• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

শাহেদ এখন কোথায়?

প্রকাশ:  ১১ জুলাই ২০২০, ১৬:৫২ | আপডেট : ১১ জুলাই ২০২০, ১৭:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক
মো. শাহেদ ওরফে শাহেদ করিম

রিজেন্ট হাসপাতালে র‍্যাবের অভিযানের চারদিন পরেও মো. শাহেদ ওরফে শাহেদ করিমকে গ্রেপ্তার হননি। প্রশ্ন উঠছে, তিনি কোথাও ছাড় পাচ্ছেন কি না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের শুক্রবার (১০ জুলাই) বলেছেন, ‌‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে খুঁজে বের করবে। তবে তারও উচিত আত্মসমর্পণ করা। শাহেদকে ধরতে র‌্যাব-পুলিশ খুঁজছে। আশা করি, শিগগিরই তা জানাতে পারবো।’

বৃহস্পতিবার গুঞ্জন ছিল মো. শাহেদ সাতক্ষীরার হঠাৎগঞ্জ দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই গুঞ্জন কতটুকু সত্য, তা শুক্রবার পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চিত করতে পারেনি।

পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, বাবা সিরাজুল করিমের মৃত্যুর পরও শাহেদ পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সিরাজুল করিম মারা যান।

শাহেদের স্ত্রী সাদিয়া আরাবি রিম্মি সাংবাদিকদের বলেন, শ্বশুর সিরাজুল করিমের মৃত্যুর পর তাকে হাসপাতাল থেকে সরাসরি মোহাম্মদপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। মোহাম্মদপুরে সিরাজুল তার ভাইদের সঙ্গে একটি বহুতল ভবনে থাকতেন। ছেলের বনানীর বাসায় তিনি কখনই ছিলেন না। শাহেদ তার শ্বশুরের একমাত্র ছেলে। শ্বশুর মারা যাওয়ার খবর শাহেদ পেয়েছেন কি না, তিনি বলতে পারেননি।

টেলিভিশন টক শোতে জোর গলায় মো. শাহেদ বলেছেন, ‌‌‌কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। রাজনৈতিক তকমা গায়ে দিয়ে কেউ রেহাই পাবে না। তার এই ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। এ যেন রীতিমতো প্রতারণার শিল্পী। নিজের পত্রিকায় কলাম লিখেও ধরা দিতেন একইরূপে। হাসপাতালের মালিক হিসেবে তিনি আবার মানবহিতৈষী। মানবকল্যাণে কী কী করছেন তার ফিরিস্তি দিতেন। তার একাধিক নাম, পরিচয়। ক্ষমতা আর প্রশাসনের কেন্দ্রের অনেকের সঙ্গেই হাস্যোজ্জ্বল ছবি। অন্তরঙ্গতার কোনো ঘাটতি নেই। রিজেন্ট কেলেঙ্কারিতে এখন তিনি টক অব দ্য কান্ট্রি। অথচ তার এই প্রতারক পরিচয় চিহ্নিত হয়েছিল আগেই। ২০১৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নথিতে তাকে ভয়ঙ্কর প্রতারক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছিল। তারপরও মোহাম্মদ শাহেদ ওরফে শাহেদ করিম থেকে গেছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই। চালিয়ে গেছেন অপকর্ম। এখন তার চরিত্রের নানা দিক একে একে সামনে আসছে। প্রশ্ন হচ্ছে এতোদিন কীভাবে পার পেলেন এই প্রতারণার রাজা। কারা তাকে রক্ষা করেছেন।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে পুলিশ প্রধান বরাবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ এর পাঠানো এক চিঠিতে শাহেদের অপকর্মের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, মোহাম্মদ শাহেদ বিভিন্ন সময়ে নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ও সেনাবাহিনীর ১৪তম বিএমএ লং কোর্সের অফিসার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছেন। পাশাপাশি তিনি ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এডিসি ছিলেন বলেও নিজের পরিচয় দিতেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই নথিতে শাহেদকে ভয়ঙ্কর প্রতারক প্রকৃতির লোক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়।

