Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬
  • ||

কেন ঘৃণার আগুনে পুড়ছে পৃথিবী?

প্রকাশ:  ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৪৮ | আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:১৯
আলমগীর শাহরিয়ার
প্রিন্ট icon

‘সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নাই, দেশ নাই!’ — এ কথাগুলো আজকাল খুব প্রচার হচ্ছে। শুভ বোধ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষজন জোর দিয়ে এ কথাগুলো বলেন। বলেন সন্ত্রাসকে অস্বীকার করতে চান বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রত্যেক সন্ত্রাসীর অবশ্যই সুনির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস আছে। সে বিশ্বাসের আলোকেই সে জীবন দেয়। ধর্ম তাকে শেখায় নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ। অন্যরা বিধর্মী এবং শত্রু। শত্রুকে খতম করতে পারলে পরকালে রয়েছে বিনা বিচারে সর্বোচ্চ পুরস্কার। অনন্ত সুখের স্বর্গবাস। এই লোভ সহজে হাতছাড়া করার নয়। কলম্বোয় যারা আত্মঘাতি হামলা করেছে তারাও এ বিশ্বাসী প্ররোচনার বাইরে নয়। অথচ পবিত্র কুরআন শরীফের সূরা নাজিয়াতের ৩৭-৩৮ আয়াতে আল্লাহ পাক বলছেন, "আসলে যে সীমালঙ্ঘন করেছে এবং লোভ-লালসাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, জাহান্নামই হবে তার নিবাস।"

সন্ত্রাসীর অবশ্যই দেশ আছে। সে দেশ ও রাষ্ট্রে সে বেড়ে ওঠে। নিজ দেশ ও রাষ্ট্রকে সে একটি বিশুদ্ধ ধর্মরাষ্ট্র বানাতে মরিয়া। ধর্মকে খুব সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে ফেলেই সে বিচার, বিশ্লেষণ করে। সেখানে পরমত সহিষ্ণুতা নেই। কোন রাষ্ট্রের নাগরিক কোন বিশ্বাস বা আদর্শের আলোকে সন্ত্রাসী হলে দায় সে রাষ্ট্রের ঘাড়েও বর্তায়।

সন্ত্রাসীর অবশ্যই পরিবার ও সমাজ আছে। সে পরিবার ও সমাজে সে বেড়ে ওঠে। তার শিক্ষা ও সামাজীকীকরণ হয়। শিশু বয়সের পারিবারিক পরিমণ্ডলের এ শিক্ষা তার সারাজীবনের নিয়তি হয়ে যায়। পরবর্তীতে অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, প্রাচ্য বা দূরপ্রাচের কোন অক্সফোর্ডও তাকে খুব বেশি বদলাতে পারে না।

তাই সন্ত্রাসীর কোন দেশ নাই, ধর্ম নাই বলে চোখ বুঝে থাকা অনেকটা ঝড়ের সময় মরুভূমিতে উঠপাখির মুখ বুজে থাকা গল্পের মত শোনায়। এসব সুলভ কথা বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ দেখি না। মাসাধিকাল আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের এক মসজিদে পবিত্র জুম্মার নামাজ আদায়কালে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের এক পাণ্ডা তার বর্ণবাদী উন্মাদনায় ইতিহাসে এক নজীরবিহীন নৃশংস কাপুরোষোচিত হামলায় ৫০ জনের মত নিরীহ মুসলিমকে হত্যা করে। শান্তির দেশখ্যাত নিউজিল্যান্ডে এমন অভাবনীয় হামলায় সারা বিশ্বের মানুষ শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আমাদের দেশেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার গীর্জায় ভয়াবহ হামলার পর যদি তার সিকি ভাগকেও ভিন্ন বিশ্বাসীদের হত্যায় এমন জোরালো প্রতিবাদ করতে দেখতাম তাহলে আমরা বাসযোগ্য সুন্দর এক পৃথিবীতে বাস করছি বলে স্বস্তিবোধ করতাম।

আজকাল মানুষের প্রতিক্রিয়ার প্রাথমিক তুফানটা টের পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলার সময় যারা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন তাদের অনেকেই শ্রীলঙ্কায় হামলার পর নির্বিকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিব্যি ফুল পাখি নিসর্গের ছবি আপলোড করছেন-সেদিনের প্রতিবাদীরা। কেউ প্রোফাইল পিকচার আপলোড করছেন, নির্বিরোধ বিশুদ্ধ শিল্পী ও কবিদের কেউ কেউ শিল্প সৃষ্টির প্রসববেদনা অনুভব করছেন, কেউ কবিতার রসদ খুঁজে চলেছেন। এ যেন সেই প্রাচীন রোমের গল্প। "রোম যখন পুড়ে, নীরু বাঁশি বাজায়।" এরাই আজকের যুগের নীরু।

