• মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

মিরপুরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

ওষুধ নেই মরিয়মের , নিহত ফারজানার খবর জানে না বাবা

প্রকাশ:  ০১ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:২৫
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত বেড়ে ৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সাত বছরের শিশু ফারজানা বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে। ফারজানার বোন মরিয়মও (৯) ছিল ঘটনাস্থলে। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছে সে। তবে মরিয়ম আহত। পায়ের ব্যথায় কাতরাচ্ছে বিছানায়।

ওষুধ নেই ঘরে, নেই ওষুধ কেনার টাকাও। উপায় না দেখে কাঁদতে কাঁদতে মরিয়মকে তার বাবা আবু তাহের বলছেন, ‘ঠিক হয়ে যাবে এমনিই, চুপ কর মা!’

আবু তাহের এখনো জানেন না তাঁর মেয়ে ফারজানা আর পৃথিবীতে নেই। তিনি জানেন ফারজানা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বুধবার মিরপুরের রূপনগরে ওই সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সাত শিশু নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ১৫ জন। নিহতদের একজন ফারজানা। বিস্ফোরণের ঘটনার পর মেয়ের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে জ্ঞান হারাচ্ছেন ফারজানার বাবা আবু তাহের। তিনি জানেন তাঁর দুই মেয়ে আহত হয়েছে বিস্ফোরণে; যার একজন ঘরে আর অন্যজন হাসপাতালে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মিরপুরের রূপনগর এলাকার ১১ নম্বর সড়কের ঝিলপাড় বস্তির আবু তাহেরের ঘরে ঢুকে দেখা যায় তাহের শুয়ে আছেন তাঁর আহত মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে।

বুধবার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর মেয়ের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে যান আবু তাহের। কিছু সময় পর দুই মেয়ের অবস্থা দেখে জ্ঞান হারান মা নার্গিস বেগমও। রাতে নার্গিসের জ্ঞান ফিরলেও জ্ঞান ফেরেনি তাহেরের। আজ দুপুরে জ্ঞান ফেরে তাঁর। কিন্তু তাহেরকে কেউ বলছেন না, ফারজানার নিহত হয়েছে। সবাই বলছেন, ফারজানা এখনো হাসপাতালে আছে। তিনিও তাই বিশ্বাস করছেন।

বিস্ফোরণের পর ফারজানাকে নিয়ে ভর্তি করা হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার সময় ময়নাতদন্তের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। এক ভাই আর মা নার্গিস মেয়ের লাশ (ফারজানা) নিয়ে ভোলা সদরের পাবদা গ্রামের নিজ বাড়িতে যান দাফন করতে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আবু তাহেরের সঙ্গে কথা হয় । ওই সময় ঘরে ছিল মেয়ে মরিয়ম। সিলিন্ডার বিস্ফোরণে তার পায়ে আঘাত লেগেছে। ব্যথার যন্ত্রণায় মরিয়ম চিৎকার করে বাবাকে বলছে, ‘আব্বা, পাওডা ব্যথা করে।’ ঘরে টাকা নেই, নেই ওষুধও। তাই বাবা কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে বলছেন, ‘ঠিক হয়ে যাবে এমনিতেই, চুপ কর মা।’

একটু পরই বিলাপ করতে করতে আবু তাহের বলছিলেন, ‘আমি ফারজানাকে দেখতে যাব হাসপাতালে। কিন্তু কেউ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে না। আমি অসুস্থ মানুষ, একলা একলা ক্যামনে যাব?’

সে সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লায়লা নামের এক প্রতিবেশী তাহেরকে বলেন, ‘মেয়েকে একা রেখে কনে (কোথায়) যাবা? হাসপাতালে মেয়ে ভালো ভালো ওষুধ পাচ্ছে। বাড়িতে কে কিনে দেবে? মরিয়মের জন্য ওষুধ কিনতে পারছ না। ওর (ফারজানা) জন্যও কিনতে পারবা না।’ সে সময় তাহের মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দেন।

এরপর আবু তাহের বলেন, ‘ঘরে ১০ টাকা আছে। একজন মরিয়মকে দিছে। আর কোনো টাকা নেই। ওষুধ শেষ। কালকা ৩টা ওষুধ দিছিল কেডা যেন, আজ তা শেষ। শুধু ঘায়ে একট মলম দিছি। ভালো ওষুধ কেডা দিবে? ব্যথায় মেয়ে ছটফট করছে। আমি এহন আর রিকশা চালাইতে পারি না। আমার দেহ আর চলে না। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই আমাগোর।’

আবু তাহেরের বড় ছেলে আবদুর রহমানের বউ সোনিয়া খাতুন আছেন শ্বশুর আর মরিয়মের দেখাশোনা করার জন্য। তিনি বলেন, ‘ঘরে চালও নেই। ভোলায় ফারজানাকে নিয়ে যাওয়ার টাকা লোকজনের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে নিয়ে গেছে। বোনডা (মরিয়ম) ছটফট করতেছে। আর আমরা বলছি, ঠিক হয়ে যাবে! ওষুধ ছাড়া কি ঠিক হয়? কেউ যদি আমাদের একটু সাহায্য করত খুব ভালো হতো। আমার শ্বশুর অসুস্থ। স্বামীর একা কামাই দিয়ে পরিবারের হগ্গলে খাই। সে আর কী করবে?’

অনেক সময় অবস্থানের পর এই প্রতিবেদক যখন বের হয়ে আসছিলেন। সে সময় মরিয়ম আবু তাহেরকে বলতে থাকেন, ‘আব্বা, পাওডা ব্যথা করে। ওষুধ আনো। আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না আব্বা!’

এদিকে, সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদকে (৩০) আসামি করে মামলা করেছে পুলিশ। তাকে পঙ্গু হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করে ঢামেকে পুলিশি প্রহড়ায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ,মিরপুর,রূপনগর এলাকা,মরিয়ম
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close