Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬
  • ||

অসুখের নাম ক্লিপটোমেনিয়া

প্রকাশ:  ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:১৫
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
প্রিন্ট icon

আমাদের শৈশবে ঘরে ঘরে এতো টেলিভিশন ছিল না। খবর এবং বিনোদনের জন্য তখন রেডিওই একমাত্র ভরসা। দুপুরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বাবা-মার সাথে নাটক শুনতাম। আমাদের বড় রেডিওটা ছিল দুটো বিছানার মাঝের টেবিলটার উপর। রবিবার ছিল তখন ছুটির দিন। বৃহস্পতিবার থেকে সবার অপেক্ষা রবিবারের নাটক। একটি নাটকের শেষের দৃশ্য এখনও আমার মনে আছে। নব বিবাহিতা নায়িকা কাঁদছে আর বলছে, “আমি চোর নই, আমি ইচ্ছে করে দোকান থেকে আংটি চুরি করিনি, এটা আমার অসুখ, ক্লিপটোমেনিয়া, আগে থেকেই তোমায় জানালে লজ্জায় অভিমানে এমন নিষ্ঠুর ভাবে অকালে চলে যেতে না, আমায় ঠিক বুঝতে পেতে, বাবা-মাকে অনেকবার বলেছিলাম বিয়ের আগেই সবকিছু তোমায় জানাতে কিন্তু তাঁরা শুনেননি।’'

সময়টা ৮৭-৮৮ ইং, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী, এক্সটেনশন বিল্ডিং এর তিন তালায় ৭৩নং রুমে থাকি। একদিন সন্ধ্যায় চোর চোর বলে আওয়াজ। ভয়ে রুমমেটকে জড়িয়ে ধরে দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিলাম। রাত ১০ টার দিকে জানতে পেলাম এই চোর সেই চোর নয়, বেশ কিছুদিন ধরেই নীচ তালার মেয়েরা হঠাৎ হঠাৎ তাঁদের আন্ডারগারমেন্টস খুঁজে পাচ্ছিল না, পরে দেখা গেল একটি মেয়ের সুটকেসে সেই হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন সাইজের স্বল্পদামি আন্ডারগারমেন্টসগুলো। বিস্ময়ে সবার চোখ ছানাবড়া । সবার উৎসুকের জায়গাটি হচ্ছে, বিভিন্ন সাইজের পুড়নো এতোগুলো জিনিস মেয়েটা আসলে কেন চুরি করেছে যা ওর কোন কাজেই আসবে না ।

স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও অনার্স বিল্ডিং এ স্নো, পাউডার,লোশান চুরি। চোর ভীষণ নামিদা, বড়লোক বাবার কন্যা যার এগুলো চুরি করার কোন প্রয়োজনই নেই।

প্রায় আট মাস যাবত কেবলই অফিস নয়তো বাসায় শুয়ে বসে জীবন কাটানো। কিন্তু বয়স হচ্ছে, কেমন অবশ অবশ লাগে, মাঝে মাঝে মাসল পুল করে, শরীর যত্ন চায়, চর্চা চায় । আজ অনেক দিন পর নামকরা একটি ক্লাবের জিমে গেছি। একজন আয়া আমায় জানানোর জন্য বলল, ম্যাডাম ঐশী (ছদ্মনাম) আপুতো আমার ব্যাগ থেকে সাড়ে তিনশো টাকা চুরি করেছিল, পরে ফেরত দিয়েছে। আরেকদিন ১০০ টাকা টেবিলের উপর থেকে নিয়ে গেছে, পার্লারে অন্য মেম্বারের মেয়ের ব্যাগ থেকেও ৫০০ টাকা চুরি করেছে। তিন দিনের তিনটি ঘটনা। ভীষণ মিষ্টি দেখতে মেয়েটিকে আমি খুব ভালো করে চিনি, আমার মেয়ের চেয়ে বড়জোর দুই তিন বছরের বড়, আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এতো বড় ক্লাবের মেম্বারের মেয়ের কিছুতেই এতো অল্পটাকার প্রয়োজন হতে পারে না। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশুনা করা মেয়েটি এখন উন্নত দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ওর পড়াশুনার পেছনে কমে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা খরচ হবে কিংবা তারও বেশী।

খোঁজ নিয়ে জানলাম ক্লাব কত্রিপক্ষ মেয়েটির গার্জেনকে জানায়নি বিষয়টি। পাছে লোক লজ্জায় কষ্ট পায় হয়তো এই ভেবে। কিন্তু আমি ভাবছি, মেয়েটির বাবা-মা’ কি জানে মেয়েটি এমন অসুস্ত ! বিদেশে যদি চুরি করতে যেয়ে ধরা পরে তখন কি হবে ! মান-সম্মানের কথা বাদ দিলেও নিশ্চিত হাজত বাস।

আমার বিশ্বাস বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ক্ষেত্রে উপড়ের তিনটি ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া মেয়ে তিনজনই ক্লিপটোমেনিয়া (Mental health disorder) রোগে আক্রান্ত। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মূলত জানেও না, তাঁরা কেন অথবা কখন চুরি করছে । ফাঁক পেলেই চুরি করে আবার লজ্জা এবং অপরাধবোধে ভোগে । অনেক রোগের ভিড়ে এটাও একটি মানসিক রোগ। সময়মত চিকিৎসা নিলে এই রোগ থেকেও হয়ত মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

যাদের পরিবারে এই রোগে আক্রান্ত কোন ব্যক্তি আছে, রাগান্বিত, ক্রোধান্বিত কিংবা লজ্জিত না হয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা সেবাই তাঁকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েটির অহেতুক চোর প্রতিপন্ন হওয়ায় বেদনাহত আমি এই লিখাটি না লিখে পারলাম না কিছুতেই। এদের প্রতি আপনাদের সহানুভূতিশীল হওয়াই আমার একমাত্র কাম্য। (ফেসবুক স্ট্যাটাস)

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি. নিউজ

ক্লিপটোমেনিয়া,খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত