• বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

‘জানেন আমি কে? এভাবে উঁচু গলায় কখনও কথা বলবেন না’

প্রকাশ:  ১০ জুলাই ২০২০, ২২:৫৭ | আপডেট : ১১ জুলাই ২০২০, ০০:১৮
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসার নিচতলায় স্ত্রী সাদিয়া আরাবি রিম্মি ও দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রতারক মোহাম্মদ শাহেদ। ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৯০ হাজার টাকা। সেই বাসাটির মালিক একজন প্রবাসী চিকিৎসক। বাড়িটির ভাড়া তোলাসহ বাসার সার্বিক বিষয় দেখভাল করেন বাড়ির মালিকের বোন লিনিয়া দেওয়ান।

লিনিয়া বলেন, দুই বছর আগে বাসা ভাড়া নিতে আসে শাহেদ। তার সঙ্গে অনেক অস্ত্রধারী দেহরক্ষী ছিল। এ অবস্থা দেখে তাকে বাসা ভাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যাতে তাকে ভাড়া দেওয়া না লাগে তাই তার কাছে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া চান লিনিয়া। এরপর শাহেদ যা করেছেন তাতে বিস্মিত হন লিনিয়া।

শাহেদ লিনিয়াকে বলতে থাকেন- ‘জানেন আমি কে? এভাবে উঁচু গলায় কখনও কথা বলবেন না।’ এরপর একজনকে হাতে ইশারা করেন তিনি। ইশারার পর একটি ব্রিফকেস বাসায় নিয়ে ঢোকেন ওই ব্যক্তি। ব্রিফকেস খুলেই তিন মাসের ভাড়ার টাকা অগ্রিম দেন শাহেদ। ওই ব্রিফকেসে আরও অনেক টাকা ছিল। এমন দৃশ্য দেখে লিনিয়া ভাবেন, এসব টাকা নকল। তখন তিনি শাহেদকে বলেন, বাসার ম্যানেজার ব্যাংকে গিয়ে নিশ্চিত হবে টাকা আসল কিনা। সে অনুযায়ী ব্যাংকে গিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় টাকা সত্যি আসল। এভাবেই দু'বছর আগে বাসা ভাড়া নেন শাহেদ।

তিনি আরো বলেন, ভাড়াটিয়া হিসেবে এরপর আর তার সঙ্গে খুব একটা কথা হতো না। সেও ঝামেলা করেনি। বাড়ির আশপাশের কারো সঙ্গে খুব একটা মিশতো না শাহেদ। ডিওএইচএসের কোনো অনুষ্ঠানে যেত না। আশপাশের কেউ তার প্রতারণা সম্পর্কে কিছু জানতেন না। খবরের কাগজ আর টিভিতে দেখে বাড়ির ভাড়াটিয়ার এত গুণ সম্পর্কে জানতে পারেন লিনিয়া।

তিনি এও জানান, প্রথমে তার সঙ্গে এক বছরের চুক্তি ছিল। পরে সন্তান ছোট জানিয়ে ভাড়ার মেয়াদ আরো ৬ মাস বাড়িয়ে নেন। এরপর কয়েকবার তাকে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হলেও আমলে নিত না শাহেদ।

শাহেদ সম্পর্কে একটি অদ্ভুত ঘটনা জানালেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। বছর পাঁচেক আগে শাহেদ ধানমন্ডির ২৭ নম্বর এলাকায় একটি গাড়ি থেকে নামেন। রাস্তার মধ্যে গাড়ি পার্কিং করে ফল কিনছিলেন। রাস্তায় গাড়ি দেখে ট্রাফিক সার্জেন্ট দৌঁড়ে গিয়ে তা সরাতে বলেন। এটা বলার পরপরই অশ্রাব্য ভাষায় ট্রাফিক পুলিশের সদস্যকে গালমন্দ করেন তিনি। পাশের সিভিল ড্রেসে ফল কিনছিলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি দেখেন গালমন্দ শুনেও ট্রাফিকের ওই সদস্য সরে পড়েন। পরে ওই কর্মকর্তা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে ডেকে এনে প্রতিবাদ করতে বলেন। পরে ওই পুলিশ সদস্য শাহেদকে গালমন্দ করার কারণ জিজ্ঞেস করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি পুলিশ সদস্যদের গায়ে হাত তোলেন। এর প্রতিবাদে পুলিশ সদস্যরা তাকে বেদম প্রহার করে। পরে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা শাহেদের পক্ষ নিয়ে ওই পুলিশ সদস্যদের শাসিয়েছেন। কেউ কেউ চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকিও দেন।

পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দপ্তরে সাহেদের অবাধ যাতায়াত দেখে কেউ কেউ তাকে ম্যানেজ করেই পদোন্নতি ও পদায়নের চেষ্টা করতেন। সাহেদের অল্প সময়ে টাকা আয়ের একটি অন্যতম পথ ছিল তদবির বাণিজ্য।

পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে মানি লন্ডারিং মামলার এক আসামিকে বাঁচাতে তদবির করেছিলেন শাহেদ। তবে তার সেই তদবির রক্ষা করা হয়নি। পরে তাকে একজন বড় কর্মকর্তার রুমে যাতায়াত করতে দেখেন তিনি। এরপর তদবির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা পুলিশ কর্মকর্তা কিছুটা ভয় পান। তার শঙ্কা ছিল, শাহেদ ওই কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে তার কোনো ক্ষতি করতে পারেন।

মোহাম্মদ শাহেদ কোথাও শাহেদ করিম নামে পরিচিত। সাতক্ষীরা শহরের কামালনগরের বাসিন্দা। তার বাবা সিরাজুল করিমের একমাত্র ছেলে। তবে শাহেদের মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় সংসারে তার এক মেয়ে রয়েছে। ১৯৯৯ সালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে থেকে এসএসসি পাস করেন সাহেদ। এরপর থেকে ঢাকায়।

নানা সময় নানাভাবে প্রতারণার ফাঁদে শাহেদ মানুষকে ফেলেছিলেন। জেলও খেটেছেন। শুধু লোকমুখের স্বীকৃতি নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্থার তকমাভুক্ত প্রতারক সাহেদ। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নায়েব আলী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, জনৈক 'মোহাম্মদ শাহেদ' কখনও নিজেকে সেনাবাহিনীর মেজর, কখনও লে. কর্নেল আবার মাঝে মাঝে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের সাবেক ছাত্র এবং ১৪তম বিএমএ লং কোর্সের অফিসার হিসেবে পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্ম করছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন ভয়ংকর প্রকৃতির লোক। প্রতারণার দায়ে তার বিরুদ্ধে ৪২০ ধারায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় ৩১টিসহ মোট ৩২ মামলা রয়েছে। চিঠিতে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।

তবে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, বরং পুলিশ প্রশাসনসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের 'আপনজন' হয়ে ওঠেন শাহেদ। প্রতিদিন ভিআইপি মর্যাদায় বড় অফিসারদের কক্ষে বসে আড্ডা মারতেন। পরে তাদের মাধ্যমে তদবির বাণিজ্যও করতেন শাহেদ। ঢাকার বাইরে গেলে অনেক সময়ই গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশ প্রটোকল নিয়ে যাতায়াত করতেন। অনেকের চোখে তিনি ছিলেন মস্ত বড় 'প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব'। প্রভাবশালীদের সঙ্গে চলাফেরা আর ছবি তুলে তা ফেসবুকে শেয়ার করে নিজেকে ধীরে ধীরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত প্রতারক থেকে ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার শাহেদ। তিনি প্রভাবশালীদের নাকের ডগায় চলাফেরা করতেন বীরদর্পে। মাথায় ৩২ মামলা নিয়েও নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতেন বহুরূপী এই প্রতারক।

একটি ভিডিওতে দেখা যায় ২০১৭ সালে রাঙামাটির সাজেক ভ্রমণের সময় সাহেদকে বহনকারী পতাকাবাহী গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশের প্রটোকল গাড়ি। ঢাকার বাইরে গেলে যেভাবে পুলিশ ভিআইপিকে প্রটোকল দেয়, সেভাবেই তাকেও দেওয়া হয়। সাইরেন বাজিয়ে চলছিল তার গাড়ি। ওয়াকিটকিতেও কথা বলছিলেন শাহেদ। গন্তব্যে পৌঁছার পর প্রটোকলে থাকা সদস্যদের সঙ্গে ছবিও তোলেন তিনি। ডিওএইচএসের বাসার গ্যারেজে আরেকটি গাড়ি রয়েছে শাহেদের। সেই গাড়িতে ছিল ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড ও ভিআইপি প্রটোকলের লোগো।

গত ৬ জুলাই র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। পরীক্ষা ছাড়াই করোনার সনদ দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আসছিল তারা। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অন্তত ছয় হাজার ভুয়া করোনা পরীক্ষার সনদ দেওয়ার প্রমাণ পায়। একদিন পর গত ৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশে র‌্যাব রিজেন্ট হাসপাতাল ও তার মূল কার্যালয় সিলগালা করে দেয়। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ওই দিনই উত্তরা পশ্চিম থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়।

এদিকে শাহেদের বিরুদ্ধে মানুষের সঙ্গে অসংখ্য প্রতারণার অভিযোগ পাচ্ছে র‌্যাব। র‌্যাবের গণমাধ্যম ও আইন শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, শাহেদকে গ্রেপ্তারের জন্য র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

রিজেন্ট হাসপাতাল,মোহাম্মদ শাহেদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close