Most important heading here

Less important heading here

Some additional information here

Emphasized text
  • শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬
  • ||
শিরোনাম

৩০ দিন নির্যাতনের পর সিআইডির কথা মতো স্বীকারোক্তি দেই: জজ মিয়া

প্রকাশ:  ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৪:২৬ | আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৯, ১০:২২
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট icon

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মামলার অন্যতম আলোচিত নাম জজ মিয়া।ওই নামটি তিনি জীবন থেকে মুছে ফেলতে চান। জজ মিয়া এখন জালাল নামে পরিচিত। জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম মো. জালাল আহমেদ। গাড়ি চালানোর লাইসেন্সেও ব্যবহার করেছেন এই নাম। জজ মিয়া পরিচয় প্রকাশ পেলেই বদল করেন ঠিকানা।

নোয়াখালি জেলার সেনবাগ উপজেলার কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট গ্রামের টেন্ডল বাড়ির জালাল আহমদ ওরফে জজ মিয়া বসতভিটা বিক্রি করে বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় এক বস্তিতে বসবাস করছেন।

গ্রেনেড হামলার ঘটনার আগে ঢাকার মতিঝিলের ফুটপাতে ফলের ব্যবসা করতেন জজ মিয়া। ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার প্রায় ৯ মাস পর ২০০৫ সালের ৯ জুন সেনবাগ থানার এ এস আই কবির হোসেন বীরকোট গ্রামের রাজামিয়ার চা দোকান থেকে গ্রেফতার করে জজ মিয়াকে। পরে থানা থেকে জজ মিয়াকে সিআইডির এএসপি আব্দুর রশিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরে গ্রেনেড হামলার হোতাদের আড়াল করতে জজ মিয়াকে বানানো হয়েছিল বলির পাঁঠা। তিনি জানতেন না, কী ছিল তার অপরাধ। তবুও রিমান্ডে নিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্যাতন ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সাজানো গল্পে জজ মিয়াকে দিয়ে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছিলেন সিআইডির তৎকালীন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনা সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জজ মিয়া বলেন, গ্রেনেড হামলার দিন আমি নোয়াখালীর সেনবাগে বীরকোট গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। বাবুল চাচার চায়ের দোকানে বসে টিভি দেখে গ্রেনেড হামলার ঘটনা জানছি। এ নিয়ে আমরা স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে তর্কবিতর্কও করছি। সন্ধ্যার পর বাজারে প্রতিবাদ মিছিলও করেছি। মিছিলে আমার সঙ্গে স্কুলের শিক্ষক, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও স্থানীয় অনেক লোক ছিল। সেই আমিই নাকি বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা করেছি!

বীরকোট গ্রামের রাজামিয়ার চা দোকান থেকেগ্রেফতার করার পর সেনবাগ থানার এ এস আই কবির হোসেনের কাছে জজ মিয়া জানতে চেয়েছিলেন, কি তার অপরাধ? এএসআই কবির তাকে জানান, সেনবাগ থানায় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। ঢাকায় তার নামে মামলা আছে।

গ্রেফতার হওয়ার তিন-চার ঘণ্টা পর ঢাকা থেকে সিআইডির অফিসাররা সেনবাগ থানায় যান উল্লেখ করে জজ মিয়া বলেন, আমাকে থানার একটা রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সিআইডির কর্মকর্তা আবদুর রশিদ সবাইকে রুম থেকে বের করে দেন। এরপর গামছা দিয়ে আমার চোখ বেঁধে মারধর শুরু করেন। আর বলতে থাকেন, তুই এত বড় একটা হামলা করে দেশে এসে বসে রইছস। মনে করছস তোকে ধরতে পারব না। এরপর আমাকে চোখ বেঁধে তারা থানা থেকে গাড়িতে করে ঢাকায় নিয়ে এলো। আসার পথে প্রায় এক ঘণ্টা পর এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে নামিয়ে বলল আমরা যেটা বলি, তুই সেটা স্বীকার করিস, আর না হলে তোর নামে ৪-৫টা মার্ডার কেস দেখিয়ে তোকে শীর্ষ সন্ত্রাসী বানিয়ে ক্রসফায়ারে দিয়ে দেব। আমি বললাম, স্যার আমি কী বলব, আমি কী জানি? তারা বলল, আমরা যেমনে বলব, সেভাবেই তোর শুনতে হবে। এ কথা বলে আবার আমাকে গাড়িতে ওঠায়। ঢাকায় এনে যখন আমার চোখ খুলল, তখন দেখি আমি একটা রুমের ভেতরে আছি। আমি কোথায় আছি, আমি বলতে পারি না। আমার সামনে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন অস্ত্র নিয়ে বসে আছে। আমি আতঙ্কে আধমরা, এই বুঝি আমাকে মেরে ফেলে।

ওইখানে কয়েকদফা নির্যাতনের পর সিআইডি অফিসাররা জজ মিয়াকে বলেন, যেভাবে আমরা বলবো সেভাবেই ঘটনাটি স্বীকার করতে হবে। জজ মিয়া তা অস্বীকার করলে আবারও তার উপর নেমে আসে নির্যাতন। ভয়াবহ সেই নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখ করে জজ মিয়া বলেন, দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে আমাকে ফ্যানে ঝুলিয়ে পায়ের তলায় পিটিয়েছে। আমার ডান হাতের হাড় ফাটিয়ে দিয়েছে। রিমান্ডে তারা ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গেছে। বলেছে, তাদের কথামতো যদি আমি স্বীকারোক্তি দিই, তাহলে বেঁচে থাকব। তাছাড়া যত দিন আমি জেলে থাকব, তত দিন আমার পরিবারের ভরণপোষণ দেবে সিআইডি। ৩০ দিন নির্যাতনের পর তাদের কথায় রাজি হলাম। তারা আমাকে ঘটনাস্থলের ভিডিও দেখাল। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছবি দেখিয়ে নাম মুখস্থ করাল।

তিনি বলেন, রিমান্ডে থাকার সময় বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমান নিয়মিত এসে আমার সঙ্গে দেখা করে ক্রসফায়ারের ভয় দেখাতেন এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা আমিই করেছি- এমন কথা বলতেন।

জজ মিয়া জানান, নির্যাতনের পাশাপাশি সিআইডির কর্মকর্তারা স্বীকার না করলে ক্রসফায়ারে তাকে মেরে ফেলা হবে। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই আদালতে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন জানিয়ে বলেন, আতঙ্কিত হয়েই আমি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দায় স্বীকার করে তাদের শেখানো গল্প বলে যাই। যে পয়েন্টটা ভুলে যেতাম, বলতে পারতাম না, ওইগুলো তারা আমাকে বলে দিতেন। জবানবন্দিতে আমি বলি, পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড়ভাইদের নির্দেশে আমি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নিই। বড়ভাইয়েরা হচ্ছেন সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ ও মুকুল।

জজ মিয়া বলেন, আমি এসব সন্ত্রাসীকে কোনো দিন দেখিওনি। তিনি বলেন, আমি যে চাপে পড়ে স্বীকারোক্তি দিচ্ছি, তা বলার সুযোগও ছিল না। পাশেই সিআইডি কর্মকর্তারা বসা ছিলেন। তিনি আরও জানান, কারাগারে থাকার সময় সেনবাগ থানার দারোগা কবির হোসেনের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে মায়ের সঙ্গে সিআইডির কর্মকর্তা রুহুল আমিনের কথা হতো। সিআইডির ওই তিন কর্মকর্তা তাদের কথা অনুযায়ী জবানবন্দি দেয়ার প্রতিদানস্বরূপ তার মাকে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে দিত।

এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলার রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথা ফাঁস করে দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেফতারের পর থেকেই তার পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে সিআইডি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ মামলা তদন্তের নতুন করে উদ্যোগ নেয়া হয়। তদন্তে উঠে আসে, বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় গোপন জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই হামলা চালিয়েছিল।

তদন্ত শেষে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে ২২ জনকে আসামি করা হয়। সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ছাড়া বাকি আসামিদের সবাই হুজি-বির জঙ্গি। এ সময় আসামির তালিকা থেকে জজ মিয়ার নাম বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। পরে আদালত এ মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দিলে ২০০৯ সালে মুক্তি পান জজ মিয়া। এ বছরই সিআইডি এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে। ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তাতে আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। এতে ফেঁসে যান জজ মিয়া নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও। এ মামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় হয়। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসির দণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়।

বর্তমানে মানেবতর জীবনযাপন করছেন জানিয়ে জজ মিয়া বলেন, আমাকে নিয়ে সিআইডির নাটকের কথা এদেশের মানুষ জানেন। মিথ্যা মামলায় পড়ে আমার জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো চলে গেছে। আমি কখনো কোনো রাজনীতি বা দলাদলিতে ছিলাম না। টুকিটাকি ব্যবসা করে কোনোরকমে পরিবার পরিজন নিয়ে চলতাম। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় তাদের লেলিয়ে দেয়া সিআইডি কর্মকর্তাদের সাজানো মামলায় আমাকে বলি করা হয়েছে। তাদের নাটকের বলি হয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর বর্তমানে আমি নিঃস্ব। বর্তমান সরকারের কাছ থেকে একটু মাথাগোঁজার জায়গা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি চাকরি পেলে সংসার জীবনে পদার্পণ করে সুখী জীবনযাপন করতে পারব।

পূর্বপশ্চিমবিডি-এনই

জজ মিয়া
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত