• বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৮ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

কারাগারে ফেসবুক চালাচ্ছেন সেই এসআই লিয়াকত!

প্রকাশ:  ১২ আগস্ট ২০২০, ০৪:৩৯
নিজস্ব প্রতিবেদক
ফাইল ছবি

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি টেকনাফ থানার পরিদর্শক লিয়াকত আলী বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তার ফেসবুক আইডি ‘অ্যাকটিভ’ দেখাচ্ছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাতেও ফেসবুক মেসেঞ্জারে তার আইডি অনলাইনে পাওয়া যায়। এমনকি গত ৬ আগস্ট আদালত থেকে কারাগারে যাওয়ার দিনও তার আইডির ‘প্রোফাইল পিকচার’ পরিবর্তন করা হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত, ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ৬ আগস্ট বরখাস্ত ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতসহ ৭ আসামি কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। মামলার শুনানিতে র‌্যাবের পক্ষে প্রত্যেক আসামির ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়।

আদালত ইন্সপেক্টর লিয়াকত, ওসি প্রদীপ এবং এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতের ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বাকি ৪ জনকে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন। বাকি দুই আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। ৪ জনকে কারাফটকে দুদিন করে জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করে র‌্যাব। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলী ঘটনার বিষয়ে একে অন্যকে মদ্যপ বলে পরস্পরকে দোষারোপ করছেন।

লিয়াকত দাবি করেছেন, বাহাড়ছড়ার দিক থেকে সিনহার যে গাড়িটি আসছিল ওই গাড়িটি আটকানোর জন্য ওসি প্রদীপই তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। শুধু গাড়ি আটকানোর নিদের্শ দেননি সঙ্গে এও বলেছিলেন যে, মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হয়েছে, পাহাড়ে ডাকাত দলের সদস্যরা মিটিং করছে। তারা বাহারছড়ার দিকে আসছে। যে গাড়িটি আসছে ওই গাড়িতে ডাকাত দলের সদস্যরা আছে। সতর্কভাবে গাড়িটি আটকাতে। যাতে তারা ক্রস করতে না পারে। এজন্য সড়কে কোনো রকমের ফাঁক না রেখে আড়াআড়িভাবে অবরোধ বসিয়েছিলেন লিয়াকত।

লিয়াকত এও দাবি করেছেন, ওসি প্রদীপ যখন তার সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন।

গাড়িটি আসার পর পরই লিয়াকত সিনহাকে গুলি করে। গুলির পরেও সিনহা অনেকক্ষণ বেঁচে ছিলেন। তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো না প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের এমন প্রশ্নে তারা কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।

ঘটনার পরের দিন সকালে প্রদীপ মোবাইল ফোনে যে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন তা জেলার একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার পরামর্শক্রমে করেছিলেন বলে প্রদীপ দাবি করেছেন।

র‌্যাব জানিয়েছে, ইতিমধ্যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা সরজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা আশেপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে যেসব তথ্য পেয়েছেন তা চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। সেইগুলো মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। সব প্রক্রিয়া শেষ করার পর এবং সরজমিনের সব তথ্য যাচাই-বাছাই করার পর আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে। এতে আসামিরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও তখন সরজমিনের তথ্যগুলো তাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে র‌্যাব জানিয়েছে।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রদীপ-লিয়াকতসহ ৭ জন পুলিশসকে আদালত রিমান্ডের আদেশ দিয়েছেন। র‌্যাব তাদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেছেন, আসামিদের রিমান্ডে এখনো আনা হয়নি। রিমান্ডে আনার আগে কিছু হোম ওয়ার্ক আছে সেগুলো করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই রিমান্ডে আনা হবে।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলায় মঙ্গলবার সকালে আরো ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দুপুরে জানিয়েছে র‌্যাব। জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত তিনজন মারিশবুনিয়ার নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দীন ও মোহাম্মদ আইয়াস পুলিশের দায়ের করা মামলার সাক্ষী।

প্রসঙ্গত, দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সিনহা মো. রাশেদ খান ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য গত প্রায় একমাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। আরো তিন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি উঠেছিলেন নীলিমা রিসোর্টে। গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।

ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। এই ঘটনায় পুলিশ মামলাও করে। তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে বুধবার কক্সবাজারের আদালতে মোট ৯ পুলিশকে আসামি করে মামলা করেন তার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। আদালতের নির্দেশে বুধবার রাতেই মামলাটি টেকনাফ থানায় নথিভুক্ত হয়। এই হত্যা মামলায় বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে ১ নম্বর এবং টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন- এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এএসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা।

মামলার পর ওইদিন বিকালে টেকনাফ থানা থেকে ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে প্রত্যাহার করা হয়। পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ২০ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয় দুদিন আগেই। এ মামলায় বৃহস্পতিবার টেকনাফ থানা থেকে প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, শামলাপুর তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতসহ ৭ আসামির প্রত্যেককে র‌্যাব হেফাজতে সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক ২ আসামি এএসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফাকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

এজাহারে সিনহার বোন অভিযোগ করেন, ওসি প্রদীপের ফোনে পাওয়া নির্দেশে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলী গুলি করেছিলেন সিনহাকে। এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং ৩৪ ধারায় পরস্পর ‘সাধারণ অভিপ্রায়ে’ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০২ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে (২১) মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে। ঘটনার দিনই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় তাকেও আসামি করা হয়।

সিনহা নিহতের ঘটনায় জড়িত সব পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সমিতি রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)। একই দিন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে গিয়ে সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, এই ঘটনায় যে এই ঘটনায় দায়ী হিসেবে যে বা যারা চিহ্নিত হবে, তারাই শাস্তি পাবে। এর দায় বাহিনীর উপর পড়বে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মঙ্গলবার সিনহার মা নাসিমা আখতারকে ফোন করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

সিনহা হত্যা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close