• বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

এএসপি আনিসুল হত্যা মামলায় জামিন পেলেন চিকিৎসক মামুন

প্রকাশ:  ২২ নভেম্বর ২০২০, ২০:১৫ | আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২০, ২০:১৯
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিম শিপন হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনের জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। আজ রোববার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ধীমান চন্দ্র মণ্ডল এ আদেশ দেন।

এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকার মহানগর পুলিশের অপরাধ ও তথ্য বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরুজ্জামান মণ্ডল। তিনি বলেন, চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুনের আইনজীবী রোববার আদালতে জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার আবদুল্লাহ আল মামুনকে দুদিন ও আদাবরের মাইন্ড এইড অ্যান্ড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড অ্যাডিকশনের অন্যতম মালিক ফাতেমা আক্তারকে চার দিনের রিমান্ড শেষে গত শুক্রবার ঢাকার সিএমএম আদালতে নেওয়া হয়। শুনানি শেষে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। ১৫ নভেম্বর ফাতেমা আক্তারের চার দিন এবং ১৭ নভেম্বর আবদুল্লাহ আল মামুনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

মানসিক সমস্যায় ভুগে আদাবরে মাইন্ড এইড অ্যান্ড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড অ্যাডিকশন নামের বেসরকারি হাসপাতালে ৯ নভেম্বর ভর্তি হন পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল করিম। তার পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পরপর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে মারধর করে হত্যা করেন। মারধরের সেই ভিডিও ভাইরাল হয়। পরে মাইন্ড এইড হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনায় রাজধানীর আদাবর থানায় আনিসুল করিম শিপনের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ বাদী হয়ে ১৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন- মাইন্ড এইড হাসপাতালের পরিচালক মুহাম্মাদ নিয়াজ মোর্শেদ, মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয়, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বির, কিচেন শেফ মো. মাসুদ, ওয়ার্ড বয় জোবায়ের হোসেন, ফার্মাসিস্ট মো. তানভীর হাসান, ওয়ার্ড বয় মো. তানিম মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম চন্দ্র পাল, মো. লিটন আহাম্মদ ও মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ, মোছা. ফাতেমা খাতুন ময়না ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন। এঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ ছাড়া মো. সাখাওয়াত হোসেন ও সাজ্জাদ আমিন নামে দুই আসামি পলাতক আছেন।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেছেন, আনিসুল করিমকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। মাইন্ড এইডে মারধরে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল অচেতন হয়ে পড়লে মামুন সেই হাসপাতালে ছুটে আসেন এবং আনিসুলকে অ্যাম্বুলেন্সে করে জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নিয়ে যান।

আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর দুদিন আগে গ্রেপ্তার করা হয় মাইন্ড এইডের অন্যতম মালিক ফাতেমা আক্তারকে।

অভিযোগ উঠেছে, যেসব চিকিৎসক প্রায় নিয়মিত মাইন্ড এইড হাসপাতালে রোগী পাঠাতেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনও। পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকেও কৌশলে বিতাড়িত করে মাইন্ড এইড হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন তিনি। ওই হাসপাতালে চিকিৎসার নামে অনৈতিক বাণিজ্য করা হয়—তা জেনেশুনেও তাকে সেখানে পাঠানো হয়। ঘটনার দিন মাইন্ড এইড হাসপাতালের ম্যানেজার আরিফকে ফোন করে ডা. মামুন পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন।

৩১তম বিসিএসে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান আনিসুল করিম। সর্বশেষ তিনি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) ট্রাফিকের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তিনি এক সন্তানের জনক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি।

