• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||

দেশে তরুণরাই বেশী করোনাক্রান্ত

প্রকাশ:  ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০৯:২৫ | আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০৯:৫৪
নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনায় মৃত্যুঝুঁকির ঊর্ধ্বে নয় কেউই। বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ শুরু থেকে বলা হচ্ছে তরুণদের তুলনায় বয়স্করাই সংক্রমণের বেশি ঝুঁকিতে। কোভিড-১৯ এর বাংলাদেশ বাস্তবতায় দেখা যায়, অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের আক্রান্ত হওয়ার হার ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে মোট শনাক্তের ২৪ শতাংশের বয়স ২১-৩০ বছর এবং ২২ শতাংশের বয়স ৩১-৪০ বছরের মধ্যে। এ দুই শ্রেণির জনসংখ্যা যোগ করলে আক্রান্তের হার দাঁড়ায় ৪৬ শতাংশ।

অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে ৪ হাজার ১৮৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তার মধ্যে এ দুই শ্রেণির জনসংখ্যার সংখ্যা ১ হাজার ৯২৬ জন। এর মধ্যে তরুণদের সংখ্যা ১ হাজার ৫ ও যুবকদের সংখ্যা ৯২১ জন। এসব তরুণ ও যুবকের অর্ধেকেরও বেশি ঢাকা শহরের।

সংখ্যায় কম হলেও এ দুই শ্রেণির আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এমনকি তা অন্য দেশের তুলনায় বেশি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে ১২৭ জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সবার বয়সের তথ্য প্রকাশ করেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে মারা যাওয়া ৭৩ জনের বয়সের তথ্য পাওয়া গেছে।

এ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাতজনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এবং তিনজনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ এ ৭৩ জনের মধ্যে ১০ জন এ দুই শ্রেণির বয়সী। অন্য দেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, চীনে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ছিলেন মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। ইতালিতে ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ছিল শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ।

এসব তরুণ ও যুবকের আক্রান্তের কারণে পরিবার ও সমাজের অন্য শ্রেণির বয়সের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, তরুণরা বেশি আক্রান্ত হবেন, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ এরা চলাফেরা করে, নিয়ম মানতে চায় না। তবে তাদের জন্য অন্যরা ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব বয়সীদের নিয়ে চিন্তা বেশি। কারণ এ শ্রেণির মানুষ আক্রান্ত কম হলেও মৃত্যুহার বেশি। তরুণ ও যুবকরা নিজেরা আক্রান্ত হয়ে এ শ্রেণির মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তারা বৃদ্ধ বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনকে আক্রান্ত করছে ও মৃত্যুর মুখে ফেলছে।

এ বিশেষজ্ঞ তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের জন্য বেশি বয়সী মানুষ আক্রান্ত হলে ও মারা গেলে নিশ্চয়ই তোমাদের কষ্ট লাগবে। তাই তোমরা ঘরে থাকো, ঠিকমতো কোয়ারেন্টাইন মানো। বের হতে হলে মাস্ক ব্যবহার করো।’

এর আগে গত সপ্তাহে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সেখানে বলা হয়, এখন তরুণরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সংস্থার কারিগরি প্রধান ডা. মারিয়া ভ্যান কেরখোভ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, যাদের বয়স কম এবং যাদের স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা নেই তারা এখন বেশি করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। তরুণরা কেন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তা নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া উচিত।

কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কমবয়সী ব্যক্তিরা কেন বেশি সংখ্যায় মারা যাচ্ছেন তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়নি। তবে আইইডিসিআরের পরামর্শক ও রোগতত্ত্ববিদ মুশতাক হোসেন বলেন, দেশভেদে স্বাস্থ্যের অবস্থা, পুষ্টির অবস্থা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভিন্নরকম। তবে এখনো শেষ কথা বলার সময় আসেনি। তিনি বলেন, আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ছে। শেষ পর্যায়ে গিয়ে চূড়ান্ত বিচার করা যাবে। তবে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কভিড-১৯-এ কমবয়সী মানুষের মৃত্যুর হার বেশি।