সরকারি নথি অনুযায়ী ভয়ঙ্কর এই প্রতারক এগিয়ে গেছেন তরতর করে। তার মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গেই কোভিড চিকিৎসায় চুক্তিবদ্ধ হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২১শে মার্চ এই চুক্তি হয়। অথচ এই হাসপাতালের অনুমোদনের মেয়াদ ২০১৪ সালেই শেষ হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়টি অবগত ছিল বলেই গণমাধ্যমে প্রকাশ। প্রশ্ন উঠেছে, জেনে-বুঝেও কেন এই চুক্তি করা হয়েছিল। ওই হাসপাতালে করোনা টেস্টের ভুয়া রেজাল্টের কারণে যারা ভুক্তভোগী তাদের দায় এখন কে নেবে? স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কি এ দায় এড়াতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে শাহেদের ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রশ্ন উঠেছে কীভাবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছাকাছি গেলেন। শাহেদ কি একাই খলনায়ক। নাকি এক্ষেত্রে আরো অনেকে জড়িত? শাহেদের সঙ্গে প্রভাবশালী নেতা এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সখ্যতার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গেও তার ছবি দেখা যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়।

প্রতারণাকে রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন শাহেদ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল কিনে চেক দিতেন তিনি। কিন্তু এক্ষেত্রেও নিতেন প্রতারণার আশ্রয়। প্রায়শই তার দেয়া চেক বাউন্স হতো। ২০০৯ সালের ঘটনা। ওই সময়ে ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস থেকে ১৯ লাখ টাকার মালামাল কিনে এমন প্রতারণা করেন তিনি। পরে একই বছর কাফরুল ও উত্তরা থানায় দু’টি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। এ সময় তাকে গ্রেপ্তারও করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শাহেদের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায়। মা সাফিয়া করিম ছিলেন স্থানীয় মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী। স্থানীয়ভাবে মায়ের নাম ভাঙিয়ে শুরু হয় তার প্রতারণা। নিজের জেলায় তার করিম সুপার মার্কেট নামের একটি বিপনি বিতান ছিল। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আসে শাহেদ।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ২০০৯ সালে প্রতারণা মামলায় গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিলেন তিনি। পরে ২০১১ সালে ধানমন্ডিতে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে এমএলএম ব্যবসা শুরু করেন। তখন গ্রাহকদের কয়েক কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যান ভারতে। একপর্যায়ে দেশে ফিরেন। এর পর থেকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সরকারদলীয় নেতাকর্মী, মন্ত্রী, এমপি প্রশাসনের উপরস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তোলে ও তাদের সঙ্গে খাতির রেখে দেদারসে প্রতারণা করে যাচ্ছিলেন এই শাহেদ। একে একে গড়ে তোলেন রিজেন্ট হসপিটাল লিমিটেড (মিরপুর), রিজেন্ট হসপিটাল লিমিটেড (উত্তরা), ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজ, রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, হোটেল মিলিনা।

অভিযোগ রয়েছে, আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটি রয়েছে তার। যদিও এর একটিরও কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। আর অনুমোদনহীন আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটির ১২টি শাখা করে হাজার হাজার সদস্যদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও শাহেদ উত্তরাস্থ ৪, ৭ ও ১৩ নম্বর সেক্টরে ভুয়া শিপিংয়ের ব্যবসা করেছেন। সেই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফেসবুকে নিজের পরিচয় দিয়েছেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির সদস্য; ন্যাশনাল প্যারা অলিম্পিক এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট; রিজেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, রিজেন্ট কেসিএস লিমিটেড, কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটি, রিজেন্ট হসপিটাল লিমিটেড ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান। সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্চ নামে একটি প্রতিষ্ঠানেরও চেয়ারম্যান তিনি।

শাহেদের প্রতারণার শিকার জুলফিকার আলী ভুট্টো নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, শাহেদ করিমের মালিকানাধীন রিজেন্ট কেসিএস পূর্বাচল প্রজেক্টে বালু সরবরাহের কাজ পেয়েছিল তার প্রতিষ্ঠান রুসাফা কনস্ট্রাকশন। সিলেট থেকে বালু সরবরাহের পর শাহেদ করিম তার পাওনা ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৯ টাকা দেননি। উল্টো একদিন অফিসে ডেকে নিয়ে সন্ত্রাসীদের দিয়ে পেটানো হয়। তারপর ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে সই নিয়ে মেরে গুম করে ফেলার হুমকি দেন। গত বছরের ৩১শে অক্টোবর এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ভুট্টো।

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা রয়েছে দেশের বিভিন্ন থানায়। এর মধ্যে ধানমন্ডি, মিরপুর, উত্তরায় বেশি। সেগুলোর কয়েকটি মামলার নম্বর বাড্ডা-৩৭(৭)০৯, আদাবর-১৪(৭)০৯, লালবাগ-৪৭(৫)০৯, উত্তরা২০(৭)০৯, উত্তরা ১৬(৭)০৯, উত্তরা ৫৬(৫)০৯, উত্তরা ১৫(৭)০৯, ৩০(৭)০৯, ২৫(৯)০৯, ৪৯(০৯)০৯, ১০(৮)০৯। সব মামলা ৪২০ ধারায়।

বিভিন্ন টকশোতে শাহেদের দেয়া বক্তব্যও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। এসব টকশোতে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে দেখা যায় তাকে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য রাখতেন তিনি। শাহেদ ‘দৈনিক নতুন কাগজ’ নামের একটি পত্রিকারও মালিক। আন্ডারগ্রাউন্ড ওই পত্রিকার তিনিই সম্পাদক ও প্রকাশক। সাংবাদিক পরিচয়ে সচিবালয়ে প্রবেশের কার্ডও রয়েছে তার। একই সঙ্গে উত্তরা মিডিয়া ক্লাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেও তিনি পরিচয় দিতেন। যদিও তিনি কখনো সাংবাদিকতা করেছেন- এমন কোনো তথ্য জানা যায়নি। এই ধরনের ব্যক্তি কীভাবে টকশো আলোচনায় অংশ নেয়ার সুযোগ পেতেন তা নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে। শুরুর দিকে টকশোতে সুযোগ পেতে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি দ্বারা তিনি তদবির করাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাংবাদিকদেরই অনেকে আরো কিছু প্রশ্ন তুলেছেন।

বাংলা টিভি’র সাবেক ডেপুটি নিউজ এডিটর মনজুরল আলম পান্না তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, খুব ভালো করে জেনেশুনেও যেসব কথিত সাংবাদিক রিজেন্টের শাহেদের মত প্রতারকদের বিভিন্ন উপঢৌকনের বিনিময়ে টকশো’তে ডেকে জাতিকে নসিহত করিয়েছে, ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়েছে এবং প্রকারান্তরে তার দুর্নীতির পথকে প্রশস্ত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কি কোন অভিযান হবে?

এদিকে করোনা পরীক্ষা না করেই সার্টিফিকেট দেওয়াসহ নানা অভিযোগে গ্রেপ্তার শাহেদের অন্যতম সহযোগী তরিকুল ওরফে তারেক শিবলীকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। শুক্রবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মুরশেদ আল-মামুন ভুঁইয়া এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশ ৭ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল।

এর আগে ৮ জুলাই একই মামলায় গ্রেপ্তার আরও সাত আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকার সিএমএম আদালত। আসামিরা এখন পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন।

রিমান্ডে থাকা ওই সাত আসামি হলেন রিজেন্ট গ্রুপের বেতনভুক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা হলেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসান হাবীব, হেলথ টেকনিশিয়ান আহসান হাবীব হাসান, হেলথ টেকনোলজিস্ট হাতিম আলী, রিজেন্ট গ্রুপের প্রকল্প প্রশাসক রাকিবুল ইসলাম, রিজেন্ট গ্রুপের মানবসম্পদ কর্মকর্তা অমিত বণিক, রিজেন্ট গ্রুপের গাড়িচালক আবদুস সালাম ও নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রশীদ খান।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

করোনাভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close