ষাপটে যেভাবে নতুন দল গঠন করে সবক্ষেত্রে অবস্থান সংহত করে জিয়াউর রহমান এগিয়ে ছিলেন, এর সুফলও দল ভোগ করেছিল। দেশের মানুষ উপকৃত হয়েছিল।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে একমাত্র বিএনপিই হতে পারে মূল ভরসা। কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি আন্দোলন বেগবানের মধ্য দিয়ে তাকে মুক্ত করেই গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব। এ জন্য আগে দরকার দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার ছক তৈরি করা। বিএনপির তো আন্দোলন-সংগ্রাম করে জয়ী হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারক কিংবা নেতারা তো জানেন কীভাবে জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতে হয়। তাদের সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চেতনার পুনর্জাগরণে মনোনিবেশ করতেই হবে। দল যদি চাঙ্গা না হয়, দলের কার্যক্রম যদি জনগণকে কাছে টানতে না পারে তাহলে দলীয় নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের সড়কও চওড়া করা যাবে না। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। রাজনীতিতে নানারকম সমীকরণ যেমন চলে তেমনি ভুল-ভ্রান্তি শোধরানোর পথও থাকে। ভুল শুধরে নতুন করে কৌশল নিয়ে এমনভাবে এগোতে হবে, যাতে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হন ও জনগণ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আস্থা রাখতে পারে।

মানুষের ভোটের অধিকার, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার, রাজনীতির মাঠে সবার সমানাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ইত্যাদি বিষয় হলো গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে গণতন্ত্র কলঙ্কিত হয়েছে। এরই বিরূপ প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনেও। জনস্বার্থ, জনইচ্ছা, জনঅধিকার যেভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে তা কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কাম্য নয়। এসব কিছুই বিএনপির গঠনমূলক, নিয়মতান্ত্রিক সুশৃঙ্খল আন্দোলনের ইস্যু হতে পারে। এককথায় জনগণ কী চায় তা অনুধাবন করতে হবে। তাদের চাওয়াই যদি অনুধাবন করা না যায়, তাহলে তাদের সম্পৃক্ত করা যাবে কীভাবে? রাজনীতিতে কৌশল থাকবেই; কিন্তু অপকৌশল কোনোভাবেই কাম্য নয়, হতে পারে না। রাজনীতির বর্তমান যে চিত্র রক্তস্নাত বাংলাদেশে পরিলক্ষিত হচ্ছে, চূড়ান্ত অর্থে তা মঙ্গলজনক নয়।

লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত