Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
  • ||

আমরা কেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোর কথা ভাবছি না

প্রকাশ:  ০৫ মে ২০১৯, ১৮:৫৪
ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
প্রিন্ট icon

সময়ের সাথে সাথে অনেক নতুন নতুন বিষয় নিয়ে আমরা ভাবছি। তবে সব ভাবনাগুলোই হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ ও ইতিবাচক। অনেক দিন ধরেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপদ্ধতির নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে। একেকজন একেক ধরণের মতামত দিচ্ছেন। এটা খারাপ কিছু নয়। গঠনমূলক মতভিন্নতা একটা সভ্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

সেই মত ভিন্নতা থেকে একটি সমস্যার অনেক ধরণের বিকল্প সমাধান বের হয়ে আসে। এই সমাধানগুলোর মধ্যে যেটি বাস্তবে প্রয়োগ করলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যাবে সেটিকে গ্রহণ করার মানসিকতা সবার মধ্যে থাকতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যাদের শিক্ষা পদ্ধতি পৃথিবীর অন্যতম সেরা বলে প্রমাণিত। তবে সেই প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিগুলো আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োগ না করে এখনও আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই বারবার শিক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করে চলেছি। ফলে এর বিরূপ মানসিক ও সামাজিক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের উপর। পৃথিবীর সেরা শিক্ষা পদ্ধতির দেশ হিসেবে ফিনল্যান্ড, সুইডেন, সিংগাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরও কিছু দেশ পরিচিত। ফিনল্যান্ড ৫৪ লক্ষ জনগোষ্ঠি অধ্যুষিত একটি দেশ। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো এই দেশের শিক্ষা পদ্ধতিতে আমাদের দেশের মত পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। তারপরও বিশ্বের শিক্ষার মান যাচাইয়ের অন্যতম পদ্ধতি পিআইএসএ (প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট) এর র‌্যাংকিং অনুযায়ী ফিনল্যান্ড এর শিক্ষা ব্যবস্থা টানা ৯ বছর বিশ্বের সেরা ছিল। এখনও তা অব্যাহত আছে। গণিত, বিজ্ঞান ও পঠন অভ্যাসের উপর এই মূল্যায়ন পদ্ধতিটি হয়ে থাকে। পাশাপাশি গান, ছবি আঁকা ও হাতের কাজ শিশুদের শেখানো হয়। সবচেয়ে অবাক করার মত বিষয় হচ্ছে, এখানে শিশুদের কোন পাঠ্য বই নেই।

আমরা হয়তো ভাবতে পারি পরীক্ষা নেই, পাঠ্য বই নেই তাহলে কি করে এটাকে সেরা শিক্ষা ব্যবস্থা বলা যায়। এখানকার শিশুরা ৭ বছরের আগে স্কুলে যায় না। স্কুলও ৯ টার আগে কোন ভাবেই শুরু হয় না। স্কুলে দিনে সাধারণত ৩টি থেকে ৪টি ক্লাস হয়। একেকটি ক্লাস ৭৫ মিনিট হয়ে থাকে। প্রতি ক্লাসের পর ১৫ থেকে ২০ মিনিট বিরতি দেয়া হয়, যাতে শিশুরা আগের ক্লাসে যা শিখেছে তা যেন চর্চা করতে পারে, হাটা চলা ও পস্পরের মধ্যে ভাব বিনিময় করে নতুন উদ্যোমে পরের ক্লাসটি শুরু করতে পারে। প্রতি ক্লাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জনের মত শিক্ষার্থী থাকে। হোম ওয়ার্ক এর পিছনেও অন্যান্য দেশের তুলনায় ফিনল্যান্ডের শিশুদের কম সময় ব্যয় করতে হয়। এখানে পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও বাস্তব জ্ঞান আহরণের বিষয়টি মূখ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খুব কম পরিমাণে শেখানো হয়, যাতে করে শিশুরা খুব সহজে ও খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষাকে আনন্দের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো এখানে যেহেতু পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মানসিক চাপ শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী করোরই থাকে না, তাই শিক্ষকরা নতুন নতুন মজার মজার সৃজনশীল বিষয়ে শেখানোর দায়িত্ব নিজের সিদ্ধান্ত থেকেই নিতে পারেন। পরীক্ষা না নেয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে, মেধা বিকাশের সাম্য নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে অথবা ইউরোপের অন্যকোন দেশের তুলনায় ফিনল্যান্ডে খারাপ ছাত্র ও ভাল ছাত্রের ব্যবধান সবচেয়ে কম। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার অসমমনোভাব না থাকায় তারা পরস্পরের সাথে জ্ঞানের আদান প্রদান করে তাদের মেধার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শৈশব থেকে একজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়িত হতে হয়। ফলে একজন কমলমতি শিক্ষার্থীর বাবা-মা তার সন্তানকে বঝানোর চেষ্টা করে, তাকে পরীক্ষায় ভাল করতে হলে তার ক্লাসের বন্ধুদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এতে করে শিক্ষার্থীর মনের উপর যে অতিরিক্ত চাপ তৈরী হয় তা তার প্রকৃত মেধা বিকাশে সক্ষম করে গড়ে তোলে না।

অন্যদিকে শৈশব থেকেই একজন শিক্ষার্থী তার বন্ধুদের মানুষ হিসেবে না ভেবে তার প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে তার মধ্যে যে আত্মকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনোভাব গড়ে উঠে তা কেবল শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তার জীবনযাপন ও পরবর্তী কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। আমাদের প্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমে একজন মানুষ ব্যক্তি স্বার্থ বা গোষ্ঠি স্বার্থকে সামগ্রিক স্বার্থের চেয়ে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এর ফলে তার মধ্যে সকলকে সাথে নিয়ে কাজ করার উদার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে না। শিক্ষার এই বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় আমরা দেখি অশিক্ষিত মানুষেরা কখনও দূর্ণীতিবাজ হয় না। বরং শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে দূর্ণীতি করার প্রবণতা বেশি থাকে।

এছাড়া সমাজের অন্যান্য অবক্ষয়ের কারণগুলোও শিক্ষিত মানুষগুলো দ্বারাই হয়ে থাকে। কেন ফিনল্যান্ডের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সাথে বন্ধুর মত মিশে গিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ ও ভালবাসার জায়গা থেকে শিক্ষাদান করে থাকে সে বিষয়টি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। ফিনল্যান্ডের সমাজ কাঠামো শিক্ষাকদের সম্মান অকল্পনীয়। সেখানকার স্কুল শিক্ষক হতে গেলে নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্য লাগে মাস্টার্স ডিগ্রী। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, সেখানকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম সারির ১০% পোস্ট গ্রাজুয়েটরা শিক্ষক হিসেবে চাকুরীর সুযোগ পান। এছাড়া শিক্ষক হতে হলে ডিগ্রীর বাইরে ৫ বছরের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা থাকতে হবে, যা সরকারি ৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি থেকে নিতে হবে। শিক্ষাক সমাজ ব্যবস্থায় এদের মর্যাদা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য পেশার মানুষদের চেয়ে কোন অংশেই কম না। শিক্ষকদের দিনে এখানে মাত্র ৪ ঘন্টা ক্লাস নিতে হয়। এদের কাজের চাপ অনেক কম থাকলেও ঘন্টা হিসেবে আমেরিকার চেয়ে এখানকার শিক্ষকরা বেশি বেতন পেয়ে থাকে। টানা ৪-৫ বছর একজন শিক্ষকের সান্নিধ্যে শিক্ষার্থীরা থাকে বলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিশ্বের সেরা শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম হবার পিছনে ফিনল্যান্ডের এই উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে।

এখানকার শিক্ষাকে সাজানো হয়েছে শিক্ষার্থীর বয়স ও যে পরিমাণ শিক্ষা একজন শিক্ষার্থী নিতে পারে তার মানসিক অবস্থার উপর। আমাদের দেশের মত জাপানে কোন শিক্ষা বোর্ড নেই। বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার আগ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোন ধরণের পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হয় না। এদের শিক্ষার বিভিন্ন স্তরগুলো যেমন যুগপোযোগী তেমনি বাস্তব ও জীবন সম্পৃক্ত। এখানে শিক্ষার শুরুতে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। এরা বিশ্বাস করে স্কুলের প্রথম ৩ বছর শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করার উপযুক্ত সময় নয়। বরং এ সময়ে তাদের কিভাবে ছোটদের ও বড়দের সাথে ব্যবহার করতে হবে, ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, দয়া, সত্য কথা বলা শিখতে হবে এ বিষয়গুলো খেলাধুলা ও আনন্দের মাধ্যমে জানানো হয়। নিজের কাজ যাতে একজন শিশু নিজে করতে পারে এবং কোন ধরনের কাজই যে ছোট নয় এ বিষয়টিও এ সময় শেখানো হয়। কেবল শেখানোর মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ থাকে না, এখানকার শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্কুল প্রাঙ্গন নিজেরাই পরিস্কার করে। প্রকৃতিকে চেনানো ও জানানো এখানকার শিক্ষার একটি অংশ।

জাপানের শিক্ষকরা মনে করেন শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সামাজিক কাজ কর্মে নিয়োজিত করা তাদের সিলেবাসের অংশ নয়। বরং এটি তাদের মধ্যে শৈশব থেকে দায়িত্ববোধ তৈরী ও সবাই মিলে একত্রে কাজ করার মাধ্যমে কোন একটি লক্ষকে অর্জন করার বিষয়ের সাবলম্বি করে তোলে। জাপানীরা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সহজভাবে শিশুদের পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে শেখানোর ব্যবস্থা করে থাকে। কবিতা ও জাপানীজ ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের চিন্তা শক্তিকে বাড়ানোর প্রচেষ্টাও এর সাথে যুক্ত থাকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে কোন ধরনের সামাজিক ভেদাভেদ ও বৈষম্য এখানে নেই। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্যের বিষয়টি এখনও পর্যন্ত থেকে গেছে। এই বৈষম্যের কারণে আগামী প্রজন্মের মধ্যে সমন্বিত ভাবে কাজ করে দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

সেরা শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি দেশ হলো সিংগাপুর। এশিয়ার এই দেশটির বিজ্ঞান শিক্ষাকে ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশও আজকে অনুসরণ করছে। কারণ এদের যে বিজ্ঞানের শ্রেণী কক্ষটি রয়েছে সেটি গতানুগতিক শ্রেণী কক্ষের মত নয়। বরং এটি দেখে মনে হবে বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণাগার। যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতি, কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরী, সফটওয়্যার বানানো থেকে শুরু করে রোবটিক্স ও অটোমেশনের বিভিন্ন কাজগুলো তারা হাতে কলমে করে থাকে। একই ভাবে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে জীবন সম্পৃক্ত শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখছে।

বিজ্ঞানী সত্যেন বোস জাপানিজ ও চাইনিজরা যেভাবে নিজ ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করে চলেছে তেমনি তিনি বিজ্ঞানকে বাঙালীর জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার পক্ষে যুক্তি প্রদান করে গিয়েছেন। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা বাংলা ভাষাকে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনি। এটি নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। ২০১৩ সালে ইউনিসেফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নেদারল্যান্ডের শিশুরা সবচেয়ে বেশি সুখি জীবন কাটায়। এই সুখি জীবন মানে ভোগ বিলাসিতা নয় বরং শিশুদের উপর লেখাপড়ার মানসিক চাপ সৃষ্টি না করে কিভাবে বিভিন্ন কৌশলে শিক্ষার্থীর মেধাকে বাড়ানো যায় সে প্রচেষ্টা চালানো।

পৃথিবীর সেরা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম ১০টি দেশ হলো-ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, কাতার, আয়ারল্যান্ড, এস্তোনিয়া, নিউজিল্যান্ড, বার্বাডোজ ও জাপান। আমাদের এই দেশগুলোর শিক্ষা পদ্ধতি বিচার বিশ্লেষণ করে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিকে সেরা শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিনত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে তা হলো এই দেশগুলোর শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করে আমাদের নিজেস্বতা অনুযায়ী শিক্ষার প্রকৃত স্বরূপ সন্ধান করতে হবে, যেখানে কোন অন্ধ অনুকরণ থাকবে না। তবেই শিক্ষা ও দেশ এগিয়ে যাবে।


লেখক: শিক্ষাবিদ ও কলামিষ্ট।

ই-মেইল: [email protected]

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত