• শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন

জুলাইয়ে ২৯৩ দুর্ঘটনায় ৩৫৬ জন নিহত

প্রকাশ:  ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৬:৩৬
নিজস্ব প্রতিবেদক
ফাইল ছবি

গত জুলাই মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৯৩টি। নিহত ৩৫৬ জন এবং আহত ৩৪১ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৬৪, শিশু ৩৫। এককভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। ১০৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯৮ জন, যা মোট নিহতের ২৭.৫২ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৬.৫১ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৮৪ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৩.৫৯ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, অর্থাৎ ১৪.৮৮ শতাংশ।

এই সময়ে ১৬টি নৌ-দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত ও ২১জন নিখোঁজ হয়েছেন। ৪টি রেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

দুর্ঘটনায় ট্রাক যাত্রী ১৮, বাস যাত্রী ১৪, পিকআপ যাত্রী ৯, কাভার্ডভ্যান যাত্রী ৪, মাইক্রোবাস যাত্রী ৫, প্রাইভেটকার যাত্রী ২৩, এ্যাম্বুলেন্স যাত্রী ৩, ট্রলি যাত্রী ৬, লরি যাত্রী ২, সিএনজি যাত্রী ২২, ইজিবাইক-অটোরিকশা যাত্রী ২০, নসিমন-করিমন যাত্রী ১৩, ভটভটি-আলমসাধু-মাহিন্দ্র যাত্রী ৯, রিকশা ও রিকশাভ্যান যাত্রী ১১, লেগুনা যাত্রী ৭, টমটম যাত্রী ১, পাওয়ারটিলার ২ এবং বাই-সাইকেল আরোহী ৫ জন নিহত হয়েছেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে শিক্ষক ৭জন, চিকিৎসক (ঢাকা মেডিকেল) ১জন, সেনা সদস্য ১জন, পুলিশ সদস্য ৪জন, রেলওয়ে পুলিশ ১জন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ১জন, স্বাস্থ্যকর্মী ২জন, সাংবাদিক ৩জন, এনজিও কর্মকর্তা/কর্মী ৭জন, ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার ১জন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ৬জন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষী ১জন, সরকারি চাকরিজীবী ৮জন, স্থানীয় ব্যবসায়ী ২১ জন, পোশাক শ্রমিক ১৩ জন, পাটকল শ্রমিক ১জন, চা শ্রমিক ১জন, প্রবাসী শ্রমিক ২জন এবং শিক্ষার্থী ৩৯জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১১৬টি (৩৯.৫৯%) জাতীয় মহাসড়কে, ৯৮টি (৩৩.৪৪%) আঞ্চলিক সড়কে, ৪৮টি (১৬.৩৮%) গ্রামীণ সড়কে এবং ৩১টি (১০.৫৮%)শহরের সড়কে সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনাসমূহের ৭২টি (২৪.৫৭%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৭৮টি (২৬.৬২%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৮৬টি (২৯.৩৫%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা, ৪৩টি (১৬.৬৭%) যানবাহনের পেছনে আঘাত এবং ১৪টি (৪.৭৭%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়ী- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ ২৬.৯৩ শতাংশ, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি ৩ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-এ্যাম্বুলেন্স-জীপ ৬.৭৩ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ১৩.২১ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৬.৬৮ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-লেগুনা) ৮.৭২ শতাংশ, নসিমন-করিমন-ভটভটি-আলমসাধু-মাহিন্দ্র ৭.৭৩ শতাংশ, রিকশা-বাইসাইকেল ৪.৪৮ শতাংশ এবং অন্যান্য (টমটম-পাওয়ারটিলার, ভ্যামপার বাস, ষোল চাকার লং ভেহিক্যাল, কন্টেইইনার ট্রাক) ২.৪৯ শতাংশ।

দুর্ঘটনায় আক্রান্ত যানবাহনের সংখ্যা ৪০১টি। (ট্রাক ৭৮, বাস ৫৩, কাভার্ডভ্যান ১১, পিকআপ ১৯, লরি ৩, ট্রলি ৫, ট্রাক্টর ৪, মাইক্রোবাস ৭, প্রাইভেটকার ১৭, এ্যাম্বুলেন্স ৩, র‌্যাবের জীপ ১, কন্টেইনার ট্রাক ১, ষোল চাকার লং ভেহিক্যাল ১, ভ্যামপার বাস ১, হ্যালো বাইক ২, পাওয়ারটিলার ৩, মোটরসাইকেল ১০৭, বাই-সাইকেল ৫, নসিমন-করিমন-ভ্যানগাড়ি ১৬, ভটভটি-আলমসাধু-মাহিন্দ্র ১৫, ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-লেগুনা ৩৫, টমটম ১ এবং রিকশা ১৩টি।

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাসমূহ ঘটেছে ভোরে ৯.২১%, সকালে ৩০.৩৭%, দুপুরে ১৮.৪৩%, বিকালে ১৫.৬৯%, সন্ধ্যায় ৯.৮৯% এবং রাতে ১৬.৩৮%।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে ২৩.৮৯%, রাজশাহী বিভাগে ১৫%, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৪.৬৭%, খুলনা বিভাগে ৯.৫৫%, বরিশাল বিভাগে ৮.৮৭%, সিলেট বিভাগে ৮.৫৩%, রংপুর বিভাগে ৯.২১% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১০.২৩% দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ৭০টি দুর্ঘটনায় ৭৬জন নিহত। কম খুলনা বিভাগে। ২৮টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৭ জন। একক জেলা হিসেবে ময়মনসিংহে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১৬টি দুর্ঘটনায় ১৯জন নিহত। সবচেয়ে কম মৌলভীবাজরে। ২টি দুর্ঘটনায় ১জন নিহত।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে:

১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন;

২. বেপরোয়া গতি;

৩. চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা;

৪. বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা;

৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল;

৬. তরুণ ও যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো;

৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা;

৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা;

৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি;

১০ গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সুপারিশ:

১. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে;

২. চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করতে হবে;

৩. বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে;

৪. পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে;

৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্বরাস্তা তৈরি করতে হবে;

৬. পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে;

৭. গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে;

৮. রেল ও নৌ-পথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের উপর চাপ কমাতে হবে;

৯. টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

১০.“সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮” এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবেদনের মন্তব্যে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, গত জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উভয়ই সামান্য কমেছে। জুন মাসে ২৯৭টি দুর্ঘটনায় ৩৬১জন নিহত হয়েছিলেন। এই হিসাবে জুলাই মাসে দুর্ঘটনা ১.৩৬% এবং প্রাণহানি ১.৪০% কমেছে। দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ২৬৮ জন, অর্থাৎ ৭৫.২৮%। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি যে সামান্য পরিমাণ কমেছে- তা পরিস্থিতির উন্নতির ক্ষেত্রে কোনো টেকসই লক্ষণ নির্দেশ করছে না। আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কের তুলনায় জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয় মহাসড়কে পণ্যবাহী যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং মোটরসাইকেল ও স্বল্পগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল এ জন্য দায়ী। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মূলত সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার ক্ষেত্রে নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো এবং গণপরিবহন খাতের সুশাসন- উভয়ই জরুরি। এক্ষেত্রে প্রয়োজন “সড়ক পরিবহন আইন” আপোসহীনভাবে বাস্তবায়নে সরকারের দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন,সড়ক দুর্ঘটনা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close