• সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

এ কেমন মৃত্যু, স্বজন ছুঁয়ে কাঁদতেও পারে না!

প্রকাশ:  ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০১:৪২ | আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০১:৪৬
নিজস্ব প্রতিবেদক
জালাল সাইফুর রহমানকে সোমবার বিকালে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। ছবি: পূর্বপশ্চিম

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক (প্রশাসন) জালাল সাইফুর রহমানকে সোমবার বিকালে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। বিকেল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে তাকে দাফন করা হয়।

দাফনের সময় তার মৃতদেহটি সুরক্ষামূলক সরঞ্জামে আবৃত ছিল এবং দাফন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া ব্যক্তিদেরও ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম পরতে দেখা গেছে। জানাজা ও দাফনকালে তার কিছু সহকর্মী ও মারকাজুল ইসলামের ক’জন স্বেচ্ছাসেবী উপস্থিত ছিলেন। তার কোনো আত্মীয়-স্বজন জানাজায় উপস্থিত হতে পারেননি। এমনকি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ায় তার লাশ নেয়া হয়নি চট্টগ্রামের ষোলশহরের পৈতৃক বাড়িতেও।

দুদক পরিচলক এক সপ্তাহ আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সোমবার ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ বিষয়ে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাব্বির আহমেদ জানান, তিনি সপ্তাহখানেক আগে এসেছেন। তখনই তার কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিল। এক দিন পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পাঁচ দিন ধরে তিনি আইসিইউতে ছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, দুদক পরিচালকের আগে থেকেই হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের জটিলতা ছিল। সোমবার করোনাভাইরাসে দেশে নতুন করে তিনজনের মৃত্যু হওয়ায় এ সংখ্যা ১২ জনে দাঁড়িয়েছে।

দুদকের ওই পরিচালক বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারের ২২তম ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২০১৬ সালে প্রেষণে দুদকের পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী ও এক ছেলে রেখে গেছেন তিনি।

এদিকে, গত এক সপ্তাহ ধরে সেল্ফ আইসোলেশনে আছেন তার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান। সেল্ফ আইসোলেশনে থাকায় বাবার জানাজা কিংবা দাফন কোথাওই অংশ নিতে পারেননি তার একমাত্র সন্তান সামিন রহমান। এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের পরিবারের মানসিক অবস্থা, বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন সামিন।

সেখানে তিনি লিখেছেন, আমার বাবা জালাল সাইফুর রহমান গত ৩০শে মার্চ করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দুঃখের বিষয়, তার মৃত্যু সংবাদ নিয়ে লেখা প্রতিবেদনেও অনেক ভুল-ভ্রান্তি চোখে পড়ে। সে ভুল-ভ্রান্তি গুলো আমি একটু তুলে ধরতে চাই-

- আমি তার একমাত্র সন্তান ছিলাম, আমার কোন ভাই-বোন নেই

- আমি এবং আমার আম্মু দুইজনই পরিপূর্ণ রূপে সুস্থ আছি

- আমরা গত ৭ দিন ধরে দুইজনই সেল্ফ আইসোলেশনে আছি, কোনো হাসপাতালে না। আমাদের দুইজনকে আরও ৭ দিন সেল্ফ আইসোলেশনে থাকতে হবে। (সেল্ফ আইসোলেশন বলতে ঘরের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে রাখা, কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ কিনবা মেলামেশা না করা)।

তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে লিখেছেন, সেল্ফ আইসোলেশনের কারণে না বাবার জানাজার অংশ হতে পেরেছি না উনাকে কবর দেওয়ার অংশ হতে পেরেছি, এর চেয়ে কঠিন কিছু আর নেই। উনাকে সোমবার ৪টার দিকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। উনি একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ ছিলেন। উনার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

দুদক কর্মকর্তা জালাল সাইফুর রহমান

২২ মার্চের পর থেকে তার বাবা বাসায়ই ছিলেন উল্লেখ করে তিনি আরও লিখেছেন, তাই এখনও যারা ঘরে থাকার বিধিনিষেধ মানছেন না, তাদের সবাইকে ঘরে থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই না বর্তমানে আমার এবং আমার পরিবারের উপর দিয়ে যা যাচ্ছে, তা আমার শত্রুকেও মোকাবেলা করতে হোক।

‘এ কেমন মৃত্যু! যার পরিবার তাকে ছুঁয়ে কান্না করতে পারে না! যার মৃতদেহ কবরে নামানোর জন্য পরিবারের কেউ থাকে না!’ জালাল সাইফুর রহমানের জানাজা-দাফনের পর বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের ফেসবুক পেজে এমনই কিছু লাইন লিখে পোস্ট করা হয়। মরণকালে স্বজনদের কাছে না পাওয়া আর প্রিয়জনকে ছুঁয়ে কাঁদতে না পারার পারস্পরিক বেদনার এমন প্রকাশ আপ্লুত করেছে অনেককেই। ওই পোস্টেই অনেকে মন্তব্য করেন, এই বেদনার পাহাড় যেন বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

৪৫ বছর বয়সী এই চৌকস কর্মকর্তার এমন বিদায়ে কাঁদছেন তার স্বজন, বন্ধু, গুণগ্রাহীরা। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোক আরও ভারী করে দিচ্ছে তার মুখ একবারের জন্যও দেখা হলো না বলে, তার জানাজা-দাফনে থাকা হলো না বলে।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের ফেসবুক পেজের ওই পোস্টে জালাল সাইফুরের মৃত্যুর খবর দিয়ে বলা হয়-

‘এ কেমন মৃত্যু! যার মৃত্যুর সময় প্রিয়জন কেউ পাশে থাকতে পারে না।

এ কেমন মৃত্যু! যার মৃত্যুর পর প্রিয়জনরা শেষবারের মতো তার মরামুখটা দেখতে পারে না।

এ কেমন মৃত্যু! যার পরিবার তাকে ছুঁয়ে কান্না করতে পারে না ।

এ কেমন মৃত্যু! যার জানাযায় পরিবার-পরিজন-প্রিয়জনরা কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে না।

এ কেমন মৃত্যু! যার মৃতদেহ কবরে নামানোর জন্য পরিবারের কেউ থাকে না।

এ কেমন মৃত্যু! প্রিয়জনরা শবযাত্রায় অংশ নিতে পারে না।’

এদিকে মৃত্যুর খবরটি শোনার পর থেকে জালাল সাইফুরের ষোলশহরের পৈতৃক বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তার চাচা ও নগরের ষোলশহর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে দুই দফা জ্বরে কষ্ট পেয়েছিল জালাল সাইফুর। পরে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল। রোববার তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে না বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু ভোরে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে লাইফ সাপোর্টে ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘জালাল সর্বশেষ গত ঈদে বাড়ি এসেছিল। বেশিরভাগ সময় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ঢাকায়ই থাকতো। সকালে তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকে শোকের মাতম চলছে বাড়িতে।’

প্রসঙ্গত, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে তিনজন করোনা রোগী মারা গেছেন এবং ৩৫ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা মোট ১২৩ জন।

এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, বিশ্বব্যাপী বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসে দেশে নতুন করে আরও ২৯ জন আক্রান্ত এবং চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

করোনাভাইরাস,দুদক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close