এজাহারে হত্যার বর্ণনা

মামলার এজাহারে বাদী বলেন, আমার ছেলে আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার। আমার ছেলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হিসেবে কর্মরত ছিল। তিন-চার দিন ধরে তাকে চুপচাপ হয়ে যেতে দেখে পরিবারের সবার মতামত অনুযায়ী চিকিৎসা করানোর জন্য গত ৯ নভেম্বর প্রথমে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাই। পরে আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য একই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আরিফ মাহমুদ জয়, রেদোয়ান সাব্বির ও ডা. নুসরাত ফারজানা আনিসুল করিমকে হাসপাতালে ভর্তির প্রক্রিয়া করতে থাকেন। ওই সময় আমার ছেলে হাসপাতালের সব স্টাফের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করে। হাসপাতালের নিচতলায় একটি রুমে বসে হালকা খাবার খায়। খাবার খাওয়ার পর আমার ছেলে ওয়াশরুমে যেতে চায়। বেলা পৌনে ১২টার দিকে আরিফ মাহমুদ জয় আমার ছেলেকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে হাসপাতালের দোতলায় নিয়ে যান। তখন আমার মেয়ে উম্মে সালমা আমার ছেলের সঙ্গে যেতে চাইলে আসামি আরিফ মাহমুদ জয় ও রেদোয়ান সাব্বির বাধা দেন এবং কলাপসিবল গেট আটকে দেন। তখন আমি, আমার ছেলে রেজাউল করিম ও মেয়ে ডা. উম্মে সালমা (সাথী) নিচতলায় ভর্তি প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত ছিলাম। এরপর এজাহারে উল্লেখিত আসামিসহ আরো অজ্ঞাতনামা কয়েকজন আমার ছেলে আনিসুল করিমকে চিকিৎসার নামে দোতলার একটি অবজারভেশন রুমে (বিশেষভাবে তৈরি কক্ষ) নিয়ে যান।

এজাহারে আরো বলা হয়, ‘আসামিরা আমার ছেলেকে চিকিৎসা করার অজুহাতে অবজারভেশন রুমে মারতে মারতে নিয়ে যান। তাকে ওই রুমের ফ্লোরে জোরপূর্বক উপুড় করে শুইয়ে তিন থেকে চারজন হাঁটু দিয়ে পিঠের ওপর চেপে বসেন, কয়েকজন আমার ছেলেকে পিঠ মোড়া করে ওড়না দিয়ে দুই হাত বাঁধেন। কয়েকজন আসামি কনুই দিয়ে আমার ছেলের ঘাড়ের পেছনে ও মাথায় আঘাত করেন। একজন মাথার ওপরে চেপে বসেন এবং আসামিরা সবাই মিলে আমার ছেলের পিঠ, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্নস্থানে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মেরে আঘাত করেন।

এজাহারে আরো বলা হয়, এরপর দুপুর ১২টার দিকে আমার ছেলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। যা হাসপাতালে স্থাপিত সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজে দৃশ্যমান। নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার পর আসামি আরিফ মাহমুদ জয় নিচে এসে আমাদের ইশারায় উপরে যাওয়ার জন্য ডাক দেন। আমি আমার ছেলে ও মেয়েসহ অবজারভেশন রুমে গিয়ে আমার ছেলেকে ফ্লোরে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতে পাই। এরপর জরুরি ভিত্তিতে আমার ছেলেকে একটি প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট নিয়ে যাই। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা করে আমার ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন।

এজাহারে আরো বলা হয়, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার নামে অর্থ উপার্জনের একটি অনুমোদনহীন অবৈধ এবং অসৎ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। এজাহারের ১১ হতে ১৫ নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত আসামিদের ব্যবস্থাপনায়, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্ররোচনায় ১ থেকে ১০ নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত আসামিরাসহ তাদের কয়েকজন অজ্ঞাতনামা সহযোগী আসামিরা পরিকল্পিতভাবে আমার ছেলেকে চিকিৎসা দেওয়ার নামে অবজারভেশন রুমে নিয়ে শরীরের বিভিন্নস্থানে উপর্যুপরি আঘাত করে মৃত্যু ঘটায়।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

হাসপাতাল,পুলিশ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close