• রোববার, ০৫ জুলাই ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||
শিরোনাম

তালিকায় নাম তুলতে পরিবহন শ্রমিকদের থেকেও চাঁদাবাজি করছে নেতারা

প্রকাশ:  ০৪ মে ২০২০, ১৩:৩০
নিজস্ব প্রতিবেদক

‘ছয়দিন ধরে ঘুরছি, ত্রাণ পাচ্ছি না। মহাখালী বাস টার্মিনালে মাঝেমধ্যে খোরাকি মিলছে। আমাদের নাম কোনও তালিকায় নেই।’ এ প্রতিবেদকের কাছে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বরে বাসচালক কবীর হোসেন রাজন ও বাসচালক মশিউর রহমান।

সড়ক পরিবহন খাতের বিভিন্ন পক্ষের হিসাবে, সংগঠন পরিচালনা ব্যয় ও শ্রমিককল্যাণের নামে স্বাভাবিক সময়ে বছরে কমপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে সড়কে। সেই সঙ্গে শ্রমিক ফেডারেশনে এর ভাগ যাচ্ছে।

তথ্য পাওয়া গেছে, ফেডারেশনের জন্যই দিনে কোটি টাকা তোলা হচ্ছে শ্রমিককল্যাণের নামে। শ্রমিক নেতা ও পরিবহন মালিক নেতারা শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করলেও করোনাকালে দেশের ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক পরিবার নিয়ে অর্ধাহারে পিষ্ট হচ্ছেন।

চাঁদার টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠা পরিবহন খাতের শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগ এই সময়ে শ্রমিকদের পাশে নেই বরং দিনমজুরদের সহায়তার নামে সরকারি সহায়তায়ও তারা ভাগ বসাতে ‘তালিকা রাজনীতি’ করছেন। তালিকায় নাম তোলার কথা বলে উল্টো চালকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছেন।

এদিকে পরিবহন খাতের অভিজ্ঞরা জানান, ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের কোটি টাকার বেশি ব্যবহার হচ্ছে না। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের বিপুল অঙ্কের তহবিল পরিবহন শ্রমিকদের জন্য থেকেও ‘নেই’।

দিনমজুরদের জন্য সরকারের ঘোষিত ৭৬০ কোটি টাকার সহায়তার কতটুকু পরিবহন শ্রমিকরা পাবেন তা-ও তারা জানেন না। ৯৮ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক অনুদান বা অন্যান্য সরকারি সহায়তা পেতেও বিড়ম্বনায় আছেন নিয়োগপত্র না থাকায়। কয়েক দিন ধরে ত্রাণের দাবিতে পরিবহন শ্রমিকরা পথে পথে ঘুরছেন, বিক্ষোভ করছেন। সরকারের কাছে শ্রমিকদের সহায়তার দাবি জানিয়ে চাঁদার ভাগ পাওয়া নেতারা ‘ঘরবন্দি’ আছেন।

তবে সড়ক পরিবহন বন্ধ থাকায় দিনে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক নেতা খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ।

তিনি বলেন, আমরা পরিবহন কম্পানি থেকে খোরাকি দিচ্ছি শ্রমিকদের। এভাবে আমরা আর কত দিন দেব? সরকারের ত্রাণ ও অন্যান্য সহায়তা শ্রমিকদের রক্ষা করবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ তথ্যানুসারে, দেশে নিবন্ধিত ২০ ধরণের গাড়ি আছে ৪৪ লাখ। এর মধ্যে প্রায় আট লাখ গাড়ি বাণিজ্যিক। পরিবহন নেতাদের অভিজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধনের বাইরেও গাড়ি আছে। বাণিজ্যিক গাড়ি আছে কমপক্ষে ১০ লাখ।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ খোকন বলেন, ফেডারেশনের জন্য দিনে ১০ টাকা হারে ১০ লাখ গাড়ি থেকে চাঁদা তোলা হয়। দিনে কল্যাণ তহবিলের নামে তা তোলা হচ্ছে কমপক্ষে এক কোটি টাকা।

শ্রমিকরা জানান, প্রতিটি বেসরকারি বাণিজ্যিক গাড়ি থেকে দিনে কমপক্ষে ৭০ টাকার চাঁদা আদায় হচ্ছে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নামে। সরকারের নিবন্ধিত বাণিজ্যিক সব গাড়ির হিসাব যদি ধরা হয় তাহলে বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ঢাকা ও বড় শহরগুলোয় গেটপাসের (জিপি) নামে চাঁদা তোলা হয়। কেউ সড়কে বাস নামাতে চাইলে জেলা মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নকে চাঁদা দিতে হয়। এসব অঘোষিত চাঁদার কোনও হিসাব নেই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী অবশ্য দাবি করেন, সারা দেশে আট লাখ নয়, বড়জোর দুই লাখ বাণিজ্যিক গাড়ি চলাচল করে স্বাভাবিক সময়ে। ঢাকা থেকে সারা দেশে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচল করে পাঁচ হাজার।

ফেডারেশনের জন্য গাড়িপ্রতি ১০ টাকা করে মোট কত টাকা তোলা হয়েছে তার হিসাব অফিস খুললে তিনি দিতে পারবেন বলে জানান।

তবে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নগুলো স্থানীয়ভাবে তোলা অর্থ শ্রমিকদের চিকিৎসা ব্যয় বা অন্য জরুরি দরকারে ব্যবহার করছে বলে তিনি দাবি করেন। করোনাকালে পরিবহন শ্রমিকরা দুর্দশার মধ্যে আছেন বলে অবশ্য স্বীকার করেন তিনি।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য সরকারি কল্যাণ তহবিল ও ত্রাণ সহায়তার আওতায় পরিবহন শ্রমিকদের আনতে হবে। এ জন্য আমরা সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি। ওসমান আলীর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে হানিফ খোকন বলেন, এখন চাপে পড়ে এসব নেতা বাণিজ্যিক গাড়ির সংখ্যাও কম দেখাচ্ছেন।

ওসমান আলী বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের উত্তোলন করা অর্থ পরিবহন শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা হচ্ছে বলে দাবি করলেও লালমনিরহাট, খুলনা, রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে কল্যাণ তহবিলের অর্থ হন্যে হয়েও খুঁজে পাচ্ছেন না পরিবহন শ্রমিকরা।

গত বৃহস্পতিবার লালমনিরহাট জেলা সদর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে দুই শতাধিক পরিবহন শ্রমিক তাদের কাছ থেকে শ্রমিককল্যাণের নামে তোলা অর্থ তাদের সহায়তায় দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন, সমাবেশ ও বিক্ষোভ করেন।

তারা জানান, বাস ও ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন মাসে প্রায় দুই কোটি টাকা তোলে স্থানীয় শ্রমিকদের কাছ থেকে। করোনাকালে তা পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন শ্রমিকরা তহবিলের অর্থ না পেয়ে এভাবেই আন্দোলন করছেন।

ঢাকা মহানগরীতে বাস ও মিনিবাস চলে আট হাজার। এসব বাস পরিচালনায় যুক্ত কমপক্ষে ৪০ হাজার শ্রমিক। তাদের বেশির ভাগ অর্ধাহারে আছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাইদা পরিবহনের একজন চালক জানান, অনেকে গাড়ি চালাতে না পেরে, কোনও সহায়তা না পেয়ে সবজি বিক্রি করছেন। আব্দুল্লাহপুর-সদরঘাট পথে চলাচলকারী ভিক্টর ক্লাসিক ও আকাশ পরিবহনের দেড় হাজার শ্রমিক কর্মহীন, সহায়তা পাচ্ছেন না।

ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের চালক মো. শামীম বলেন, এ পর্যন্ত বাসের মালিক মো. শফিক তাকে পাঁচ কেজি চাল ও দুই কেজি আলু দিয়েছেন। ২৬ মার্চ থেকে বাস চালাতে পারছেন না। মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন বা ফেডারেশন থেকে কোনো সহায়তা পাননি।

