• সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

বুড়িগঙ্গায় ৯ কারণে লঞ্চ দুর্ঘটনা, ২০ দফা সুপারিশ

প্রকাশ:  ০৭ জুলাই ২০২০, ১৮:৫২ | আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২০, ১৮:৫৯
নিজস্ব প্রতিবেদক

বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পেছনে ৯টি কারণ চিহ্নিত করেছে নৌ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কমিটি ২০ দফা সুপারিশ করেছে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ের সভাকক্ষে এসব বিষয় সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধ‌রা হয়। এ সময় উপস্থিত ছি‌লেন নৌ-প্র‌তিমন্ত্রী খা‌লিদ মাহমুদ চৌধুরী।

সম্পর্কিত খবর

    লঞ্চ দূর্ঘটনা এড়াতে সুপারিশ মালায় ঢাকা সদরঘাটের কাছে নৌযানের বার্থিং বন্ধ করা, খেয়াঘাট সরিয়ে নেওয়া, ভয়েস ডিক্লারেশন বাধ্যতামূলক করা, নৌযানের গতি সীমা নির্ধারণ, পুরনো ধাঁচের লঞ্চ তুলে দেওয়া, লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি বন্ধ করা এবং শাস্তি বাড়িয়ে নৌ আইন যুগোপযোগী করার কথা বলা হয়েছে।

    তবে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় এমএল মর্নিং সান বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়ার ওই ঘটনা তদন্ত করে তদন্ত কমিটি কার কী দায় পেয়েছে, তা প্রকাশ করেননি নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।

    ওই প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “এক জন্য কে কে দায়ী তা এখন প্রকাশ করছি না। তবে তদন্ত কমিটি ২০টি সুপারিশ দিয়েছে।”

    গত ২৯ জুন মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে আসছিল ছোট আকারের লঞ্চ এমএল মর্নিং বার্ড। শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে ময়ূর-২ নামের আরেকটি বড় লঞ্চের ধাক্কায় সেটি ডুবে যায়। দুই দিনের তল্লাশি অভিযানে মোট ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

    ওই ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. রফিকুল ইসলাম খানকে আহ্বায়ক এবং বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা) মো. রফিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়।

    এছাড়া ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ ঘটানোর অভিযোগ এনে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করে নৌ পুলিশ।

    তদন্ত কমিটির ২০ দফা সুপারিশ-

    ১. সদরঘাট হতে ভাটিতে ৭/৮ কি.মি. এবং উজানে ৩/৪ কি.মি. অংশে অলস বার্দিং উঠিয়ে দিতে হবে। এ অংশে পন্টুন ছাড়া নোঙর করা নৌযান রাখা যাবে না। এ অংশ হতে পর্যায়ক্রমে শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড উঠিয়ে দিতে হবে।

    ২. সদরঘাট টার্মিনালের আশপাশে কোনও খেয়াঘাট রাখা যাবে না। ওয়াইজঘাটের উজানে খেয়াঘাট স্থানান্তর করা যেতে পারে।

    ৩. লঞ্চের সামনে, পিছনে, মাস্টার ব্রিজ, ইঞ্জিন রুম, ডেকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে। মাস্টারের দেখার সুবিধার জন্য ব্যাক ক্যামেরা ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও লঞ্চে পর্যায়ক্রমে ওয়াকিটকি সিস্টেম চালু করতে হবে।

    ৪. লঞ্চ/জাহাজ ঘাট ত্যাগ করার পূর্বেই ঘাটে ডিক্লারেশন দাখিল বাধ্যতামূলক করতে হবে। লঞ্চে কতজন যাত্রী বহন করা হচ্ছে, ডেক সাইডে এবং ইঞ্জিনে কারা কারা কর্মরত আছেন তা ডিক্লারেশনে উল্লেখ থাকতে হবে।

    ৫. ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধ করতে হবে। প্রত্যেক লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট ও বয়া রাখতে হবে।

    ৬. সকল নদীপথে বিভিন্ন নৌযানের স্পিড লিমিট নির্ধারণ করে দিতে হবে। সদরঘাটে স্পিড কন্ট্রোল করার জন্য টাওয়ার স্থাপন ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

    ৭. লঞ্চে মেকানিক্যাল সিটিংয়ের পরিবর্তে ইলেক্ট্রো হাইড্রোলিক সিটিং প্রবর্তন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

    ৮. যাত্রীবাহী লঞ্চে মেইন ইঞ্জিনস লোকাল কন্ট্রোল সিস্টেমের পরিবর্তে ব্রিজ কন্ট্রোল সিস্টেম পর্যায়ক্রমে চালুর কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

    ৯. সানকেন ডেক লঞ্চ পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে দিতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে এগুলোর চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে যথাযথ সনদধারী মাস্টার ও ড্রাইভার ছাড়া নৌযান পরিচালনা করা যাবে না। এক্ষেত্রে ডিসপেনসেশন সনদ গ্রহণের প্রথা বাতিল করতে হবে।

    ১০. যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক লোকদের ওঠানামার সুবিধার্থে গ্যাংওয়ে/ব্রিজ স্থাপন করতে হবে।

    ১১. সদরঘাটে পন্টুনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।

    ১২. সার্ভের মধ্যবর্তী সময়ে নৌযানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অন্যান্য বিষয় পরিদর্শন করার নিমিত্ত পরিদর্শকদের পরিদর্শন কার্যক্রম আরও জোরদার এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে।

    ১৩. উৎসবসহ সব সময়ের জন্য প্রত্যেক লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত টিকেট বিক্রি বন্ধ করতে হবে। টিকিট প্রদর্শন ছাড়া কোনও যাত্রীকে লঞ্চে উঠতে দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সুযোগ বন্ধ করার জন্য কেবিন সংখ্যা ও ডেকযাত্রীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়ে এ সকল টিকিট অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

    ১৪. নৌ আইন অমান্যকারীদের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ যুগোপযোগী করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

    ১৫. নৌ-কর্মীদের প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ করার জন্য বিআইডব্লিউটিএকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। নৌযানের ফিটনেস ও নৌ-কর্মীদের যোগ্যতা সনদ ইস্যুতে নৌপরিবহন অধিদফতরকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। সার্ভে সনদ প্রদানকারী সংস্থা নৌপরিবহন অধিদফতরের সার্ভেয়ারের সংখ্যা ও লজিস্টিক সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।

    ১৬. ডেক অ্যান্ড ইঞ্জিন পারসোনাল ট্রেনিং সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার নিবন্ধিত জাহাজ ছাড়াও আরও নিবন্ধনহীন অসংখ্য জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজে গড়ে কমপক্ষে ২ জন মাস্টার ও ২ জন ইঞ্জিনচালক নিয়োগ করতে হলে প্রায় ৫৬ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। দেশে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়ে রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাহাজে নিয়োগ করতে পারলে দুর্ঘটনা কিছুটা লাঘব হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানকে আরও দৃশ্যমান করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বৃদ্ধি করতে হবে।

    ১৭. নৌ-দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনের লক্ষ্যে দায়ী মাস্টার, ইঞ্জিন ড্রাইভারদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতারের ব্যবস্থা নিতে হবে। নৌ-দুর্ঘটনা ও নৌযান সংক্রান্ত অপরাধের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও আসামি গ্রেফতারের জন্য সদরঘাটে কর্মরত নৌ-পুলিশের জনবলের সংখ্যা ৯ জন থেকে বৃদ্ধি করে কমপক্ষে ২৫ জন করতে হবে।

    ১৮. নৌযান ও নৌ-কর্মীদের চলাচল জানার জন্য ও অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য নৌযান ও নৌ-কর্মীদের ডাটাবেজ তৈরি ও ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

    ১৯. নৌ-ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাযথ লজিস্টিক সুবিধা প্রদান করতে হবে। সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

    ২০. নৌ-দুর্ঘটনা গবেষণার বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

    পূর্বপশ্চিম-এনই

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close