• শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯
  • ||

প্রশংসায় ভাসছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ

প্রকাশ:  ২৫ জুন ২০২২, ০৯:৫১
নিজস্ব প্রতিবেদক

আত্মনির্ভরশীলতা বা আত্মমর্যাদাই বৃদ্ধি করেনি বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান উঠে এসেছে এক অনন‌্য উচ্চতায়। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের সবচেয়ে বড় এই স্থাপনার নজির গড়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রশংসা ও অভিনন্দনে ভাসছে বাংলাদেশ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যার অদম‌্য ইচ্ছাশক্তিতে বাস্তবে রূপ পেয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

যুক্তরাষ্ট্র পদ্মা সেতুকে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সংযোগের উন্নয়নে বাংলাদেশের নেতৃত্বের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছে। মার্কিন দূতাবাসের জারি করা একটি মিডিয়া নোটে বলা হয়েছে, ‘পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করবে, বাণিজ্য বৃদ্ধি করবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।’

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য জনগণ এবং পণ্যকে দক্ষতার সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য টেকসই পরিবহন অবকাঠামো তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, ‘পদ্মা সেতু আমার কাছে সাহসের একটি প্রতীক, সংকল্পের প্রতীক এবং সমৃদ্ধির প্রতীক।’

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘শনিবার একটি মহৎ দিন! বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা বহুমুখী সেতু অবশেষে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে, আর এক দশকের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে! এ পর্যায়ে আমি এই অসামান্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাতে চাই।’

চীনা রাষ্ট্রদূত নিজস্ব অর্থে বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণে সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘সেতুটি আমার কাছে সাহসের একটি প্রতীক। স্বল্পোন্নত দেশ বাংলাদেশ এমন সেতু নির্মাণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। তারপরও বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বপ্ন অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। আজ সেতুটি শুধু বাস্তবায়নই হয়নি, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে এর শতভাগ নির্মিত হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে যদি সাহসের কোনো সীমা না থাকে, তবে আকাশ তার সীমা।’

তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতু একটি সংকল্পের প্রতীক। সেতুটি নির্মাণে সময় লেগেছে আট বছর। শক্তিশালী পদ্মার স্রোতধারার ওপর এর অবয়ব একটি গল্প বলছে যে, কীভাবে মানব প্রকৌশল প্রকৃতির শক্তিকে জয় করেছে। নদী হয়ত হাজার বছর ধরে বহমান, কিন্তু এর চেয়ে বেশি টেকসই হলো সেই মানুষের অধ্যবসায়, যারা একদম শূন্য থেকে সেতুটি তৈরি করেছেন।’

লি জিমিং আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতু সমৃদ্ধিরও প্রতীক। বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে সেতুটি বাংলাদেশের জিডিপি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারে এবং বাংলাদেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে উপকৃত করতে পারে।’

‘এটি কেবল এ দেশ এবং অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে না, বরং অভিন্ন সমৃদ্ধি এবং একটি সমন্বিত ভবিষ্যতের পথে পরিচালিত করার মাধ্যমে আমাদের দুই দেশের মানুষকে হৃদয় দিয়ে সংযুক্ত করবে।’

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কে দোরাইস্বামী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘কঠিন’ কিন্তু ‘সাহসী’ সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘতম সেতু নির্মাণে বাংলাদেশের কৃতিত্বের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, পদ্মা সেতু একই সাথে ঐতিহ্যবাহী বাংলার সংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

দোরাইস্বামী বলেন, একটি বড় প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও, পদ্মা সেতু শুধু ইট ও স্টিলের নিরিখে একটি বিশাল কাঠামো নয় বরং এটি হচ্ছে প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপারের মানুষের সংস্কৃতি ও আবেগের প্রতীকী সংযোগকারী।

তিনি বলেন, ‘সেতুটি ব্যবসার চেয়েও অনেক কিছুর সংযোগকারী; এটি মানুষের সংযোগকারী, এটি আবেগের সংযোগকারী এবং এটি বাংলার সংস্কৃতির সংযোগকারী।’

তিনি বলেন, এটি ভারতের বাঙালিদের জন্যও একটি ‘শুভক্ষণ’।

হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণ করা কঠিন কাজ ছিল এবং এটি শেখ হাসিনার অব্যাহত ও দৃঢ় সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি বিশেষভাবে বলতে চাই, ভারতীয় হিসেবে আমরা ভালোভাবে অনুভব করি যে, এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) ‘অব্যাহত ও দৃঢ় সাহসী সিদ্ধান্ত।’

দোরাইস্বামী বলেন, পদ্মা সেতু শুধু দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকেই নয়, বরং উপ-অঞ্চল এবং স্পষ্টতই ভারতকেও সংযুক্ত করবে।

তিনি বলেন, ‘সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, দীর্ঘকাল ধরে উপ-অঞ্চল জুড়ে সংযোগ বাড়ানোর সুযোগের অপেক্ষায় থাকা দেশ হিসাবে ভারতে আমরা আনন্দিত।’