তিনি জানান, বাস চললে শ্রমিক ইউনিয়নকে দিনে জিপি দিতে হয় ৩২০ টাকা, মালিক সমিতিকে দিতে হয় ৩০০ টাকা। গাড়িপ্রতি ৭০ টাকার নির্ধারণ করা হারের চেয়ে বেশি আদায় করা হয় বিভিন্ন স্থানে। এখন এসব তহবিল শ্রমিকদের জন্য কেউ ব্যবহার করছে না।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের অধীনে ঢাকাসহ সারা দেশে ২৩১টি পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন আছে। এ ফেডারেশনের অধীন বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নও শ্রমিকদের নাম সরকারি সহায়তার তালিকায় তোলার নামে কয়েকটি স্থানে চাঁদাবাজি করছে।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী জানান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের শ্রমিককল্যাণ তহবিল আছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার। এই তহবিল থেকেও পরিবহন শ্রমিকরা কোনও সহায়তা পাচ্ছেন না করোনাকালে।

শ্রম অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পরিবহন শ্রমিক নেতারা জানতে পারেন, এ সহায়তা শুধু চিকিৎসার জন্য দিতে পারবে অধিদপ্তর। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন করা হয়েছিল ২০০৬ সালে। শুরুতে বিধিমালা তৈরি হয়নি বলে বছরের পর বছর এটির কার্যক্রম বন্ধ থাকে।

২০১৩ সালে বিধিমালা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো এটি পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি। ২০০৬ সালে সরকার এ তহবিলে এক কোটি টাকা দিয়েছিল। ওসমান আলী জানান, সেটা বেড়ে এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়েছে। এর আওতায় গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। গাড়ির চাকা বন্ধ থাকায় দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবহন শ্রমিকরা বেকার হয়ে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন।

জানা গেছে, রাজধানীতে বাস টার্মিনাল পাহারার বিনিময়ে দৈনিক খোরাকি পাচ্ছেন কিছু পরিবহন শ্রমিক।

প্রসঙ্গত, বেতনকাঠামো কার্যকর না থাকায় পরিবহন শ্রমিকদের ৯৮ শতাংশই দৈনিক মজুরি বা ট্রিপভিত্তিক চাকরি করে থাকেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের কাঠামোগত মজুরির পরিবর্তে গণপরিবহন মালিকরা দৈনিক ইজারার ভিত্তিতে বাস, হিউম্যান হলার, টেম্পো, অটোরিকশার মতো যানবাহন চালকদের হাতে তুলে দেন। চালকরা দিনভিত্তিক মালিকের ইজারা, দৈনন্দিন জ্বালানি ও অন্য আনুষঙ্গিক খরচ, চালকের নিজের ও হেলপারের বেতন ওঠাতে গিয়ে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। তাঁদের জীবন যখন বিপন্ন তখন মালিক, শ্রমিক নেতারা তাঁদের পাশে নেই। পরিবহন শ্রমিকরা ত্রাণের দাবিতে সড়ক অবরোধ করছেন।

তিনি সড়ক ও নৌ খাতের সব শ্রমিককে পূর্ণাঙ্গ ঈদ বোনাসসহ এক মাসের বেতন ১৫ রমজানের মধ্যে পরিশোধের জোর দাবি জানান।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, শ্রমিকদের সহায়তা দেবে শ্রমিক ফেডারেশন। মালিকরা এর পরও যতটুকু পারছেন দিচ্ছেন। ফেডারেশনের নেতারা বলছেন, ঢাকা মহানগরীর বাস শ্রমিকদের কাছ থেকে ফেডারেশনের জন্য কোনো পরিচালনা ব্যয় (চাঁদা) তোলা হয় না। এ ব্যাপারে এনায়েত উল্ল্যাহ দ্বিমত প্রকাশ করে বলেন, ফেডারেশনের জন্য ঢাকার বাস শ্রমিকরা নির্ধারিত অর্থ দিয়ে থাকেন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি

করোনা,নেতা,চাঁদাবাজি,চালক,নাম,তালিকা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close