তরুণ ও যুবকরা কেন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, এখন পর্যন্ত তরুণ ও যুবক শ্রেণির জনসংখ্যাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এসব তরুণ ও যুবকের বেশিরভাগই ঢাকা শহরের। এদের আক্রান্তের মূল কারণ ঘরে থাকতে চায় না। মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা কম। তবে এদের মধ্যে মৃত্যুহার কম। কারণ এদের মধ্যে অন্যান্য রোগ নেই। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। তবে আক্রান্ত হচ্ছে, সেটা কিন্তু খারাপ। সুতরাং তাদের সতর্ক থাকতে হবে। নিয়মকানুন মানতে হবে।

২০১৬ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৯ শতাংশের বয়স ২৪ বছর বা তার নিচে। বয়স্ক বা ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের অধিকাংশ মানুষ শিশু ও তরুণ বয়সী। ০-২৫ বছর বয়সী মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা মাত্র ৬ শতাংশ। বাকি ৩৪ শতাংশ অন্যান্য বয়সের মানুষ।

এ বিষয়ে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, করোনাভাইরাসের জিনগত পার্থক্যের কারণে বাংলাদেশে তরুণরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। করোনাভাইরাসের ফার্স্ট জেনারেশন হলো চীনের বাসিন্দারা। তাদের মাধ্যেমে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এটি সেকেন্ড জেনারেশন। পরে সেটি এশিয়াতে আসে থার্ড জেনারেশন হিসেবে। জিনগত পরিবর্তন হয়ে এখন এটি বাংলাদেশে চতুর্থ প্রজন্মে অবস্থান করছে। ইউরোপ-আমেরিকা বা চীনের বৃদ্ধরা বাইরে যাতায়াত বেশি করে। ফলে তাদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি। একইভাবে বাংলাদেশের তরুণরা বাইরে ঘোরাঘুরি করায় এদের মধ্যে সংক্রমণ হার বাড়ছে।

সবচেয়ে কম আক্রান্ত শিশু ও কিশোর : দেশে এখন পর্যন্ত শূন্য থেকে ১০ বছর এবং ১১-২০ বছর বয়সী শ্রেণির জনসংখ্যার মধ্যে আক্রান্তের হার সবচেয়ে কম। গতকাল পর্যন্ত মোট আক্রান্তের ৩ শতাংশ ০-১০ বছর ও ৮ শতাংশ ১১-২০ বছর বয়সী। তবে তরুণ ও যুবকদের পরপরই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ৪১-৫০ বছরের মধ্যবয়সীরা। এ সংখ্যা ১৮ শতাংশ। এর পরপরই রয়েছে ৫১-৬০ বছরের জনসংখ্যা। তাদের আক্রান্তের হার ১৫ শতাংশ।

আক্রান্ত কম হলেও ষাটোর্ধ্বদের মৃত্যু বেশি : শিশু ও কিশোরদের পরপরই সবচেয়ে কম আক্রান্ত হচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব বয়সী মানুষ। তবে এ ষাটোর্ধ্বদের মৃত্যুহার বেশি। আইইডিসিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব বয়সীদের করোনাভাইরাসে আক্রান্তের হার ১০ শতাংশ হলেও করোনায় তাদের মারা যাওয়ার হার ৫০ ভাগ।

বেশি আক্রান্ত পুরুষ :বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্তের ৬৮ শতাংশই ছিল পুরুষ ও ৩২ শতাংশ নারী। অর্থাৎ এ পর্যন্ত যে ৪ হাজার ১৮৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে পুরুষ রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৮৪৬ ও নারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৪০ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রোগীর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা এবং প্রবীণদের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার কারণে তাদের মৃত্যুর হার বেশি। তবে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়া দেশগুলোতে ষাটোর্ধ্ব বয়সীদের মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশেরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার জন্য প্রবীণদের আরও যত্নবান হওয়া, বাড়ির ভেতরে থাকা, কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব অনুসরণ, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং তাদের চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, করোনাভাইরাসে ষাটোর্ধ্বদের আক্রান্তের হার তুলনামূলকভাবে কম। তবে বয়সজনিত বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা থাকার কারণে এ গ্রুপে মৃত্যুর হার বেশি। অতিমাত্রায় ছোঁয়াচে এ ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে বয়স্কদের অবশ্যই কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং বাসা থেকে বের হওয়া উচিত নয়।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

করোনায় মৃত্যুঝুঁকি,আইইডিসিআর,তরুণ,বিশেষজ্ঞরা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close