• শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

জোরালো হচ্ছে চিকিৎসকদের সুস্থ রাখার চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ:  ১৩ এপ্রিল ২০২০, ১৪:৩১ | আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২০, ১৫:৪১
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব তীব্র হয়ে উঠছে। আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন, তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর আক্রান্ত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে আসছে। চিকিৎসা সেবায় নিবেদিত ব্যক্তিদের শারীরিক সুস্থতার বিষয়টি যতোটা গুরুত্ব পাওয়া দরকার, তা না দেওয়ার অভিযোগ জোরালো হয়ে ওঠেছে।

চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের সংগঠনগুলো জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ২২ জন চিকিৎসক, ৫ জন নার্স ও ৪ জন টেকনিশিয়ান করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসক, নার্সসহ অর্ধ শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী বর্তমানে কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। করোনার উপসর্গ নিয়ে রোববার সকালে রাজধানীতে একজন দন্ত চিকিৎসকের মারা গেছেন।

আমাদের দেশের সব হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য চিকিৎসাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি। দেশের উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুলো থেকে শুরু করে জেলা সদরের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন শত শত মানুষকে চিকিৎসেবা নিতে আসছেন, তাদের কেউ কেউ দেহে বহন করছে প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস। যেসব চিকিৎসক- নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই তারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এখনও চিকিৎসকদের সরকারিভাবে পর্যাপ্ত পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) সরবরাহ কারা হয়নি। নিজেদের টাকায় কেনা একটি মাস্ক ব্যবহার করে স্বাভাবিক পোশাক পড়েই ভাইরাস সংক্রমনের ঝুঁকি নিয়েই অনেকে দেখছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেবা দিতে গিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানরা। ইতালিতে মোট আক্রান্তের ৮ দশমিক ৩ শতাংশ চিকিৎসা-কর্মী। চীনে চিকিৎসা-কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার হার মোট আক্রান্তের ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ইতালি ও চীন দুটি দেশই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে। তারা তাদের চিকিৎসা-কর্মীদের উন্নতমানের সব ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দিয়েছে।এর পরও উন্নত বিশ্বে চিকিৎসা-কর্মীদের আক্রান্তের সংখ্যা এত বেশি। ইতালিতে চিকিৎসা-কর্মীরা এত বেশি আক্রান্ত হয়েছেন যে সেখানে চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে।

করোনা মহামারিতে সারা বিশ্বে এখন স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকির বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। হাসপাতাল দ্রুত তৈরি করা সম্ভব হলেও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত রাখার জন্য বিভিন্ন দেশ নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

মহামারির শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। গত শুক্রবার সংস্থাটির প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, ‘এই মহামারির ইতি ঘটাতে প্রত্যেক ব্যক্তিরই ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা বিশেষত স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিছু দেশে ১০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন ঝুঁকিতে থাকেন, আমরা সবাই তখন ঝুঁকিতে।’ তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের যদি যথাযথ ও পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক সামগ্রী সরবরাহ করা যায়, তাহলে তাঁদের মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যকর্মীদের ১৬টি অধিকারের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকিতে থাকলে সবাই ঝুঁকিতে থাকে। তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত হলে সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব।

১৯ মার্চ প্রকাশিত বিশ্ব সংস্থার নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের তথ্য জানাতে হবে, নির্দেশনা দিতে হবে, পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সন্দেহভাজন বা শনাক্ত হওয়া কোভিড–১৯ রোগীর সেবায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (মাস্ক, গ্লাভস, গগলস, গাউন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, পানি ও পরিষ্কার করার সামগ্রী) সরবরাহ করতে হবে।

নির্দেশিকায় আরও বলা আছে, দোষারোপহীন পরিবেশে তাঁদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দৈনিক কাজের মধ্যে ছুটিসহ যথাযথ কর্মঘণ্টা বজায় রাখতে হবে। তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে এসব বিষয়ে সরকার মনোযোগ দিচ্ছে না বলে অভিযোগ ওঠেছে। সরকারি চিকিৎসকদের কর্মস্থলে আনার জন্য গত ২৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুটি নির্দেশনা জারি করে। চিকিৎসকদের জোর করে কর্মস্থলে হাজির করার একটি প্রচেষ্টা তাতে ছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে দুটি নির্দেশনাই সরকার প্রত্যাহার করে। স্বাস্থ্যসচিব আসাদুল ইসলাম তখন বলেছিলেন, ওই প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না।

এরই মধ্যে গত শনিবার ছয়জন চিকিৎসককে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ছয়জন চিকিৎসককে কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে কোভিড–১৯ রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অধিদপ্তরের অভিযোগ, তাঁরা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন।

করোনাভাইরাস মোকাবেলার লড়াইয়ের এই সময়ে এ ধরনের পদক্ষেপ চিকিৎসকদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকেই। এমন পদক্ষেপ যথাযথ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ–সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান।

করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধতে যারা নেতৃত্ব দিবেন সেইসব চিকিৎসকের মনোবল চাঙ্গা রাখাটা জরুরি। তোপের মুখে থাকা সেনাপতি কখনো যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারে না। যেখানে বিশ্বের কিছু দেশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বীরের মর্যাদা দিয়ে থাকা, খাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছে। আমাদের দেশে ঝুঁকির মুখে মারাত্মক ভাইরাসটির সবচেয়ে কাছে যাচ্ছেন চিকিৎসকেরা, জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন তারা। তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ ও প্রাপ্যসম্মান নিশ্চিত করতে হবে।

পূর্বপশ্চিম- এনই

চিকিৎসকদের সুরক্ষা,পিপিই সংকট,চিকিৎসক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close