হাইকমিশনার বলেন, যখন বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালের প্রথম দিকে বিদেশী ঋণ নিয়ে এই কাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল, তখন ‘আমরা (ভারত) ছিলাম প্রথম দেশ, আমরা যেভাবে সম্ভব এই প্রকল্পের সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।’ কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন নিজস্ব (অভ্যন্তরীণ) অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন তখন ভারত আবারও ‘তার সিদ্ধান্তের প্রতি জোরালো সমর্থন জানায় এবং আমরা সরবে এবং প্রকাশ্যে আমাদের সমর্থন জানাই।’

হাইকমিশনার বলেন, শেখ হাসিনার এই প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে এবং নয়াদিল্লি এই বড় অগ্রগতির ফলস্বরূপ ‘সংযোগ, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সহজ ভ্রমণের’ সুবিধার প্রত্যক্ষ করার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে।

দোরাইস্বামী বলেন, শুধু বাংলাদেশ ও ভারত নয়, বিশেষ করে নেপালও পদ্মা সেতুর কারণে বাংলাদেশে দ্রুত ঢুকতে পারবে এবং ‘আমি মনে করি এটি দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে তার আন্তরিক অভিনন্দন জানাতে গিয়ে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকো বলেছেন, ‘এই পদ্মা সেতু হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি চমৎকার মাইলফলক। আর এটি বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে নির্মাণ শেষ হয়েছে।’

তিনি পদ্মা সেতুকে দেশের স্বপ্ন ও গর্ব হিসেবে অভিহিত করেন। বাংলাদেশ এর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য কি করতে পারে এটি তার বড় প্রমাণ। তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধিও আকাঙ্খা পূরণ করবে।

নাওকো বলেন, তার দেশ দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের চলমান প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিতে আগ্রহী।

তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে এক সময় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হবে। জাপান সরকার ও জাইকা এই সরকারের নির্মাণ প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনার অবস্থানে থাকবে।’

রাষ্ট্রদূত বলেন, বর্তমানে জাপান সরকারের অবস্থান হচ্ছে ‘আমরা বাংলাদেশ সরকারের দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে আমাদের সহযোগিতা প্রস্তাবের সুযোগ নেব।’

তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে এটি (পদ্মা সেতু) অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল হবে। সুতরাং, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হবে একটি বাস্তবতা।’

ইতো বলেন, এক্ষেত্রে বাংলাদেশে মানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা থাকলে টোকিও ভালো প্রযুক্তি দিতে প্রস্তুত রয়েছে। জাপান এ পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে ছোট ও বড় ১৩৪টি সেতু নির্মাণে সহযোগিতা করেছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, এ মাসে পদ্মা সেতু এবং এ বছরের শেষ নাগাদ মেট্রো রেলসহ বিভিন্ন মান সম্মত অবকাঠামো উদ্বোধনের নজির সৃষ্টির মাধ্যমে ২০২২ সাল বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের কথা স্মরণ করে নাওকি বলেন, তিনি পদ্মা সেতু ও রূপসা সেতু দুটি সেতুতে সহযোগিতার জন্য জাপানের কাছে অনুরোধ করেছিলেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি পদ্মা সেতুর প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে এবং রূপসা সেতু নির্মাণ করেছে।

তিনি বলেন, ‘এটি সন্তোষজনক বিষয় যে, জাপান একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এই (পদ্মা সেতু) প্রকল্পের অংশ হতে পেরেছিল।’ রাষ্ট্রদূত অবশ্য বলেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, জাইকা পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের অংশ হতে পারেনি যদিও এটা জাপান সরকারের আগ্রহ ছিল।

তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বলেন, এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ নিজে থেকে কতটা করতে সক্ষম।

তিনি বলেন, জাপান রূপকল্প-২০৪১ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় জাপান পাশে থাকবে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, তিনি নিশ্চিত যে, জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিআইজি-বি এলাকার বাইরের সম্ভাবনা খোঁজার আরও সুযোগ থাকবে কারণ, এই পদ্মা সেতু বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ বাড়বে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জেরেমি ব্রুয়ার বলেছেন, পদ্মা সেতু প্রতিবেশীদের সাথে বাংলাদেশিদের আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত করে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ‘গতিশীল’ করবে।

তিনি বলেন ‘সেতুটি বাংলাদেশিদের বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে আরও কার্যকরভাবে সংযোগ বৃদ্ধি এবং এতদঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতিশীল করার কাজটি সহজ করে তুলবে।’

ব্রুয়ার বলেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশিদের জন্য একটি বড় অর্জন এবং সব বাংলাদেশির জন্য এটা গবের্র বিষয়। তিনি অস্ট্রেলিয়াবাসীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতু ভ্রমণ সময় কমিয়ে সারা দেশে মানুষের সহজ চলাচল, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা এবং নিজ পরিবার-পরিজনদের দেখাশুনাসহ জীবন যাত্রাকে সহজ করে জাতীয় অর্থনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।’

পূর্ব পশ্চিম/ম

পদ্মা সেতু
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close