Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬
  • ||

১৮৮৬ সাল থেকে ২০১৯

শ্রমিকদের সেই দাবী বাস্তবায়ন হয়নি আজও

প্রকাশ:  ৩০ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:২৮ | আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:৫৬
কেএম মিন্টু
প্রিন্ট icon

১৮৮৬ সালে আমোরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবীতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলীবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। ১৮৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক-এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।

এরপরপরই ১৮৯৪ সালের মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবী আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহবান জানানো হয়।

সেই সম্মেলনে “শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না খাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে’র ১ তারিখে “বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার” সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে পালনের দাবী জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকরী হয়।

দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টর সংগঠন তাদের দাবী জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসাবে বেছে নেয়। কোন কোন স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে। পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মে দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সে সব দেশে এমনকি এ উপলক্ষে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ এবং ভারতেও এই দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে। ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালে। আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রমের নাইট এই দিন পালনের উদ্যোগতা। হে মার্কেটের হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পয়লা মে তারিখে যে-কোন আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ সালেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকেরা যে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন করে জীবন দিয়েছিলেন, সেই আত্মদানের পথ ধরেই সারা বিশ্বে মহান মে দিবস পালিত হচ্ছে। মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। এই দিবসটিতে তাঁরা এই বার্তাই বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন যে মানবসভ্যতা বিনির্মাণে শ্রমিকদেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের শ্রমিকেরাও উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে মে দিবস পালন করবেন।

রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি নেবে। সেটি হলো আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিকতা ছাপিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো বাংলাদেশের শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তাঁদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা আছে কি না। বাংলাদেশে শ্রমিকদের একটি ক্ষুদ্র অংশ সরকারি কারখানায় কাজ করেন। বেশির ভাগের কর্মসংস্থান হলো বেসরকারি খাতে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে বিরাট ফারাক। বেসরকারি খাতের কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শ্রম আইন মানলেও বেশির ভাগ উপেক্ষা করে। অনানুষ্ঠানিক খাতে যেসব শ্রমিক কাজ করেন, তাঁদের ন্যূনতম মজুরি বা কর্মঘণ্টারও বালাই নেই।

২০১৯ সালে যখন মে দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের শ্রমিকেরা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পান। এটি তৈরি পোশাক খাতের হিসাব। অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যে ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি দাবি করা হলেও নির্ধারন করা হয়েছে ৮০০০ টাকা, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে যে ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি দাবি করা সেটি যৌক্তিক বলেই আমরা মনে করি। এর চেয়ে কম মজুরিতে একটি পরিবারের মাসের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন।

শিল্পমালিকদের মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের কাছ থেকে বেশি কাজ আদায় করতে হলে ভালো মজুরি দিতে হবে। তৈরি পোশাক খাতের মতো অন্যান্য শিল্পের শ্রমিকদেরও ন্যূনতম মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মে দিবসের পথ ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের অধিকার, বিশেষ করে মজুরি, কাজের পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তবে জাহাজভাঙা শিল্প, ইমারত নির্মাণশিল্পসহ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের বাড়তি সময় কাজ করিয়ে নিলেও ন্যায্য মজুরি দেয় না। এটি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের আশি ভাগই নারী। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক কালে পরিবহনে নারী নিগ্রহের ঘটনা বেড়েছে, যা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকার ও মালিকপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মে দিবস পালন তখনই সার্থক হবে, যখন দেশের শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মস্থলের নিশ্চয়তা পাবেন। মালিকদের উপলব্ধি করতে হবে, শ্রমিকদের ঠকিয়ে শিল্পের মুনাফা আদায় বা অর্থনীতির বিকাশ নিশ্চিত করা যাবে না। দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের ওপর যে শোষণ ও বঞ্চনা চলছে, তার অবসান হোক।

লেখক- সাংগঠনিক সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

পিবিডি/এআইএস

কেএম মিন্টু
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত