Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬
  • ||

স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার

প্রকাশ:  ০৭ মে ২০১৯, ১১:২৬ | আপডেট : ০৭ মে ২০১৯, ১৬:০৯
ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট icon

সময় বদলায়। তবে ইতিহাস কথা বলে। যদিও ইতিহাসকে অতীত বলে মনে হয় তবে ইতিহাস থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়। আর ইতিহাস থেকে যে শিক্ষা মানুষের মধ্যে গড়ে উঠে তা সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। এখানে সংস্কৃতির সাথে আবার সময় ও তার বিবর্তন নির্ভরশীল। বাঙালির সংস্কৃতির প্রকৃত রূপকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরই প্রতিফলন ঘটেছে ১৯৭১ সালে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের কথা বলতে গিয়ে সেই সময়ের ৫ এপ্রিল সংখ্যা মার্কিন সাপ্তাহিক ‘নিউজ উইক’ লিখেছিল: “রাজনীতির প্রকৗশলী নন মুজিব, মুজিব হচ্ছে রাজনীতির কবি; বাঙালির স্বাভাবিক প্রবণতা প্রায়োগিক নয়, শৈল্পিক; তাই মনে হয়, বাংলাদেশের সব মানুষ, শ্রেণি ও মতাদর্শকে এক সূত্রে গাঁথা হয়তো কেবল মুজিবের মতো রাজনৈতিক কবির পক্ষেই সম্ভব।”

সেই সংস্কৃতি যখন একটি আদর্শে পরিণত হয় তখন তা সার্বজনীন হয়ে উঠে। সবাই এই সার্বজনীন সংস্কৃতিকে অন্তরে লালন করতে পারে না। কারণ স্বাধীনতার চেতনার যে সংস্কৃতি তা একটি আদর্শের নাম। আদর্শকে আত্মিকভাবে নিজের মধ্যে প্রয়োগ করতে হলে প্রয়োজন হয় মহাত্যাগের। আর যারা সেই মহাত্যাগের উৎস হিসেবে কাজ করে তাঁরা হয়েউঠেন কালোত্তীর্ণ মহাপুরুষ। সেই মহাপুরুষদের মধ্যে ধ্রুবতারার মতো আজও আমাদের মননে ও চেতনায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মতোই রাজনৈতিক কবি আর রাজনৈতিক কবি ছিলেন বলেই তিনি সব শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষদের সেতুবন্ধন রচনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। যার কখনো মৃত্যু নেই। মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে তিনি আজও জনমানুষের মধ্যে মিশে আছেন। তাঁর রক্তের প্রতিটি কণা, দেশপ্রেম আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছে। তবে কেন তাকে দানবের হাতে রক্ত দিতে হলো? বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার।

যদি বাঙালির ইতিহাস বিশ্লেষণ করা যায় তবে দেখা যাবে সেই ইতিহাসের মধ্যে যেমন প্রকৃত ও সার্বজনীন আদর্শভিত্তিক উন্নত চিন্তাধারার মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষ জন্ম নিয়েছে তেমনি আদর্শহীন বিশ্বাসঘাতক মানুষেরা মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ফলে নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে বিশ্বাসঘাতক মির্জাফরের হাতে জীবন দিতে হয়েছে। ২৫ মার্চ ও ১৪ ডিসেম্বর গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে পরাজিত শক্তি ও তার এদেশীয় দোসরেরা স্বাধীন বাংলাদেশের মধ্যেও তাদের অস্তিত্ব বিদ্যমান রেখেছে। ফলে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তাঁর আদর্শকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি। এর মূল কারণ বাঙালির যে শক্ত শেকড় তার ভিত্তি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র আর হত্যার রাজনীতি বন্ধ করেনি মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির দোসররা। এরই প্রক্রিয়ায় সুকৌশলে তারা জনমানুষের মধ্যে মিশে গিয়েনিজেদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে।তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানুষদের হত্যা করা। আর তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হচ্ছে এই হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক শূণ্য ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করা।

খুব গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এই সূদূরপ্রসারীপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে। কারণ তিনি ছিলেন পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক একজন রাজনীতিবিদ। কর্মী থেকে তিনি জননন্দিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তী মহাপুরুষে। তাঁর রাজনীতির মূল দর্শন ছিল মানুষ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা। হৃদয়ের গভীর থেকে তিনি বাস্তব জীবনকে উপলব্ধি করে মানুষের আত্মার ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন। বিদেশি সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনার শক্তি কোথায়?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার মানুষকে ভালোবাসি’। ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আপনার দুর্বলতা কি?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘আমি আমার মানুষকে বড় বেশি ভালোবাসি’। একই দর্শন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। আর মানুষকে খুব বেশি ভালোবাসতেন বলে মানুষের যৌক্তিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি যেমন যুক্ত ছিলেন তেমনি সকল শ্রেণিপেশার মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। একদিকে তিনি ছিলেন সমাজের তৃণমূলের কর্মী ও সমাজসংস্কারক আরেকদিকে তিনি ছিলেন প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মী ও জননেতা। বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু নভেম্বর মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানী। তিনি প্রমাণ করেছিলেন উদ্ভিদের প্রাণ আছে।

