• বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
  • ||

ঘূর্ণিঝড় আইলার চেয়েও শক্তিশালী বুলবুল!

প্রকাশ:  ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:১৪ | আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:১২
নিজস্ব প্রতিবেদক

শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোংলা সমুদ্রবন্দরের ২৮০ কিলোমিটার এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরের ৩১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ঘূর্ণিঝড়টির অবস্থান ৪৭৫ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণপশ্চিমে এবং কক্সবাজার থেকে ৪৭০ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণপশ্চিমে। শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ বা মধ্যরাতে এটি বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ ‘আইলা’র চেয়েও শক্তিশালী। ২০০৯ সালের ২৫শে মে ১২৫ কিলোমিটার বেগে আঘাত হেনেছিল অতি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় আইলা। আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। অফিসের তথ্যানুযায়ী, উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আরও উত্তর দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে।

বুলবুল-এর অগ্রবর্তী অংশের প্রভাবে দেশের সমুদ্র বন্দরগুলো, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে যাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল-এর প্রভাবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। এছাড়া আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিনে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ও মুন ফেজের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোর নিন্মাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৭ থেকে ৯ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ ফরিদ আহমেদ।

অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল-এর প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আজ শনিবার সকাল ৭ টার মধ্যে জেটি থেকে সব জাহাজ সরিয়ে দিয়ে সাগরের গভীর নোঙরে পাঠানো হয়েছে। ইয়ার্ড ও জেটিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিগুলোকে রশি দিয়ে বেঁধে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা হিসেবে এলার্ট ফোর জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সচিব ওমর ফারুক।

তিনি বলেন, বন্দরের জেটিতে ষোলটি জাহাজ ছিলো, বহির্নোঙরে আগে থেকেই পঞ্চান্নটি জাহাজ রয়েছে। এখন পাঠানো হয়েছে ষোলটি। জাহাজগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরে কন্টেইনার উঠানামা, খালাস ও ডেলিভারিসহ সব ধরণের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। সমুদ্র শান্ত ও স্বাভাবিক হলে বন্দরের কার্যক্রমও স্বাভাবিক হবে। সাগর উত্তাল থাকায় লাইটারেজ জাহাজ, মাছ ধরার ট্রলার-ছোট জাহাজ, সাধারণ নৌকাসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের যুগ্ম-পরিচালক হাজী শফিক আহমেদ জানান, বন্দরের বহির্নোঙ্গরে কোনো লাইটারেজ জাহাজ যাচ্ছে না। বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য ওঠানামা বন্ধ আছে।

কর্ণফুলী নদীতে এবং বিভিন্ন ঘাটে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত একশরও বেশি লাইটারেজ জাহাজ অবস্থান করছে। এছাড়া কর্ণফুলী নদীতে মাছ ধরার নৌযানগুলোকে তীরে এনে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। প্রায় ২০০ মাছ ধরার নৌযান এখন কর্ণফুলী নদীতে অবস্থান করছে। নৌ-বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিমান ওঠানামা স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান বন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার এবিএম সারওয়ার-ই-জাহান।

সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের আশ্রয়কেন্দ্র, শুকনো খাবার ও স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উপকূলীয় এলাকা ও পাহাড়ে বসবাসকারী লোকজনকে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় জন্য পর্যাপ্ত খাবার মজুদ রাখা হয়েছে বলে জানান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম জেলায় সাইক্লোন সেন্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের ১০টি ওয়ার্ডে বঙ্গোপসাগরের উপকূল রয়েছে। এসব উপকূল থেকে সাধারণ মানুষ সরিয়ে নিতে ৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় আলাদা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও সম্ভাব্য উপদ্রুত এলাকার মানুষের জন্য শুকনো খাবারও মজুদ রাখতে বলা হয়েছে। ক্ষেতে পাকা ধান থাকলে সেগুলো কেটে ফেলার জন্য চাষিদের বলা হয়েছে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভয়াবহ এই বুলবুল মোকাবেলার জন্য পুর্ববর্তী ও পরবর্তী প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের গাড়ি শ্রমিক, সেবক সবাইকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নগরের রাস্তাঘাট পরিষ্কারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সব জেলা-উপজেলায় জরুরি সভা করে সার্বিক প্রস্তুতির জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া প্রস্তুত রয়েছে রেড ক্রিসেন্টর স্বেচ্ছাসেবী দল। ফায়ার সার্ভিস পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন জরুরি সভা করে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, চট্টগ্রামে ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ উপজেলায় ৫টি করে ৭০টি, ২০০ ইউনিয়নে ১টি করে মোট ২০০টি, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৫টি এবং নগরে আরও ৯টি আরবান ডিসপেনসারি টিম গঠন করে তাদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি টিমে ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট মিলিয়ে তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। মোট ৮৫২ জন টিমের সদস্যকে সম্ভাব্য দুর্যোগসহ যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া ৯ লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ওষুধ এবং সাড়ে ৪ লাখ ওরস্যালাইনও মজুদ আছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।


পূর্বপশ্চিমবিডি/ইমি

ঘূর্ণিঝড় আইলা,ঘূর্ণিঝড় বুলবুল,ঘূর্ণিঝড় আইলার চেয়েও শক্তিশালী বুলবুল!
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত