• শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||
শিরোনাম

লিবিয়ায় আরও লোক পাচারের চেষ্টা চলছিল

প্রকাশ:  ০২ জুন ২০২০, ০০:২২
পূর্বপশ্চিম ডেস্ক

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার ঘটনায় পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা কামাল হোসেন ওরফে হাজী কামালকে (৫৫) গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৩। সোমবার ভোরে রাজধানীর শাহজাদপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ৩১টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। মিথ্যা প্রলোভনে তাদেরও লিবিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা চলছিল।

জানা যায়, হাজী কামাল ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে কয়েকটি দেশের বিমানবন্দর ব্যবহার করে ইউরোপে লোক পাঠাত। তার এ চক্রে রয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু দালাল। এর মধ্যে দেশের দালালদের কাজ ছিল- ইউরোপে উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ভাগিয়ে আনা। এর পর তাদের অবৈধভাবে নৌপথ এবং দুর্গম মরু পথ দিয়ে লিবিয়ায় পাচারে সহায়তা করে বিদেশি দালালরা। শুধু তাই নয়, সেখানে নিয়ে জিম্মি করে চালানো হয় বিভিন্ন নির্যাতন। পরে পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হতো লাখ লাখ টাকা। এতে করে মিথ্যা স্বপ্নের প্রলোভনে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। কেউ কেউ জীবনের তরে হারাচ্ছেন প্রিয়জন। গত ২৮ মে রাতে লিবিয়ার মিজদা শহরে নিহত ২৬ বাংলাদেশির অনেকেই হাজী কামালের মাধ্যমে ওই দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। এমন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই র‌্যাব কামালকে গ্রেপ্তার করে।

র‌্যাব জানায়, লিবিয়ায় হত্যাকা-ের পর নিহত ও আহতদের পরিবারের অভিযোগ ছিল- সবাই হাজী কামালকে মুক্তিপণের টাকা দিয়েছিলেন। তার পরও অনেকে তাদের সন্তানদের ফেরত পাননি। হাজী কামালকে গ্রেপ্তারের সময় পাওয়া ডায়েরিতেও টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানায় র‌্যাব। এ বিষয়ে দুপুরে র‌্যাব ৩-এর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে র‌্যাব ৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, ‘মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এ অপরাধের সঙ্গে কামাল সম্পৃক্ত আছে বলে নিজেই স্বীকার করেছে। সংঘবদ্ধ এ চক্রটি বিদেশি চক্রের যোগসাজশে অবৈধভাবে বাংলদেশিদের বিভিন্ন দেশে পাঠায়।’

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক বলেন, ‘হাজী কামাল পাচারকারী চক্রের অন্যতম মূলহোতা। সে এ পর্যন্ত অবৈধভাবে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশিকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছে। লিবিয়া ছাড়াও সে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবৈধ পথে অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এ ছাড়া কামাল একজন টাইলস্ কন্ট্রাক্টর। তাই অনেক টাইলস শ্রমিকের সঙ্গে তার জানাশোনা। এ সুযোগে তাদের মিথ্যা প্রলোভনে বিদেশে পাঠানোর জন্য প্রলুব্ধ করে বলেÑ তোমরা তো দেশে বসে ৫০০-৭০০ টাকা আয় করো। কিন্তু লিবিয়াতে গেলে তোমরা প্রতিদিন ৫-৬ হাজার টাকা আয় করতে পারবে। এ ছাড়া লিবিয়াতে টাইলস মিস্ত্রিদের অনেক চাহিদা। যাওয়ার আগে এক লাখ টাকা দিতে হবে, বাকি ৪ লাখ টাকা সেখানে যাওয়ার পর দিলেই হবে। এভাবেই পাতা ফাঁদে ফেলে শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাত হাজী কামাল। এর পর সেখানে অবস্থান করা অন্য পাচারকারী দলের সদস্যরা ভিকটিমদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা দাবি, এমনকি শারীরিক নির্যাতন করে। নির্যাতনের সেই ভিডিও তাদের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। এমনকি সরাসরি মোবাইল ফোনে ভিডিওকল দিয়েও নির্যাতনের দৃশ্য পরিবারকে দেখাত। যাতে প্রিয়জনকে বাঁচাতে পরিবারের সদস্যরা পাচারকারী দলের চাহিদামতো টাকা দিতে বাধ্য হন। আবার দালাল চক্র বা পাচারকারী দলের খপ্পরে পড়ে অবৈধ পথে সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে কোনো কোনো শ্রমিকের সলিল সমাধিও হয়।’

এদিকে লিবিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাসের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিজদাতে কমপক্ষে ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রাণে বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশির সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয় দূতাবাস। ওই ঘটনায় তিনি কোনোমতে প্রাণে বেঁচে বর্তমানে এক হৃদয়বান লিবিয়ানের আশ্রয়ে আত্মগোপনে আছেন। দূতাবাসকে তিনি জানান, ১৫ দিন আগে বেনগাজি থেকে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে কাজের সন্ধানে মানবপাচারকারীরা তাদের ত্রিপোলি শহরে নিচ্ছিল। পথে তিনিসহ মোট ৩৮ বাংলাদেশি মিজদাহ শহরে দুষ্কৃতকারীদের হাতে জিম্মি হন। পরে তাদের অত্যাচার ও নির্যাতনের একপর্যায়ে অপহৃতরা মূল অপহরণকারী লিবিয়ানকে হত্যা করে। এর জের ধরেই আকস্মিকভাবে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় অন্য দুষ্কৃতকারীরা। এতে আনুমানিক ২৬ বাংলাদেশি নিহত হন, যাদের লাশ মিজদাহ হাসপাতালে সংরক্ষিত রয়েছে। বাকি বাংলাদেশিরা হাতে-পায়ে, বুকে-পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিচারের অঙ্গীকার লিবিয়া সরকারের: ২৬ বাংলাদেশিকে ঘৃণ্য হত্যাকা-ের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে লিবিয়া সরকার। সেই সঙ্গে এটিকে কাপুরুষোচিত কাজ উল্লেখ করে হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনারও অঙ্গীকার করেছে। সোমবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক শোকবার্তায় এমনটিই জানানো হয়েছে। ঘটনা তদন্ত ও বিচারের বিষয়ে লিবিয়া সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোও নিহতদের পরিবার ও বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

মাদারীপুরে ৩ মামলায় গ্রেপ্তার ২: লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের পাচারে এবং হত্যার ঘটনায় মাদারীপুর সদর মডেল থানায় একটি এবং রাজৈর থানায় দুটি মামলা করেছে নিহত তিনজনের পরিবার। ওই তিন মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৪ জনকে। এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দেশটিতে খুন হওয়া ২৬ বাংলাদেশির অধিকাংশই মাদারীপুরের বাসিন্দা।

জানা গেছে, লিবিয়ায় নিহত ও মানবপাচারের শিকার মাদারীপুর সদরের দুধখালঅ গ্রামের মো. শামীম হাওলাদারের বাবা হালিম হাওলাদার বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয়েছে দালাল নজরুল মোল্লার স্ত্রী দিনা বেগমকে। তবে দালাল নজরুল মোল্লা এখন লিবিয়াতে আছে। মামলা দায়েরের দিন রবিবার রাতেই দিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান থানার ওসি মো. কামরুল ইসলাম মিয়া।

অন্যদিকে একই ঘটনায় নিহত রাজৈরের জুয়েলের বাবা রাজ্জাক হাওলাদার বাদী হয়ে দালাল জুলহাস সরদারসহ চারজনের নামে মানবপাচার আইনে মামলা করেন। এ ছাড়া রাজৈর থানার বদরপাশা ইউনিয়নের নিহত রহিম খালাসির ভাই আবু খায়ের খালাসি বাদী হয়ে আরও একটি মামলা করেছেন। এতে জুলহাস সরদারসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।

রাজৈর থানার ওসি শওকত জাহান বলেন, ‘মানবপাচারের ঘটনায় রাজৈর থানায় দুটি মামলাতেই দালাল জুলহাস আসামি। তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে সে করোনা পজিটিভ হওয়ায় পুলিশি হেফাজতে মাদারীপুর সদর হসাপাতালের আইসোলেশনে ভর্তি রয়েছে।’

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

লিবিয়া
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close