আর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ১৯৫০ সালের একই মাসে গাজীপুর জেলার পুবাইল ইউনিয়নের হায়দরাবাদ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি বিজ্ঞানী না হলেও তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন দার্শনিক। তিনি প্রমাণ করেছিলেন মানুষের প্রাণের ভিতরে প্রবেশ করে কিভাবে মানুষকে আলোকিত করা যায়। আবার বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ জন্মেছিলেন এই নভেম্বর মাসেই। তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল বিষয় ছিল মানুষের জীবন ও তার বাস্তবতা। একইভাবে রাজনীতির কবি ও শিল্পী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার মানুষের জীবনের বাস্তবতাগুলো হৃদয়ে ধারণ করে তা বাস্তবে রূপায়িত করেছেন আর এর মাধ্যমে তিনি সমাজকে আলোকিত করেছেন। পরাধীন দেশে জন্ম নিয়েছিলেন এই মহাকালের মহানায়ক। মাতৃভাষায় তাঁর প্রথম উচ্চারণ ছিল ‘মা’। যা হৃদয়কে আবেগে উদ্বেলিত করে। সার্বজনীন অর্থে মা হতে পারে মাতা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি। এই তিনটি অহংকারের বস্তুকে লালন করে কোন মাহিন্দ্রক্ষণে জন্মেছিলেন তিনি। তখন তাঁর দুই বছর। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য প্রাণ দিলেন শহীদ, বরকত, রফিক, সালাম, জব্বার, শফিকসহ নাম না জানা অনেক শহীদ। সময়ের আবর্তনে তিনি বড় হয়ে উঠলেন। জানলেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। বুঝতে পারলেন, বাঙালি জাতিকে রক্ত দিয়ে তাঁর অধিকার আদায় করতে হয়। তারপর বাংলা বর্ণমালা অ, আ, ক, খ দিয়ে হাতেখড়ি হলো তাঁর শিক্ষা জীবনের। হায়দরাবাদ প্রাথমিক স্কুলে তিনি ভর্তি হলেন। এরপর প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি টঙ্গী হাইস্কুলে ভর্তি হন। সমাজ ও রাজনীতি সচেতন দেশপ্রেমিক শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার তখন থেকেই ছাত্র আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৬২ সালে ‘হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন’ শিক্ষাকে এলিট শ্রেণীর উপযুক্ত বলে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি করে দেয়। কমিশনের রিপোর্টে শিক্ষাকে লাভজনক পন্যে পরিণত করার জন্য অবৈতনিক শিক্ষা অবাস্তব ঘোষণা করা হয়। ফলে, শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকে স্তব্ধ করার ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শ্রেণিবৈষম্যের ধারণা সৃষ্টি করে বাঙালিদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের মনে পড়ে গেল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর দর্শন তাঁর মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠল। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে রাজপথে নামলেন স্কুল পড়–য়া মাত্র ১২ বছরের ছাত্র শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। এই বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথ প্রকম্পিত করলেন শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারসহ অন্যান্য ছাত্ররা। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ‘হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিলের দাবীতে মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়, আবার বাংলার মাটি শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে ১৭ সেপ্টেম্বরকে শিক্ষা দিবস ঘোষণা করা হয়। ১৯৬২ এর ৭ অক্টোবর বাঙালিরা প্রতিবাদ দিবস পালন করে। সে সময়ের প্রতিটি আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন কিশোর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। তিনি আবার বাঙালিকে রক্ত দিতে দেখলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন মানুষের মৌলিক অধিকারএকমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব। তিনি রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠলেন এবং যোগ দিলেন ছাত্রলীগে। ১৯৬৫ সালে টঙ্গী হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ঢাকার ল²ীবাজারে অবস্থিত তৎকালীন কায়েদে আজম কলেজ (যা বর্তমানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারী কলেজ) এ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। আত্মার ভিতর থেকে বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে লালন করে তিনি বুঝতে পারলেন, আন্দোলন আর আত্মত্যাগ এ দুয়ের সমন্বয়ে বাঙালির মুক্তি সম্ভব। ১৯৬৬ সালে ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। এই দাবীর মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল বা যৌথরাষ্ট্র এবং ছয় দফা দাবী কর্মসূচীর ভিত্তিতে এই ফেডারেল বা যৌথরাষ্ট্রের প্রতিনি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।

পরবর্তীতে এই ছয়দফা দাবীকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন গড়ে উঠে। যা তীব্র গণআন্দোলনের রূপ নেয়। আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক ও শামসুল হকসহ শহীদ হন ১০ জন বাঙালি। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার বুঝতে পারলেন বঙ্গবন্ধুর এই স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন একদিন স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিবে। ফলে ছয়দফা দাবী প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে আবার নামলেন শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। এবার নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করলেন রাজনৈতিক সহকর্মীদের রক্তাক্ত দেহ। সময়ের সাথে সাথে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা বাড়তে লাগল। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে উঠতে লাগল। আবার তিনি প্রত্যক্ষ করলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ও বাঙালিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র। তিনি যে বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে ধারণ করেছিলেন, এবার সেই বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা আনা হলো। একে নাম দেয়া হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেন। এই মামলায় যে অভিযোগ আনা হলো তা হলো, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ভারতের সাথে মিলে পাকিস্তানের অখন্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তবে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার উপলব্ধি করলেন তথাকথিত এই মামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে চক্রান্তমূলকভাবে অভিযুক্ত করে স্বৈরশাসক আইয়ুব খাঁন বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চান। এরই পরিপেক্ষিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনার অর্থ সংগ্রহের জন্য টঙ্গী ও জয়দেবপুরের আপামর জনতার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠিত হলো। সেই কমিটির একজন সক্রিয় ছিলেন শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার। তিনি কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সাথে ‘মুজিব তহবিল’ এর জন্য প্রতিটি কুপন ১০ পয়সা করে বিক্রি করেন। এটি ছিল তাঁর দেশপ্রেমরই প্রকাশ।

১৯৬৯ সালের ৪ই জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১দফা দাবী উপস্থাপন করেন। এই ১১ দফা দাবীর মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যকার বৈষম্যের পটভূমিতে একদিকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবির বাস্তবায়ন এবং অন্যদিকে আইয়ুব খাঁনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান। এই আন্দোলন একসময় গণআন্দোলনে রূপ নেয়। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার প্রত্যক্ষভাবে এই আন্দোলনের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। মিছিল, মিটিংসহ আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারী স্বৈরাচারী আইয়ুব বিরোধী গণ আন্দোলনের সময় তিনি আবার প্রত্যক্ষ করলেন গুলিবিদ্ধ ছাত্রনেতা আসাদের নিথর দেহ। পরবর্তীতে এই গণআন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়।আন্দোলন ও শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এর মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার আহ্বান জানান। সেই উদাত্ত আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হন এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। এই আহত অবস্থাও শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বিরত রাখতে পারেনি। এর পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর দর্শন, দেশপ্রেম, স্বাধীনতার চেতনা ও বাঙালির সার্বজনীন মুক্তি। ফলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে।

ভারতের দেরাদুনের তান্দুয়া থেকে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে ডাঙ্গা, পুবাইল, টঙ্গী, ছয়দানাসহ বিভিন্ন স্থানে গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এই প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি আক্রমণের কৌশল ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়ানোর কাজও করে চলেছিলেন। তিনি ১৯৮৩ সাল, ১৯৮৪ সাল, ১৯৮৭ সাল, ১৯৮৮ সাল, ১৯৯০ সাল, ১৯৯৫ সাল ও ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক পটভূমিতে যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা আজও আমাদের গর্বিত করে। তিনি এমন একজন নেতা যিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকারও যে রাজনীতির একটি দর্শন হতে পারে তা প্রমাণ করেছেন। তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন তিনি। তাঁকে বিকশিত করেছিলেন। আর এই বিকাশের পরিক্রমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সম্প্রসারিত হোক এই আমাদের প্রত্যাশা।

তিনি তাঁর সন্তানদের বলতেন, “দেখ, সাংসদ-পুত্র হয়ে তোমরা যেন কখনো দম্ভ করো না। ধনী দরিদ্র সকলকে সমান চোখে দেখবে। সকলের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। মানুষের উপকার করবে। দম্ভ যদি কিছু করার থাকে তবে তা করবেন তাঁরা, যাঁরা তোমার বাবাকে ভোট দিয়ে সাংসদ বানিয়েছেন”। এই আদর্শকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছেন তাঁরই সুযোগ্য সন্তান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সর্ম্পকিত সাংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল, এমপি। এটি প্রমাণ করে আদর্শের কখনো মৃত্যু হয় না। আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে যায় আগামীর প্রজন্ম। এই মহান মানুষটির ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে গাজীপুরে একটি যাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হবে তা সকলেই অন্তরে লালন ও ধারণ করে। কেননা ইতিহাস তাঁকে তৈরি করেনি, তিনিই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। খুনীরা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী একজন আগামীর বিশ্বনেতাকে। যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শন বাস্তবে রূপায়িত হত। “কাঁদো বাঙালি কাঁদো” এই অশ্রু সিক্ত বেদনার ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমাদের আজ শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। সেই আলোকিত দিনটির আশায় আমাদের প্রতীক্ষা।


লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিষ্ট

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

ইমেইল: [email protected]

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত