• রোববার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯
  • ||

হাদিসুরের মায়ের আহাজারি

‘আমার পোলার মুখটা শেষবার দেখতে চাই’

প্রকাশ:  ১০ মার্চ ২০২২, ০০:৪০ | আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ০০:৪৭
নিজস্ব প্রতিবেদক

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’তে হামলার ঘটনায় আটকাপড়া ২৮ নাবিক দেশে ফিরেছেন। ওই হামলায় নিহত হন জাহাজটির থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান। জাহাজটির ২৮ নাবিক ফিরলেও ফেরেনি তার লাশ। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্য নাবিকদের ফিরে আসা দেখছিলেনহাদিসুর রহমানের বৃদ্ধ বাবা-মা ও ভাই। এ সময় সন্তানহারা মায়ের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে বিমানবন্দর।

বুধবার (৯ মার্চ) দুপুর টার্কিশ এয়ারলাইনসের টিকে-৭২২ বিমানে দেশে ফেরেন ‘বাংলার সমৃদ্ধির’ জাহাজের নাবিকরা। দুপুর ২টার দিকে ইমিগ্রেশন ও বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে একে একে বেরিযে যান ২৮ নাবিক।ফিরে আসা নাবিকদের স্বজনেরা প্রিয়জন ফিরে আসায় আনন্দে সিক্ত হয়ে ওঠেন।

এ সময় ডুকরে ওঠেন হাদিসুরের মা আমেনা খাতুন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, সবাই ফিরে আসলো, কিন্তু আমার পোলা কই? আমার বাবাকে (ছেলে) ফেরত চাই। আমার পোলার মুখটা শেষবার দেখতে চাই।

আমেনা বেগম বলেন, বাবায় কইছিলো আমারে বিদেশ নিয়া যাইবে, জাহাজ ঘুরাইয়া দেখাইবে। কিন্তু তা আর হইল না, আল্লাহ তারে নিয়া গেলো। আমার ছেলে তো আর বাইচ্চা নাই। এহন লাশটা যাতে পাইতে পারি সেজন্য সরকারের কাছে অনুরোধ রইল। আমার পোলারে আমি শেষ দেখা দেখতে চাই। লাশ না পাইলে আমার বাবার চিহ্নটাই থাকবে না।

হাদিসুরের বাবা আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদারও কান্নায় ভেঙে পড়েন। হাতে থাকা ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, এটা আমার ছেলে।

নিহত হাদিসুর রহমানের স্বজনদের বিলাপ আর আহাজারি বিমান বন্দরের পরিবেশ ভারী করে তোলে।পরিবারের সব চেয়ে মেধাবী সদস্যের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছে না পরিবার।

নিহত নৌপ্রকৌশলী হাদিসুর রহমান আরিফের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে। তিনি ওই এলাকায় নাদেরিয়া মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। চার ভাইবোনের মধ্যে হাদিসুর মেজো।

আরিফের বাবা আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, ‘আমার ছেলে তো আর নেই। বাবারে শেষ দেখা দেখতেও পারলাম না। আমাদের বাঁচার অবলম্বনটুকু শেষ। এখন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি, আমরা যেন আমাগো আরিফের লাশটা পাইতে পারি। ক্ষতি যা হওয়ার হইছে, এহন পোলার লাশটা আইন্না দ্যান আমনেরা।’

গত বুধবার মা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেন হাদিসুর। বাড়িতে এসেছিলেন মাস ছয়েক আগে। তবে পরিবারের সঙ্গে নিয়মিতই যোগাযোগ ছিল তার। জানিয়েছিলেন, আটকে থাকা জাহাজ ছাড়া পেলে শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু ওই দিন বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’ রকেট হামলার শিকার হলে নিহত হন হাদিসুর রহমান আরিফ।

স্বজনেরা জানান, আট বছর ধরে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বিভিন্ন জাহাজে কর্মরত ছিলেন আরিফ। বুধবার জাহাজ থেকে ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্সকে ফোন করেন তিনি। নেটওয়ার্ক না থাকায় জাহাজের ওপরে উঠে প্রিন্সের সঙ্গে কথা বলার সময় জাহাজে একটি বিকট শব্দ হওয়ার পর আরিফের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আরিফের ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স বলেন, ‘গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় সর্বশেষ ভাইয়ার সঙ্গে কথা হয়। রাশিয়ান সৈন্যদের হামলার সময় ভাইয়া বাইরে এসে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। কথা বলার সময় হঠাৎ একটি বিকট শব্দ হয়। পরে কিছুই শুনতে পাইনি। আমার ভাই ঘটনাস্থলেই দগ্ধ হয়ে মারা যান। আমার ভাইকে তো আর ফিরে পাব না, এখন আমরা শুধু লাশটা ফিরে পেতে চাই।’

হাদিসুরের মরদেহ এখনও ইউক্রেনে রয়েছে এবং তার মরদেহ দেশে আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজের ২৮ নাবিক দেশে ফেরার পর জাহাজটির গ্রুপ ক্যাপ্টেন জি এম নূরে আলম বলেন, অত্যন্ত গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি আমাদের সহকর্মী ও থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুরের মৃত্যুতে। তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা তার মরদেহ হিমঘরে রেখে এসেছি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব ইউরোপ ও সিআইএস অনুবিভাগের মহাপরিচালক শিকদার ব‌দিরুজ্জামান বলেন, হাদিসুরের পরিবারের প্রতি আমরা সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। তার দেহাবশেষ অতিসত্বর দেশে নিয়ে আসব।

পূর্বপশ্চিম-এনই

হাদিসুর রহমান,ইউক্রেনে নিহত নাবিক,বাংলার সমৃদ্ধি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close