রোববার দিবাগত রাত ছিল পবিত্র শবে বরাতের রাত।

অজপাড়া গাঁ নয়, রাজধানী শহরের এক সুপরিচিত এলাকার কেন্দ্রীয় মসজিদে হুজুরের কিছুক্ষণ বয়ান শুনলাম। তিনি ফজিলতপূর্ণ এ রাতের বর্ণনা দিলেন। এ বর্ণনা আমি আমার জন্মের পর থেকে বহুবার শুনেছি। দোয়ার পূর্ব মুহূর্তে তিনি মসজিদ সম্প্রসারণ কাজের জন্য উপস্থিত মুসল্লিদের সহায়তা চাইলেন। আগামী ঈদের জামাতের পূর্বেই তিনি কাজ সম্পন্ন দেখতে চান। মহা বরকতের এ রাতে দান করলে কত সহস্র গুণ ফিরে আসবে তাও সবিস্তারে বললেন। সঙ্গে আরও যোগ করলেন, যাদের পিতা মাতা, শ্বশুর, শাশুড়ি গত হয়েছেন তাদের আত্মা আজ জমিনে রেখে যাওয়া বংশধরদের দিকে তাকিয়ে আছেন। যদি তারা দান খয়রাত করেন তার সওয়াব তাদের মুক্তি ও মাগফেরাতের কাজে লাগবে। এমন রাতে, এমন কথায় হৃদয় সত্যি আর্দ্র ও দানের অনুকূল হয়ে ওঠে। উপস্থিত মুসল্লিদের থেকে প্রত্যাশামাফিক সাড়াও পাওয়া গেল। তারপর তিনি দোয়া করলেন। আশা করেছিলাম আগের দিন ঘটে যাওয়া নৃশংস হামলা নিয়ে কিছু বলবেন। ধর্মের নামে সংঘটিত—ধর্মবিরোধী এমন বর্বর ঘটনার নিন্দা করবেন। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, একবারও শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত নিরীহ নিরপরাধ মানুষগুলোর রক্তপাতের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কিছুই বললেন না। দোয়াও করলেন না। আজকালকার টেক স্মার্ট এই হুজুরেরা ভালো করেই জানেন নিহতের তালিকায় শুধু যে বিধর্মী রয়েছে, তা না। মুসলিমও রয়েছেন। রয়েছে জায়ান নামে আমাদের দেশেরই একটি নিষ্পাপ শিশুও। অন্য কোথাও এর প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে থাকলেও সে সংখ্যা খুবই নগণ্য।

অথচ মাত্র মাসাধিকাল আগে নিউজিল্যান্ডে নির্বিচারে মসজিদে ঢুকে প্রার্থনারত মুসল্লিদের হত্যার পর দেশটিতে বসবাসরত মুসলমানদের মনের গভীর ক্ষত প্রশমনে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে আজান, সংসদে পবিত্র কোরান তেলওয়াত, পরবর্তী শুক্রবারে সাড়ম্বরে আক্রান্ত মসজিদে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা, মুসলমানদের ধর্মীয় রীতিতে পোশাক পরিধানসহ কি-ই না করলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন। রাজনীতির ফায়দা প্রলুব্ধ নষ্ট সময়ে বিশ্ব দেখল এক উদার, মানবিক রাষ্ট্রপ্রধান। তথ্য প্রযুক্তির যুগে আমাদের দেশের সকলেই তা দেখেছে কিন্তু তা থেকে কিছুই শিখিনি আমরা। তুলনা করলে শুধু ভাবতে হয় কত সংকীর্ণ হয়ে গেছে আমাদের বোধ, বিশ্বাস ও ধর্মচর্চা।

নীতিবিদ ম্যুর তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, "শুভ'র প্রতি অনুরাগ ও অশুভের প্রতি বিরাগই হচ্ছে নৈতিকতা।" কিছু মানুষের এই সুবিধামত জায়গায় চুপ মেরে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছে আমাদের নৈতিক স্খলন আজ উদ্বেগজনক। এই নীরবতা, প্রতিবাদহীনতা ভয়ংকর।

নাৎসী জার্মানীর প্রতিরোধ যোদ্ধা ফ্রেডরিক গুস্তাবের সেই আলোচিত গল্পটি মনে করা যেতে পারে।

—যখন নাৎসীরা কমিউনিস্টদের খুঁজে আসল, আমি নীরব থাকলাম। আমি তো কমিউনিস্ট না।

তারা যখন সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের ধরে নিয়ে গেল, আমি চুপ থাকলাম। আমি তো সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের কেউ না।

তারা যখন ট্রেড ইউনিয়নের কর্মীদের খুঁজে আসল, এবারও আমি চুপ মেরে রইলাম। আমি ট্রেড ইউনিয়ন করিনা।

তারা যখন ইহুদীদের খুঁজে আসল যথারীতি আমি চুপ মেরে থাকলাম। আমি তো আর ইহুদী না। মরছে ইহুদী, মরুক।

তারা যখন আমার খুঁজে আসল, তখন আর আমাকে রক্ষা করার কেউ রইল না।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন যথার্থই বলেছিলেন, দুনিয়া ধ্বংস হবে খারাপ মানুষের খারাপ কর্মের জন্য না। যারা খারাপ কর্ম দেখেও প্রতিবাদ না করে চুপ করে থাকে তাদের জন্য।

আমাদের অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের একটি বহুল উদ্ধৃত কথা রয়েছে,‘নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়?’ — না, এড়ায় না। আগুন যখন লাগে তখন ঘর, বসতি, দেবালয় কিছুই এড়ায় না। ঘৃণার আগুন লেগেছে। যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের আগুনে পুড়ছে পৃথিবী। এই সর্বগ্রাসী আগুন থেকে সহজে কারো মুক্তি নেই। মুক্তি কেবল পৃথিবীর সকল ধর্ম, মত ও পথের মানুষকে বুক বাড়িয়ে ভালোবাসায়। ঘৃণা, বিদ্বেষ আর প্রতিশোধস্পৃহার যে ভয়ংকর আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে পৃথিবী, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার আগে — সে আগুন নিভানো আজ জরুরী।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

সন্ত্রাসী,রাষ্ট্র,নাগরিক,নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ,শ্রীলঙ্কা
apps
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত