• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

সিনহা হত্যাকাণ্ড কি পরিকল্পিত

প্রকাশ:  ১৩ আগস্ট ২০২০, ০২:২৭
নিজস্ব প্রতিবেদক
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ফাইল ছবি

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফের শামলাপুর চেকপোস্টে ‘গাড়ী তল্লাশীকে’ কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ঘটনাটি পরিকল্পিত বলে মনে করছেন র‌্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বুধবার (১২ আগস্ট) সন্ধ্যায় বলেন, আমরা এতদিন জানতামই না যে, যেখানে গুলির ঘটনা ঘটেছে, সেটি পুলিশের চেকপোস্ট ছিল না। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, যে চেকপোস্টে সিনহাকে গুলি করা হয়, সেটি ছিল আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন)। এটি পরিচালিত হয় এপিবিএনের একজন কমান্ডিং অফিসারের নেতৃত্বে। আর ফাঁড়ি বা তদন্ত কেন্দ্রের চেকপোস্ট চলে এসপির অধীন। পুলিশ এপিবিএনের চেকপোস্টে গিয়ে যে অভিযান চালিয়েছে, সেটি ছিল অবৈধ। কারণ, নিয়ম হল- পুলিশ যদি কোথাও গিয়ে অভিযান পরিচালনা করে, তাহলে তাকে অবশ্যই ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় থাকতে হবে। এ বিষয়ে আদালতের একাধিক নির্দেশনাও আছে। কিন্তু এসব নিয়ম-নির্দেশনা অমান্য করেই সেদিন অভিযান চালানো হয়। পুলিশের যেসব সদস্য অভিযানে অংশ নেন তারা ছিলেন সিভিল ড্রেসে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, র‌্যাব মঙ্গলবার যে তিন আসামিকে (মো. আয়াছ, নুরুল আমিন ও নাজিমুদ্দিন) গ্রেপ্তার করেছে তাদের বাড়িতে গিয়ে আসামির স্বজনকে দিয়ে অপহরণের মামলা করতে বাধ্য করে টেকনাফ থানা পুলিশ। ওই তিনজন ছিলেন পুলিশের দায়ের করা মামলার সাক্ষী। সিনহা হত্যার পর পুলিশের সাক্ষী নুরুল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, হত্যকাণ্ডটি তিনি নিজের চোখে দেখেননি। ঘটনাটি তিনি শোনেনওনি। কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করেই তাকে সাক্ষী বানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে তার কোনো আলাপই হয়নি। মো. আয়াছ তখন বলেছিলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় সাক্ষী হইনি। আমি সেদিন চেকপোস্টেই যাইনি।’

সোমবার বিকালে এই দুই সাক্ষীসহ অপর সাক্ষী নাজিমুদ্দিনের বাসায় গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব। পরদিন মঙ্গলবার সিনহা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এর আগেরদিন সোমবার মধ্যরাতে ওই তিনজনের বাড়িতে গিয়ে তাণ্ডব চালায় টেকনাফ থানা পুলিশ।

নিজামুদ্দিনের স্ত্রী শাহেদা বেগম বলেন, রাত আড়াইটার দিকে পুলিশ দরজা ভেঙে আমার ঘরে ঢোকে। আমাকে পুলিশ জানায়, আপনার স্বামীকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপনাকে আমাদের সঙ্গে থানায় গিয়ে স্যারদের কাছে ঘটনাটি বলতে হবে। তখন পুলিশকে বলে দিই, আমি থানায় যাব না। এরপর আমার কাছ থেকে সাদা কাগজে একটি সই নেয়া হয়।

আয়াছের ভাই মোবারক বলেন, রাত তিনটার পর পুলিশ আমাদের বাড়িতে এসে দরজায় সজোরে ধাক্কা দিতে থাকে। দরজা খোলার পর পুলিশ আমার ভাবিকে বলে, তোমার স্বামী আয়াছকে অপহরণ করা হয়েছে। চলো, তোমাকে থানায় যেতে হবে। স্বামীকে ফেরত পেতে চাইলে থানায় মামলা করতে হবে। তখন ভাবি বলেন, আমি এখন থানায় যাব না। সকালে যাব। এরপর ভাবির কাছ থেকে সাদা কাগজে সই নিয়ে পুলিশ চলে যায়।

পরে ভোররাতে নুরুল আমিনের মা খালেদা বেগমকে টেকনাফ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। খালেদা বলেন, থানায় নিয়ে পুলিশ আমাকে বলে, তোর ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। তুই যদি তোর ছেলেকে ফেরত চাস, তাহলে সাদা কাগজে সই দে। না-হলে তোর ছেলের মরা মুখ দেখবি। আমি স্বাক্ষর দিতে পারি না জানালে পুলিশ বলে, টিপসই দিয়ে যা। পরে দুটি টিপসই নিয়ে আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয় পুলিশ।

এদিকে ওই টিপসইয়ে একটি অপহরণ মামলা নেয় পুলিশ। পরে মঙ্গলবার এ বিষয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করতে ওই মামলায় ভিকটিম হিসেবে তিন আসামির (আয়াছ, নুরুল এবং নাজিমুদ্দিন) বক্তব্য রেকর্ড করার আবেদন জানায় পুলিশ। কিন্তু তারা সিনহা হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ায় পুলিশের আবেদন খারিজ করে দেন আদালত।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপহরণ মামলা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। র‌্যাব এবং পুলিশ-এই দুই সংস্থার কার্যক্রম একই ধরনের। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কাউকে হেফাজতে নিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে নেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু ওই তিন আসামি গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা যেতে-না-যেতেই পুলিশ কেন অতি উৎসাহী হয়ে মামলা করল? কেন আসামিদের অপহৃত উল্লেখ করে তাদের দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় বক্তব্য রেকর্ড করতে চাইল? শুধু তাই নয়, তারা ওই তিনজনের স্বজন দিয়ে থানায় জিডিও করিয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা আশিক বিল্লাহ বুধবার জানান, তিন আসামিকে আজ থেকে র‌্যাব হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে। তারা হলেন: পুলিশের দায়ের করা মামলার সাক্ষী মো. আয়াছ, নুরুল আমিন এবং নাজিমুদ্দিন। বুধবার এদের প্রত্যেকেরই সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন কক্সবাজারের আদালত। এদিন কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুন এবং এএসআই লিটন মিয়ারও ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

অপরদিকে টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক ইনচার্জ লিয়াকত আলী এবং এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতের ৭ দিনের রিমান্ড আরো অগেই মঞ্জুর করেছেন আদালত।

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের বাহারছড়া চেকপোস্টে তল্লাশির সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এরপর ৩ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ঘটনার তদন্তে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে সিফাত, শিপ্রাসহ অন্য সাক্ষী এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ ছাড়া এই ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের সাক্ষ্যও নিয়েছে কমিটি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ঘটনার আগে পুলিশের পরিদর্শক লিয়াকতের সঙ্গে তিন সাক্ষীর ফোনালাপের কল রেকর্ড পাওয়া গেছে। তাদের একজনের সঙ্গে ১০ থেকে ১২ বার কথা বলেছেন লিয়াকত। কে ও কী কারণে এতবার কথা হয়েছে, তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে বুধবার রাতে তদন্ত কমিটির সদস্য ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাং. শাজাহান আলি জানিয়েছেন, আগামী ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এলাকায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) কার্যালয়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা নিহত হওয়ার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিবর্গদের গণশুনানীর আয়োজন করেছে।

তিনি বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিবর্গকে নির্ধারিত সময় ও তারিখে উপস্থিত হয়ে গণশুনানীতে অংশগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে।”

এছাড়া গণশুনানী আয়োজনের বিষয়ে প্রস্তুতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান মোহাং. শাজাহান আলি।

পূবপশ্চিমবিডি/জেডআই

সিনহা হত্যা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close