• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

গার্মেন্ট মালিকরা কি মহামারী চান?

প্রকাশ:  ০৫ এপ্রিল ২০২০, ০০:৪৩
নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দেশজুড়ে অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে রোববার থেকে কিছু কিছু তৈরি পোশাক কারখানা খুলছে। গার্মেন্ট মালিকদের এমন সিদ্ধান্তে ঢাকামুখী পোশাক শ্রমিকদের স্রোতে দেশ আরও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লো। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার আহ্বানের তোয়াক্কা না করে শনিবার ঠাসাঠাসি করে কর্মস্থল ঢাকা অভিমুখে ছুটেছেন শ্রমিকরা। এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অনেক রাজনীতিক। গার্মেন্টস কারখানা খোলায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরাও।

আতঙ্কিত মানুষের প্রশ্ন, কারখানা খোলা রেখে এভাবে শ্রমিকদের এনে, সামাজিক দূরত্বের নির্দেশ লঙ্ঘন করে গার্মেন্ট মালিকরা কি করোনার মহামারী আনতে চান? বাণিজ্য মন্ত্রী কি ঘুমে? বিজিএমইএ-এর সভাপতি রুবানা হক ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধের আহবান জানিয়েছেন। সরকারের ছুটি বহাল। তবু কারা এ সর্বানাশা খেলা খেলছেন?

প্রধানমন্ত্রীর ২৬ মার্চ ঘোষিত এ প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থছাড় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে ২ এপ্রিল এ প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অনুদান আশা করলেও সরকার ঋণ হিসেবে এ প্রণোদনার অর্থ দেয়ার ঘোষণা দেয়ায় মালিকরা আশাহত হয়েছেন। কিন্তু তা মেনে নিলেও শিল্প মালিকরা বলছেন, তাদের মূল আপত্তির ক্ষেত্রটি হলো শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেয়ার বা বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে। প্রজ্ঞাপনে যে বিতরণ প্রক্রিয়া বলা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। সরকারের কাছ থেকে ফের প্রণোদনা নেওয়ার কৌশল হিসেবে সাধারণ ছুটির মধ্যেও গার্মেন্টস কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গার্মেন্টস মালিকরা।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা গার্মেন্ট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত মালিকদের ওপরই ছেড়ে দেয়ার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশে প্রায় ১১ শ’ কারখানায় তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্ডার বাতিল হয়েছে। তারা বলছেন, কারখানা খোলা রাখা বা বন্ধের বিষয়ে সরকারের বাধ্যবাধকতা নেই।

জানা গেছে, সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও পোশাক শ্রমিকদের যেহেতু বিভিন্ন অর্ডার এবং বায়ারদের চাহিদা ছিলো, এজন্য তাদের ওপরই সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো। এতে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত অনেক কারখানা ছুটি দিয়েছিলো। বলা হয়েছিলো তারা যেন বাসায় হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকে। কিন্তু ছুটি পেয়ে সবাই গ্রামের বাড়ির চলে যায়। সরকার ছুটি দ্বিতীয় মেয়াদে বাড়ালেও গার্মেন্ট কারখানাগুলো আর ছুটি বাড়ায়নি। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা মনে করছেন ৫ এপ্রিল কারখানায় যোগ না দিলে তাদের চাকরি থাকবে না। এই ভাবনা থেকে দেখা গেছে ঢাকামুখী মানুষের জনস্রোত।

শনিবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে পণ্যবাহী খালি ট্রাক, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মাহেন্দ্রসহ বিভিন্ন ছোটখাটো যানবাহনে ঢাকায় ফিরতে দেখা গেছে। সাভার, গাজীপুর, মাওয়াসহ ঢাকার প্রবেশদ্বারগুলোতে হেঁটে রাজধানীতে ফিরেছেন অনেকে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফেরিঘাট ও বিভিন্ন যানবাহনে গাদাগাদি করে ঢাকায় ফেরা এসব মানুষের অনেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত থাকার আশঙ্কাই বেশি। ঢাকামুখী মানুষের স্রোত শুধু সংক্রমণের ঝুঁকিই বাড়াবে না, পুরো দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। হাজার হাজার মানুষের গায়ে গায়ে লেগে ঢাকায় ফেরার এ ধরনের দৃশ্য করোনা প্রতিরোধের বিপরীতমুখী চিত্র। এদের মধ্য থেকে কিছু লোকও যদি আক্রান্ত থাকে, তাদের মধ্য থেকে সামাজিকভাবে অনেকে সংক্রমিত হতে পারেন।

একজন শ্রমিক জানান, একটি টি-শার্ট তৈরি করতে ২৫-৩০ জন শ্রমিকের হাতের ছোঁয়া লাগে। একজন ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এদের সবাই আক্রান্ত হবেন। এরপর আশপাশের লোকেরাও আক্রান্ত হবেন। পোশাক কারখানায় এখন অবশ্যই ছুটি থাকা উচিত। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। আমাদের কর্মস্থলে যোগ দিতে তাড়া দেয়া হচ্ছে।

মাসখানেক ধরে কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশে ফিরেছেন। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন শনিবার পর্যন্ত ৮ জন। এই পরিপ্রেক্ষিতে সারাদেশ লকডাউন না করে উল্টো তাদের ঢাকায় ফেরার দৃশ্য কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা ধারণাও করা যাচ্ছে না। অবহেলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও স্পেনের মতো উন্নত দেশ চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ওই ধরনের অবস্থা হলে আমাদের দেশের লাখ লাখ লোক বিনাচিকিৎসায় মৃত্যু ঘটবে।

বিকেএমইর সিনিয়র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, তাদের সংগঠনভুক্ত ৪০ শতাংশ কারখানা রোববার খুলছে। নতুন রপ্তানি আদেশ নেই। যাদের হাতে পুরোনো রপ্তানি আদেশ ও করোনা থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের রক্ষায় পিপিই তৈরির কাজ আছে, তারাই কারখানা খুলছেন। যারাই কারখানা খুলবেন, তাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

বিজিএমইএ-এর সভাপতি রুবানা হক বলেছেন, ‘শ্রমিক যদি কোনো কারণে এবং সঙ্গত কারণে উপস্থিত না থাকেন কারখানায় মানবিক বিবেচনায় তার চাকরিটি হারাবেন না। এটি আমাদের প্রত্যেক সদস্যদের কাছে অনুরোধ করবো। আমি আশা করি, এই শিল্পখাত যেটি অর্থনীতিতে এতবড় অবদান রাখে সেই মালিকেরা তাদের শ্রমিকের অনুপস্থিতির কারণে চাকরি না হারান। আশা করি, সদস্যরা এটি শুনবেন এবং আমার অনুরোধটুকু রাখবেন।’

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের তৈরি পোশাক কারখানা খোলা রাখা যাবে। করোনার এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী নতুন পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। সেই চাহিদা অনুসারে নতুন পণ্য তৈরি করে রফতানি করতে হবে। বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন সুযোগ আসছে। এসব সুবিধা যেন ব্যবসায়ীরা কাজে লাগান। তবে কাজ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

করোনাভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close