• সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

গার্মেন্টে কাজে লাখো শ্রমিক, করোনা ছড়ালে দায় কার?

প্রকাশ:  ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২১:১৯ | আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২১:২৭
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে কাজে যাচ্ছেন পোশাক শ্রমিকরা। ছবিটি রোববার তোলা। -পূর্বপশ্চিম

পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা সব ধরনের পোশাক কারখানা ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ রাখতে মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান শনিবার রাতে। এই আহ্বানে কেউ সাড়া দিয়েছেন, কেউ দেননি। কারখানা খোলা রেখেছেন অনেক মালিক। মরণঘাতি করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি নিয়েই সেখানে কাজ করছে লাখ লাখ শ্রমিক। ঢাকার আশুলিয়া, সাভার, মিরপুর, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানায় অবাধে কাজ চলছে। কারখানা খোলা রাখায় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার ঘটতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। কর্মরত শ্রমিক ও তাদের পরিবারে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মুখে মাস্ক এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ছাড়া অধিকাংশ কারখানায় অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জরুরি কাজের কথা বলে আশুলিয়ার পলাশবাড়ির স্কাইলেন গার্মেন্টসে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। ওই গার্মেন্টেসে সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করছে। একইভাবে ওই এলাকার জামগড়ার এফএনএফ গার্মেন্ট, ইফিজেডের শান্তা গার্মেন্টসে কাজ করছেন দুই সহস্রাধিক শ্রমিক। গোল্ডটেক্স গার্মেন্টে কাজ করছেন প্রায় ১০ গাজার শ্রমিক। এছাড়াও গ্লোবাল, এসকেআরএম ফ্যাশন লিমিটেডে প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। আশুলিয়ার এলায়েন্স গার্মেন্টস খোলা ছিলো ১১টা পর্যন্ত। পরে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিয়ে দাবি তোলেন ইউনিয়নের নেতারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকলে গার্মেন্ট বন্ধ ঘোষণা করেন কর্তৃপক্ষ।

সাভারের আল মুসলিম, আল লিমা কারখানায় দুই সহস্রাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। আশুলিয়ার জুরাবোর জেএল সুয়েটার, আইরিশ, আনজে রেফারেন্স, ডিাজাইনার ফ্যাশন, স্প্রিং সুয়েটার, সরকার মার্কেটের বিশাল সুয়েটার, বাইপাইলের এসকেআরএমএস, এক্টর বিডি লিমিটেডসহ বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।

শিল্প পুলিশের একটি সূত্র বলছে, রোববার ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের ৯৮টি তৈরি পোশাক শিল্পের মধ্যে খোলা ছিল ৪৭টি আর সাভার-আশুলিয়ায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য এমন তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর মধ্যে খোলা ছিল ২৯৭টি।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে শিল্প-পুলিশের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শিল্প মালিকরা কারখানা খোলা রেখেছেন। হাজার হাজার শ্রমিকরা কারখানার উদ্দেশে পথে নেমেছে। এখানে আমাদের করার কিছুই নেই।’

তবে অনেক এলাকায় কারখানা বন্ধ রয়েছে। সকালে কারখানার গেইট থেকে ফিরেছেন অনেকে। মাইকিং করে জানানো হয়েছে কারখানা বন্ধ। স্ট্যান্ডার্টগ্রুপের মিরপুরের কালশির আধুনিক পোশাক শিল্প, তেজগাঁও’র এসজিএল, গাজীপুরের গাজীপুর ফ্যাশনসহ বেশ কয়েক কারখানায় ঘটেছে এমন ঘটনা। বেতন কাটা, চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে শনিবার ঢাকায় আসতে বাধ্য করা হয়েছিলো শ্রমিকদের।

পোশাক শ্রমিক মনিরা জানান, সকালে কারখানায় যাওয়ার জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরমধ্যেই ফোনে জানতে পারেন কারখানায় নোটিশ ঝুলানো হয়েছে ১১ই এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ। অনেকেই কারখানা পর্যন্ত যান। সেখানে মাইকিং করে বন্ধের বিষয়টি ঘোষণা করা হয়। কারখানা বন্ধের কারণেও বিপাকে পড়েন শ্রমিকরা। পায়ে হেঁটে পরিশ্রম করে ঢাকায় এসেছেন। এখন আবার ছয় দিন বাসায় থাকতে হবে। জমানো টাকা খরচ করে বা ধার দেন করেই চলতে হবে তাদের।

হঠাৎ করে গার্মেন্টস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে শ্রমিকরা দুর্ভোগে পড়েছেন। সাধারণ ছুটির এ পরিস্থিতিতে তারা রাজধানীতে এসেছেন মার্চের বেতন পাবেন সেই আশায় এবং একইসঙ্গে চাকরি হারানোর ভয়েই। শ্রমিকদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে, এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে তারা কর্মস্থলে আসতেন না। কিন্তু এখন তারা ঢাকায় এসে মহাবিপদে পড়েছেন। কারণ আপাতত নিজ বাসস্থানে থাকার জায়গাটি ছাড়া তাদের কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই। ফলে ওই সময় পর্যন্ত টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা।

এ চিত্র হেমায়েতপুরের।

আশুলিয়ার জিরাব পুকুরপাড় এলাকার অ্যালায়েন্স নিট কম্পোজিট লিমিটেডের শ্রমিক রিপন মোহন্ত বলেন, আগের ঘোষণা অনুযায়ী তারা সকালে কারখানায় গেলে কর্তৃপক্ষ সকাল সাড়ে ১০টায় ছুটি ঘোষণা করে। এখন এই অবস্থায় বেতন পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

গাজীপুরের ভোগড়া এলাকার গবিব অ্যান্ড গরিব স্যুয়েটার কারখানার পরিচালক মো. ফজলুল হক বলেন, তিনি শনিবার রাত ১০টায় জানতে পারেন বিজিএমইএ ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটির ঘোষণা দিয়েছে। ফলে শ্রমিকদের আগে জানানো সম্ভব হয়নি। আগে সিদ্ধান্তমত ছুটি শেষে রোববার কারখানা চালু হওয়ার কথা। সেই হিসেবে শ্রমিকরা সকালেই কারখানায় চলে আসে। তাই কারখানা না খুলে তাদের ১১ এপ্রিল আসতে বলেছি। বিজিএমইএ ছুটি বাড়ানোর ঘোষণা আগে দিতে পারত।

১১ এপ্রিল কারখানা খুললে বেতনের বিষয়ে ঘোষণা দেবেন বলে তিনি জানান।

শিল্প পুলিশ-৪ এর পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলায় ২৪৫৯টি পোশাক কারখানায় ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে। এর মধ্যে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত ৪০টি পোশাক কারখানাসহ নিটিং, ডাইং, সিমেন্ট, বিস্কুটসহ বিভিন্ন ধরনের ২৭৫টি কারখানা রোববার খোলা ছিল। যেসব কারখানা বন্ধ সেখানেও অনেক শ্রমিক সকালে কাজে যোগ দিতে এসে ফিরে গেছে।

শিল্প পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায় সচল শিল্প কারখানা আছে ১ হাজার ২২৯টি। এর মধ্যে সাধারণ ছুটিতে কারখানা চালু আছে ৩৭৭টি। রোববার এসব কারখানা পুরোদমে চালু ছিল। ৩৭৭টি কারখানার মধ্যে ১৮৭টি তৈরি পোশাক কারখানা এবং বাকি ১৯০টি রড-সিমেন্টসহ বিভিন্ন খাতের।

অধিকাংশ কারখানায় সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না। গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে একসঙ্গে হুড়োহুড়ি করে অনেক শ্রমিক ঢোকেন এবং বের হন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক শিল্প পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সুরক্ষা বলতে শুধু মুখে মাস্ক লাগানো এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। এর বাইরে সুরক্ষার কিছুই নেই। সামাজিক দূরত্ব কোথাও দেখিনি। কারখানাগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে।’

এমন অবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেছে ‘তৈরি পোশাকশিল্প মালিকরা প্রমাণ করে দিলেন যে, তাদের নিজেদের স্বার্থের সামনে শুধু শ্রমিকই নয়, পুরো দেশের কল্যাণ ও নিরাপত্তা কোনো অর্থ বহন করে না।’

সাভার থেকে তোলা ছবি।

গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, শ্রমঘন এলাকায় করোনাভাইরাস থেকে কতটুকু নিরাপত্তা পাবেন শ্রমিকরা তা নিয়ে আমরা আতঙ্কে রয়েছি। অনেক জায়গায় ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা চলছে বলেও শুনেছি। এদিকে সামনে ঈদ। শ্রমিকরা শঙ্কায় রয়েছেন।

এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও বিজিএমইএ সদস্য মো. আব্দুস সালাম মুর্শেদী আশ্বাস দিয়েছেন, বেতন নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। আশুলিয়া এলাকায় কারখানার মালিকদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। ১২ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে বেতন-ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া কারখানায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সব ধরনের সতর্কতা ও প্রতিরোধী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হকও আশ্বস্ত করেছেন, তারা বেতন পাবেন। এটা নিয়ে তাদের শঙ্কিত হবার প্রয়োজন নেই। একইভাবে ছুটির কারণে তারা চাকরি হারাবেন না।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

করোনাভাইরাস,গার্মেন্ট
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close