• রোববার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭
  • ||

চিরনিদ্রায় শায়িত এইচ টি ইমাম

প্রকাশ:  ০৪ মার্চ ২০২১, ১৯:৪২
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম (হোসেন তৌফিক ইমাম)। বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) বিকেল দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। দাফনের আগে এইচ টি ইমামকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

মরহুমের দ্বিতীয় জানাজায় মরহুমের ছেলে সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটির করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা, সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া নামাজে জানাজায় বিপুলসংখ্যক মুসল্লি অংশ নেন।

জানাজা শেষে মরহুমের ছেলে তানভীর ইমাম বলেন, মঙ্গলবার (২ মার্চ) রাতে বাবা শেষ কয়েকটি কথা বলেছেন। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেছেন ‘হে আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিও। আমার সন্তান ও পরিবারের সব সদস্যসহ দেশবাসীকে মাফ করে দিও। আমার বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত রাষ্ট্রের ভালোর জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সন্তুষ্টি সব সময় তালাশ করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, আগামী ৮ মার্চ গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে বাদ আসর বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হবে। দেশবাসীকে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

এর আগে বৃহস্পতিবার (৪ মার্চ) বেলা ১১টায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া আকবর আলী সরকারি কলেজ মাঠে এইচ টি ইমামের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। এরপর বিকেল ৫ টায় গুলশান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে (আজাদ মসজিদ) তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়।

বুধবার (৩ মার্চ) দিনগত রাত সোয়া ১টায় রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চি‌কিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল ক‌রে‌ন তিনি। ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণকারী এইচ টি ইমামের বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করা এইচ টি ইমাম আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও দলীয় নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।

তার প্রকৃত নাম হোসেন তৌফিক ইমাম। তবে তিনি এইচ টি ইমাম নামেই পরিচিত ছিলেন। এইচ টি ইমাম তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। ২০১৪ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়।

এইচ টি ইমাম ১৯৩৯ সালের ১৫ জানুয়ারি টাঙ্গাইল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা তাফসির উদ্দীন আহমেদ বি.এ. বি.এল. ও মাতা তাহসিন খাতুন। পিতার চাকরির সূত্রে শৈশবে রাজশাহীতে অবস্থান, সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা। পরবর্তী সময়ে লেখাপড়া করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও কলকাতায়। ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছেন ঢাকা কলেজিয়েট হাইস্কুল থেকে। এরপর ভর্তি হন পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজে। এখান থেকেই ১৯৫৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী কলেজ এবং সেখান থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৫৬ সালে। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এ সময় তিনি প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ডিগ্রি অর্জন করেন।

পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে সদস্য হিসেবে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেন। শুরুতে তিনি রাজশাহী কালেক্টরেটে তিনি ১৯৬২-১৯৬৩ মেয়াদে অ্যসিন্ট্যান্ট কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।

এরপর তিনি পদোন্নতি লাভ করেন এবং ১৯৬৩-১৯৬৪ মেয়াদে নওগাঁ মহকুমা মহকুমা প্রশাসক বা এসডিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি নারায়ণগঞ্জ মহকুমার এসডিও হিসেবে বদলি হন এবং প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর পর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ক্যাবিনেট সচিবের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৭৫-এর ২৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ক্যাবিনেট সচিবের পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত সাভারস্থ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত তিনি সড়ক এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব-এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত পরিকল্পনা সচিবের পদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া যমুনা মাল্টিপারপাজ ব্রিজ অথরিটির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এইচ টি ইমামের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

এইচ টি ইমাম
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close