Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬
  • ||

সহজ সরল ভাবনা 

প্রকাশ:  ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১৫:১২
মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট icon
ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী। ফাইল ছবি

আমরা মানুষ| সব সময় ভাবি ক্ষমতা আর পেশিশক্তি দিয়ে হয়তো গোটা পৃথিবীকে আমাদের দাস বানিয়ে রাখবো| অনৈতিকতা আর ঘুষের টাকায় পৃথিবীর মানুষের আমাদের কথায় উঠবে আর বসবে| কথাটা খুব অযৌক্তিক ও কাল্পনিক| মানুষের যৌবন যেমন সারাজীবন থাকে না তেমনি মানুষের এই অহংকার সারাজীবন থাকে না। খুব সহজ কথা অহংকার পতনের মূল| সারাজীবন পৃথিবী জয় করতে করতে একদিন মহাবীর আলেকজান্ডার বুঝেছিলেন যা তিনি করেছেন তা ছিল মূল্যহীন| এ প্রসঙ্গে ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো|

মৃত্যু শয্যায় মহাবীর আলেকজান্ডার তার সেনাপতিদের ডেকে বলেছিলেন, 'আমার মৃত্যুর পর আমার তিনটা ইচ্ছা তোমরা পূরণ করবে। আমার প্রথম অভিপ্রায় হচ্ছে, শুধু আমার চিকিৎসকরাই আমার কফিন বহন করবেন। আমার ২য় অভিপ্রায় হচ্ছে, আমার কফিন যে পথ দিয়ে গোরস্থানে যাবে সেই পথে আমার অর্জিত সোনা ও রুপা ছড়িয়ে থাকবে আর শেষ অভিপ্রায় হচ্ছে, কফিন বহনের সময় আমার দুই হাত কফিনের বাইরে ঝুলে থাকবে।'

তার সেনাপতি তখন তাঁকে এই বিচিত্র অভিপ্রায় কেন করছেন তা নিয়ে প্রশ্ন করলেন। দীর্ঘ শ্বাস গ্রহণ করে আলেকজান্ডার বললেন, 'আমি দুনিয়ার সামনে তিনটি শিক্ষা রেখে যেতে চাই।

• আমার চিকিত্সকদের কফিন বহন করতে এই কারণে বলেছি যে যাতে লোকে অনুধাবন করতে পারে যে চিকিৎসরা কোন মানুষকে সারিয়ে তুলতে পারে না। তারা ক্ষমতাহীন আর মৃত্যুর থাবা থেকে রক্ষা করতে অক্ষম।'

• 'গোরস্হানের পথে সোনা-দানা ছড়িয়ে রাখতে বলেছি মানুষকে এটা বোঝাতে যে সোনা-দানার একটা কণাও আমার সঙ্গে যাবে না। এগুলো পাওয়ার জন্য সারাটা জীবন ব্যয় করেছি কিন্তু নিজের সঙ্গে কিছুই নিয়ে যেতে পারছি না। মানুষ বুঝুক এসবের পেছনে ছোটা সময়ের অপচয়।'

• 'কফিনের বাইরে আমার হাত ছড়িয়ে রাখতে বলেছি মানুষকে এটা জানাতে পৃথিবীতে এসেছিলাম, আবার খালি হাতেই পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছি. . . . .

সব অহংকার, লোভ, অসততা ছেড়ে মানুষ যদি মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করতে পারতো তবে তার সুফল সবাই পেতো| ভালো চিন্তা মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ গুণাবলী তৈরী করে| সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে মানুষের ইতিবাচক চিন্তাশক্তি যার কাছে পেশিশক্তির কোনোই দাম নেই| একটা পরোপকারের গল্প মনে পড়লো| একেবারে নিখাদ সত্য ঘটনা| বাস্তবতা গল্প, জীবন থেকে নেওয়া-মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ| স্কটল্যান্ডের এক গরিব কৃষক। তার নাম ফ্লেমিং। একদিন তিনি জমিতে কাজ করছিলেন। হঠাৎ কাছের পুকুর থেকে চিৎকার ভেসে এলো, ‘বাঁচাও। বাঁ-চা-ও!’

তিনি কাজ ফেলে ছুটে গেলেন। সেখানে একটি ছোট ছেলে পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। পানিতে হাত নাড়ছে আর আতঙ্কে চিৎকার করছে। কৃষক ফ্লেমিং ছেলেটাকে উদ্ধার করলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ছেলেটা রেহাই পেল।

পরদিন সকালে একটা চমৎকার গাড়ি এসে থামল কৃষকের বাড়ির সামনে। মার্জিত পোশাক পরা এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে এলেন। কৃষক ফ্লেমিং যে ছেলেটিকে বাঁচিয়েছেন, ভদ্রলোক নিজেকে সেই ছেলেটির বাবা হিসেবে পরিচয় দিলেন।

‘আমি আপনাকে প্রতিদান দিতে চাই। আপনি আমার ছেলের জীবন বাঁচিয়েছেন।’ ভদ্রলোক বললেন।

‘না, আমি যা করেছি তার প্রতিদান নিতে পারব না। ক্ষমা করবেন।’ জবাব দিলেন সেই কৃষক। এমন সময় ঘর থেকে বেরিয়ে এলো তার ছেলে।

‘এটা কি আপনার ছেলে?’ ভদ্রলোক জানতে চাইলেন।

কৃষক গর্বের সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, এ আমার ছেলে।’

‘আমি আপনাকে একটি প্রস্তাব দিতে চাই। আমার ছেলের মতো আপনার ছেলেকেও পড়ালেখা করানোর সুযোগ আমায় দিন। যদি আপনার সামান্য গুণও ওর মধ্যে থাকে। তাহলে নিশ্চয় একদিন এমন বড় মানুষ হবে- আমরা সবাই তাকে নিয়ে গর্ব করব।’

বাস্তবে সেটিই হল। কৃষক ফ্লেমিংয়ের ছেলেকে ভর্তি করানো হল সেরা স্কুলে। যথাসময়ে সেই ছেলেটি স্নাতক পাস করলেন লন্ডনের সেন্ট মেরিজ হসপিটাল মেডিকেল স্কুল থেকে। আর পেনিসিলিন আবিষ্কার করে সারা দুনিয়ায় তিনি পরিচিতি লাভ করলেন স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং হিসেবে।

কয়েক বছর পরের কথা। পুকুর থেকে বাঁচানো ভদ্রলোকের সেই ছেলেটি নিউমোনিয়ায় মারাত্মকভাবে ভুগছিলেন। মর মর অবস্থা।

সে সময়ে তার প্রাণ বাঁচল কিসে? সেই পেনিসিলিনে।

সেই ভদ্রলোকের নাম কী? লর্ড রানডলফ চার্চিল।

তার ছেলের নাম? স্যার উইস্টন চার্চিল।

এই ঘটনাটি আমাদের কি শেখালো| খুব ভালো একটা মানবিক মূল্যবোধ শেখালো| যার অর্থটাও চমৎকার| মানেটা খুব সোজা সাপটা: ভালো কাজের ফল সব সময় ভালোই হয়| আমরা অর্থের আর ক্ষমতার পিছনে না ছুঁটে যদি মানুষের কল্যাণের পিছনে ছুটতে পারি তবেই মানব জীবন সার্থক হবে| মানুষে মানুষে সম্পর্কের ভিত্তি তৈরী হবে| সবচেয়ে বড় কথা আমাদের সবার মধ্যে ত্যাগের মনোভাব থাকতে হবে| দেশ প্রেমিক হতে হবে| দেশের সেবা করতে হবে| সব সময় বিশ্বাস করতে হবে “দেশ আমাকে কি দিলো সেটি বড় কথা নয় দেশকে আমি কি দিলাম সেটিই বড় কথা|” মানুষ মানুষ হয়ে উঠুক| কিছু কিছু মানুষ আমরা চাই না| সবাইকে আমরা মানুষ হিসেবেই দেখতে চাই| আমরা হাড় মাংসের রক্তে গড়া ঘাম ঝরা মানুষ চাই, কোনো যান্ত্রিক দানব চাই না|

তলস্তয় রাশিয়ার এক কুলীন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন| জীবনে চলার জন্য লিও তলস্তয়ের ছয়টি পথের সন্ধান করতে বলেছেন| উদার মানসিকতার মাধ্যমে নতুন অভিজ্ঞতার সাথে সাথে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও চিন্তাশক্তি বাড়ানো| সহানুভূতির চর্চা করা| যাদের জীবন তাঁর জীবনের চাইতে অনেক বেশি বৈপরীত্যে ভরা তাদের জুতায় নিজের পা রেখে তাদের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে তাদেরকে অনুভব করতেন তিনি। এর সাথে আরও আছে পরিবর্তন আনা, সহজ জীবনযাপন, নিজের মতামতের স্ববিরোধী দিকগুলো জানা, সামাজিক পরিধি বাড়ানো| হয়তো আমরা বিষয়গুলি জানি কিন্তু নিজেরা চর্চা করি না| সময় খুব দ্রুত পারি জমাচ্ছে| সময়ের কাছে সবাই হার মেনে নেয় সহজেই| কিন্তু এমনটা আমি নিজে কখনো ভাবি না| বরং আমি অন্যভাবে ভাবি মানুষ সময়কে এগিয়ে নেয়| সময় কখনো মানুষকে অতিক্রম করতে পারে না| আমরা ভালো ও বড় মনের মানুষ হবার চেষ্টা করি| মানুষের মতো মানুষ| যেখানে আবর্জনার বদলে থাকবে জীবনবোধের শৈল্পিক কারুকাজ|

কনফুসিয়াসের গভীর চিন্তাবোধের কিছু প্রশ্ন ও উত্তরের মধ্যে আমরা নিজের ভিতরের অপূর্ণ সত্তাকে খুঁজে পেতে পারি|

যেমন:

মহৎ মানুষের সাথে অন্য সাধারণ মানুষের তফৎ কি?

কনফুসিয়াস উত্তর দিলেন-,

একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ তাঁর পারিপার্শিক সমস্ত কিছুকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে করেন।

কিন্তু সাধারণ মানুষ কোন কিছুই গভীরভাবে চিন্তাকরে না।

শ্রেষ্ঠ মানুষেরা মনে করেন ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব কিছু চালিত হয়।

কিন্তু সাধারণ মানুষ ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়।

শ্রেষ্ঠ মানুষ সর্বদাই নিজের ত্রূটি-বিচ্যুতিক বড় করে দেখে।

এই ত্রূটি-বিচ্যুতি দূর করে জীবনকে আরও ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়াই থাকে তাঁর লক্ষ।

কিন্তু সাধারণ মানুষ সর্বদাই অন্যের ত্রূটি-বিচ্যুতিক বড় করে দেখে-নিজেকে মনে করে সর্বদোষ মুক্ত।

কে হতে পারে প্রকৃত জ্ঞানী

কনফুসিয়াস বলতেন, আত্মমর্যাদা না থকলে কোন মানুষই অন্যের কাছে মর্যাদা পেতে পারে না। যে মুনুষের মধ্যে এই আত্মসন্মানবোধ আছে একমাত্র সেই হতে পারে প্রকৃত জ্ঞানী|

আমরা নিজেদের কোন জায়গাটাতে দাঁড় করবো এই উত্তরগুলোর মধ্যেই হয়তো তার নির্যাস রয়ে গেছে| ভাবি আর ভাবি| শুন্যে হাত তুলে উদার আকাশের দিকে তাকিয়ে এ পি জে আব্দুল কালাম আজাদের মতো বলি “আকাশের দিকে তাকাও। আমরা একা নই। মহাবিশ্ব আমাদের প্রতি বন্ধুপ্রতীম। যারা স্বপ্ন দেখে ও সে মতো কাজ করে, তাদের কাছেই সেরাটা ধরা দেয়।”

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত