• শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
  • ||

নোবেল ছেলেটির কী দোষ, সে তো নিজে বলেনি, বলানো হয়েছে

প্রকাশ:  ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১৪:০৭ | আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১৪:৩১
শাহরিয়ার বিপ্লব

ছেলেটির কি দোষ? সে তো নিজে থেকে বলে নি। তাকে দিয়ে বলানো হয়েছে। পেছনের লোকেরা এইভাবেই কাজটি করে। শুধু শিল্পী তৈরি করে নয়। কবি, লেখক, খেলোয়াড় বানায়। শিক্ষক বানায়, ডাক্তার বানায়, রাজনীতিবিদ বানায়। এদের পিছনে ইনভেস্ট করে। জনপ্রিয়ধারা জন্যে ওরা ইভেন্ট তৈরি করে, অডিয়ান্স সাজায়। তারপর তাকে দিয়েই আচমকা মূল কথাটা বলিয়ে দেয়।

যেন সহজ সরল কথা। ইনোসেন্ট।

এই ছেলেটার বলাটা এমনি ছিল। ব্যাস।

তারপরেই শুরু হয়ে গেল। যারা লেখাপড়া করে নাই তারা তো আছেই। শিক্ষিত জ্ঞান পাপীরাই এমন কিছু খোঁড়া এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে যুক্তি তুলে বিতর্ক টাকে উস্কে দিচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করার জন্য যতটুকু জানা দরকার তার ধারে কাছে না গিয়েই রবীন্দ্র বিরোধিতা। বেচারা রবীন্দ্রনাথ। যুগে যুগে বিরোধীতার মধ্যেই বেঁচে আছেন। হয়তো আরো কত শতাব্দী বেঁচে থাকবেন।

তিনি যদি শুধু একজন কবি হতেন কিংবা একজন সুরকার তাহলে হয়তো এতো বিরোধিতার মধ্য পড়তেন না। এটআ আমার একান্তই ব্যাক্তিগত অভিমত।

তিনি তো একজন দার্শনিক। মানব জীবনের সবগুলি অনুভুতির সাথে তাঁকে পাওয়া যায়। সমাজের প্রতিটি প্রেক্ষাপটে তাঁকে খোঁজা হয়।

আর এখানেই সমস্যা। ব্যাক্তিগত, সামাজিক আবেগ অনুভূতির পক্ষ বিপক্ষ থেকেই রবীন্দ্র বিরোধিতা।

আজকে যারা শুধুমাত্র হিন্দু বলে রবীন্দ্র বিরোধিতা করেছেন, তারা হয়তো জানেন না, হিন্দুরাই প্রথম তাঁর বিরোধিতা করেছেন। হিন্দু সমাজে জন্ম নিয়ে তাঁর পরিবার যখন ব্রাম্মধর্ম গ্রহন করেছিলেন তখন গোঁড়া হিন্দুরা তাঁকে সমালোচনা করেছেন।

রাজনৈতিক ভাবে প্রথম তিনি বিরোধিতায় পড়েছেন বঙ্গভঙ্গের সময় থেকেই। কারন তিনি বৃটিশদের এই দ্বিভাগ নীতি চাননি। আমরা ভারত উপমহাদেশের মানুষ এখনো যে সাম্প্রদায়িকতার আগুনে পুড়ছি সেই আগুনের সুত্রপাত সেই বঙ্গভঙ্গ থেকেই।

রবীন্দ্রনাথ তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন বলেই তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন।

যদিও তুমুল আন্দোলনের মুখে বৃটিশরা মাত্র ছয় বছর পরেই ফিরে আসেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে চুড়ান্ত ক্ষতিটা করে গেলেন।

যদিও রবীন্দ্রনাথ ততোদিন আর বেঁচে নেই। অথচ বর্তমানের কিছুলোক বলার চেষ্টা করেন রবীন্দ্রনাথ নাকি বাংলাদেশের নয়, ভারতের। সুতরাং তাঁকে আর রাখা যাবে না।

আরে রবীন্দ্রনাথ তো জন্মছিলেন ভারতে। মারাও গেছেন ভারতে। তিনি কি করে বাংলাদেশী বা পাকিস্থানী হবেন? তখন তো বাংলাদেশের অস্তিত্বই ছিল না। আমরা সভাই এক দেশ। এক বাংলা।

যেমন আমার দাদা৷ নানা। যারা বলেন তাদের দাদা নানারাও এই ভারত বর্ষে জন্ম এবং মৃত্যু। তাহলে আমাদের দাদা নানাদের আমরা বলবো তাঁরা আমাদের নন? তাঁদের নাম ধাম সব মুছে দিবো? দাদা নানাদের নামের জমি জমার উত্তরাধিকার বাদ দিয়ে দেবো?

কারন আমি তো এখন বাংলাদেশী। আর তারা ছিলেন ভারতীয়?

আমার দাদাকে যদি আমি এখনো own করতে পারি তাহলে আমার কবিকে আমি own করব না কেন?

শুধু হিন্দু বলে?

শুনেন হিন্দুরাও কিন্তু তাঁর বিরোধিতা করেছিলো। কুপমুন্ডকতা, মুর্খতা, গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি যখনই কলম ধরেছেন, তখন তারাও তাঁকে তুলাধুনা করেছেন।

১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে হিন্দু নেতারাই তার বিরোধিতা করেছেন। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সর্বাহারাদের ক্ষেপাতে রবীন্দ্রনাথকে পুঁজি করেছিলেন। কিন্তু মানুষ তা খায় নি। কারন তিনি নিজে যে কবি ছিলেন। বুর্জোয়া চরিত্র তাঁর ছিল না। জমিদারি গ্রহন করেন নি। শুধু সাহিত্য নিয়েই তাঁর জীবন এই কথাটা তাঁরা ইচ্ছে করেই চেপে গেছেন।

আর পাকিস্থান আমলে তো বার বার রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হয়েছে। কারন একটাই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্থানি সামরিক শাসক আর তার সহযোগী রাজনীতি বিদেরা রবীন্দ্রনাথকেই আক্রমণ করেছিলো প্রতিশোধের নেশায়। কারন বাংলা ভাষার কাছে পরাজয়। আর রবীন্দ্রনাথ যে বাংলাভাষারই জাত কবি। বাংলাভাষাকে বিশ্বে নিয়ে গেছেন। বিশ্বকবি। তাই রবীন্দ্রনাথকে আক্রমন মানে বাংলা ভাষাকেই আক্রমণ।

তাই তো তখন থেকেই, রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করা। হিন্দুকবির পাঠ্য থাকবে না। রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন। তিনি নজরুলের কবিতা চুরি করে লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ ষড়যন্ত্র করে তাঁর নাতিকে নজরুলের সাথে বিয়ে দিয়েছেন হিন্দু বানাবার জন্যে। জাপানে বোমা ফেলার জন্যে রবীন্দ্রনাথ চিঠি দিয়েছেন। এরকম হাজার হাজার মিথ্যা তথ্য সেই পাকিস্থান আমল থেকে খুব সচেতন ভাবেই চালু আছে বাংলাদেশে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মের প্রেক্ষাপট জানলে রবীন্দ্র বিরোধিতা আর টিকে না। রবীন্দ্রনাথ নিজে বঙ্গভঙ্গের বিরোধী ছিলেন। আর বঙ্গভঙ্গ রদের অনেক গুলি ফলাফলের একটি ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।

ররবীন্দ্র নাথ এই রদ আর অন্যান্য ফলাফলের পক্ষে ছিলেন বলেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টার মাত্র পাঁচ বছর পরেই মাত্র চারটি হলের সব কটি হলে তাঁকে সম্ব্রর্ধনা দেয়া হয়। ১৯২৬ সালের ১০ থেকে ১৬ ই ফেব্রুয়ারি। একমাত্র জগন্নাথ হল ছাড়া তিনটি হলেই তিনি সম্ভরধনা নিয়েছিলেন। এমনকি হলের ম্যাগাজিন গুলিতে তাঁর লেখাও ছাপা হয়েছিলো।

এখন উনারা বলছেন, রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলা শুনলে নাকি ঘুম এসে যায়। তাই একে বাদ দিতে হবে। জাতীয় সংগীতে নাকি যুদ্ধের দামামা থাকতে হবে।

হায়রে। একটা জাতী কি সারা জীবন যুদ্ধই করবে? তাহলে আর জাতীয় সংগীত কেন? যুদ্ধ সংগীত বললেই তো হয়।

মায়ের সাথে তুলনা করে যে মাটিকে সোনার বাংলা বলা হয়েছে। ছয়টি ঋতুর সৌন্দর্য রুপ রস দিয়ে বেষ্টনী করা হয়েছে বাংলা মায়ের রুপ। মায়ের চরণে মাথা রাখার যে বন্দনা, সব ধর্মের মধ্যেই তো আছে। সেটা হিন্দু হবে কেন? বরং মুসলিম ধর্মেই তো আছে, মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। এই মায়ের প্রতি যার আবেগ আসে না, কান্না আসে না, দরদ আসে না। সেই সন্তান কি যুদ্ধ করবে? তার জন্যে কিসের রনসংগীত। আগে তো আবেগ। তারপর বিদ্রোহ।।

আর সেজন্যেই মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা অস্ত্র হাতে মাটিতে চুমু খেয়ে মায়ের কসম করে বলেছিলো আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।

রনাঙ্গনে গুলি খেয়ে মারা যাবার মুহুর্তেও মা মা বলে মাটিতে উপুর হয়ে পড়ার মুহুর্তেও বলেছিলো, আমি তোমায় ভালোবাসি।

মাকে ভালোবাসার এই মন্ত্র বন্দনা জাতীয় সংগীত হবে না তো পাকিস্থানি বন্দনা হবে? পিতা ছাড়া সন্তানের বন্দনা হবে? আমার মায়ের সোনার আঁচলে যারা বার বার আগুন ধরাতে চায়, তাদের বন্দনা হবে?

আজ যারা এই ছেলেটিকে বলিয়েছে তারা আসলে পানি মাপতে চায়। পুরোনো খেলা। জাতীয় সংগীতে আঘাত হানো। তারপর, জাতীয় ফুল। তারপর জাতীয় সংবিধান। তারপর গণপ্রজাতন্ত্রী এর পরিবর্তে ইসলামী প্রজাতন্ত্র। সেই পাকিস্থানি চেষ্টা। আইউব, মুশতাক, জিয়া, যা পারেনি, যদি এই ডিজিটাল জেনারেশন দিয়ে পারা যায়।

ফেসবুক থেকে নেওয়া

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এআর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত