Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
  • ||

রাজনীতিকরা আর ধার্মিকরা ধর্মকে ব্যবহার করেন নিজের স্বার্থে

প্রকাশ:  ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০২:১৪
তসলিমা নাসরিন
প্রিন্ট icon

শ্রীলঙ্কায়, কেউ একজন বলেছে, রক্তের নদী বয়ে গেছে গত রবিবার। ৩২১ জন নিহত হলে আর ৫০০ জন আহত হলে যে রক্ত বয়ে যায়, সে অনেকটা নদীর মতোই দেখতে। কিন্তু কেন এই হত্যাযজ্ঞ? কার ওপর মানুষের এত ঘৃণা? কে কার কী নষ্ট করেছে?

মধ্যযুগে ধর্মযুদ্ধ হতো, এক ধর্মের লোক আরেক ধর্মের লোককে খুন করত। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আমরা সভ্য হয়েছি, আমাদের সভ্য সমাজে সব ধর্মের চমৎকার সহাবস্থান। কিন্তু ধর্মযুদ্ধ যে এখনও হচ্ছে তা অস্বীকার করার অর্থ সত্যকে অস্বীকার করা। মুসলমান খ্রিস্টানকে মারছে, খ্রিস্টান মুসলমানকে মারছে, খ্রিস্টান ইহুদিকে মারছে, ইহুদি মুসলমানকে মারছে, মুসলমান ইহুদিকে মারছে, বৌদ্ধ মুসলমানকে মারছে, মুসলমান হিন্দুকে মারছে, হিন্দু মুসলমানকে মারছে- এসব চলছেই। যতই আমরা মনে করি আমরা ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠেছি, মানুষ পরিচয়টিই আমাদের আসল পরিচয়। কিন্তু না, এখনও ধর্ম পরিচয়টিই আসল, এখনও বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ পরিচয়টিই মানুষ পরিচয়ের আগে স্থান পায়।

নিউজিল্যান্ডের এক সাদা বর্ণসন্ত্রাসী খ্রিস্টান জেনেবুঝেই মুসলমানদের মেরেছে। মুসলমান জঙ্গিরাও জেনেবুঝে শ্রীলঙ্কায় খ্রিস্টানদের মেরেছে, সে কারণে গির্জাগুলোয় আর বিদেশি খ্রিস্টান পর্যটকরা যেসব হোটেলে থাকেন, সেই হোটেলগুলোয় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।

শোনা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান জঙ্গি গোষ্ঠী আইসিস শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু মুসলিমদের সংগঠন তাওহিদ জামাতকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাস ঘটিয়েছে। একটা ছোট দেশের, একটা ততধিক ছোট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর পক্ষে আত্মঘাতী বোমারু বানানো এবং আট আটটি বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শত শত লোককে নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হয়তো সোজা নয়। আইসিস ঘোষণা করেছে, তারাই নাকি এই নৃশংসতা ঘটিয়েছে। আইসিস থেকে অনেকবারই মিথ্যে দাবি করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী কান্ড ঘটানোর দাবি মিথ্যে নাও হতে পারে, কারণ ভারত দুসপ্তাহ আগে শ্রীলঙ্কাকে এই বলে সতর্ক করেছিল যে, গির্জায় বোমা হামলা হবে খুব শীঘ্র। ভারত এই খবর পেয়েছে গ্রেফতার হওয়া এক আইসিস সদস্যের কাছ থেকে। কিন্তু ভারত থেকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ পেয়েও শ্রীলঙ্কা সতর্ক হয়নি। সতর্ক হলে ইস্টার উৎযাপন করতে কোনও গির্জাকেই দিত না। হোটেলগুলোয় কড়া নজর রাখতো।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি ভারতের পাঠানো সতর্কবার্তার খবর জানতেন না, জানলে তিনি ব্যবস্থা নিতেন। ভারতের হয়তো আরও গুরুত্ব দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে বলা এবং বোঝানো, বা শ্রীলঙ্কাকে দিয়ে জনমানুষের নিরাপত্তার ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে করানো উচিত ছিল।

এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের লোককে হত্যা করছে। এই ধর্মযুদ্ধ বন্ধ হবে কবে? অনেকে বলছে, শ্রীলঙ্কার বোমা হামলা নিউজিল্যান্ডের মসজিদে মুসলিমদের ওপর হামলার প্রতিবাদ। তারপর কোনও খ্রিস্টান জঙ্গি কোথাও মুসলমানদের মেরে প্রতিশোধ নেবে শ্রীলঙ্কায় খ্রিস্টান হত্যার। তারপর আবারও মুসলমান জঙ্গিরা কোথাও গিয়ে খ্রিস্টানদের হত্যা করবে। এই হত্যাযজ্ঞের কোনও শেষ নেই। অনন্তকাল এভাবে চলতে পারে। ধর্মযুদ্ধই তো একমাত্র যুদ্ধ নয় আমাদের পোড়া পৃথিবীতে।

নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের সহিংসতা তো চলছেই, নারীকে হেনস্তা করা, নারীকে ঘরবন্দী করা, নারীর অধিকার লঙ্ঘন করা, নারীর স্বাধীনতা ব্যাহত করা, নারীকে যৌনদাসীতে পরিণত করা, নারীকে ধর্ষণ করা, নারীকে হত্যা করা- এসব এখনও চলছে। দরিদ্রের বিরুদ্ধে ধনীর যুদ্ধ চলছে। চারদিকে শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ। মাঝে মাঝে আমি বুঝে পাই না এত বুদ্ধি মানুষের, মহাকাশযানে চড়ে ৫৪৬ লক্ষ কিলোমিটার দূরের মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার সব আয়োজন প্রায় সেরে ফেলা হয়েছে, আর মানুষ কিনা এখনও নিজেদের মধ্যে যত অপ্রয়োজনীয়, অনাবশ্যক, অনর্থক, অবিচক্ষণ সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছে, তার সমাপ্তি টানছে না।

বাংলাদেশ নিয়ে আমার ভয়। মানুষ যেভাবে মগজধোলাই হয়েছে মাত্র এক বা দুই দশকে, তার তুলনা হয় না। একসময় দেশে ভিন্নমতের একটা জায়গা ছিল। মানুষ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে, নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে এমনকি গর্ব করেও বলতে পারতো, আমি পরকালে বিশ্বাস করি না। আর আজ, বিশ্বাস না করলে ক্ষমা চাইতে হবে, বলতে হবে সে এসবে বিশ্বাস করে, নয়তো তাকে খুন হয়ে যেতে হবে। এক ধর্মে, সেই ধর্মের সব গল্পে, সব আচার অনুষ্ঠানে, সব কুসংস্কারে সবাইকে সম্মিলিতভাবে বিশ্বাস করতে হবে, তা না হলে সর্বনাশ। এমন দেশটি খুঁজে কে কোথায় পাবে? ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা দিয়ে যে দেশের শুরু, সে দেশ করছে ধর্মান্ধতাকে আলিঙ্গন!

যুবসমাজকে ধর্মের নামে মগজধোলাই করা হচ্ছে, নারীকে ঘৃণা করার, অমুসলমানকে ঘৃণা করার মন্ত্র শেখানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেউ ধর্মে অবিশ্বাস করলে সরকার তাকে জেলে পাঠাচ্ছে, কিন্তু ধর্মের নামে হিংসে, ঘৃণা, নারীবিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ যারা প্রতিনিয়ত ছড়াচ্ছে তাদের কিন্তু সরকার রীতিমতো সমীহ করে চলছে। তাদের গায়ে টোকা দেওয়া চলবে না। কাউকে কাউকে নাকি ইদানীং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওরা কি আর নিষেধাজ্ঞা মানে। আশকারা দিতে দিতে সরকার এবং ধর্মান্ধ সমাজ ওদের এমন ক্ষমতাবান করে তুলেছে যে, ওরা যা খুশি তাই করবে, সরকারকে পিছিয়ে যেতে হবে।

জঙ্গি তৈরির কারখানা এখন আর রাতের অন্ধকারে চালাতে হয় না। প্রকাশ্য দিবালোকেই অগণিত ধর্মভীরু লোককে আদেশ দেওয়া হচ্ছে, বিধর্মীদের ঘৃণা করো, ওদের মেরে ফেলো, সওয়াব হবে, বিনা বিচারে বেহেশতে যাবে। এরাই যদি একদিন শ্রীলঙ্কার জঙ্গিদের মতো গির্জায়, মন্দিরে, শিয়াদের, বাহাইদের, আহমদিয়াদের মসজিদে হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করে! এরাই যদি আবার গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটায়! হোটেলগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়! দেবে। যে হারে জঙ্গিবাদের চর্চা হচ্ছে, না হলেই বরং অবাক হবো। আইসিসের প্রচুর সদস্য মরে গেছে, কিন্তু আইসিসের আদর্শ আজও বেঁচে আছে, আদর্শ ঘুরছে বিশ্বময়।

শুধু উপাসনাগার তৈরি করে, শুধু ধর্মে ডুবে থেকে কোন জাতি উন্নত হতে পেরেছে? আমরা একটি উদাহরণও দেখাতে পারবো না। বরং সভ্য উন্নত দেশ বলতে আমরা যা বুঝি, যেসব দেশে বাস করার জন্য সব ধর্মের লোক উন্মুখ, সেই সব দেশের মানুষ কিন্তু ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে, শিক্ষা থেকে, সমাজ থেকে, জীবন থেকে প্রায় বিদেয় করে দিয়েছে। তাহলে তারা ধর্ম পালন না করেও এত কেন উদার, সহিষ্ণু, মানবতাবাদী। ধর্মের সঙ্গে উদারতা, মানবতার সম্পর্ক, সত্যি বলতে কী, নেই, যদি কিছুর সঙ্গে আদৌ কোনও সম্পর্ক থেকে থাকে, তা রাজনীতির সঙ্গে। রাজনীতিকরা আর ধার্মিকরা ধর্মকে ব্যবহার করেন নিজের স্বার্থে।

নিজে মরে হলেও অন্যকে মারবো, আত্মঘাতী বোমা হতে অনেক মুসলমানেরই আপত্তি নেই। বাংলাদেশে এমন মুসলমান নেহাত কম নেই। আইসিসে যোগ দিতে সিরিয়া বা ইরাকে পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশের লোক। তারা মরবে জেনেই গেছে। এই মৃত্যুকে তারা মহান বলে বিশ্বাস করে। দোষটা বিশ্বাসে। এই বিশ্বাস তারা কোথা থেকে পাচ্ছে, তা নিয়ে কি গবেষণা হচ্ছে। নাকি কেউ দরকার মনে করেনি! এইসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ কি নিচ্ছে সরকার? শুধু বন্দুকযুদ্ধে মেরেই সমস্যার সমাধান হয় না। নিউজিল্যান্ডে মুসলমানের মৃত্যুতে যারা চোখের জলে নাকের জলে একাকার, তারাই শ্রীলঙ্কায় খ্রিস্টানদের মৃত্যুতে নির্বিকার।

এরা হয়তো হবু জঙ্গি। এই সব হবু জঙ্গির কার্যকলাপ নজরে রাখার দায়িত্ব সরকারের। এও এক ধরনের সতর্কবার্তা। শ্রীলঙ্কা যেভাবে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল, বাংলাদেশও যদি উপেক্ষা করে, তাহলে শ্রীলঙ্কার মতোই হয়তো করুণ পরিণতি হবে। একবার নয়, বারবার। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

লেখক: নির্বাসিত লেখিকা

apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত